অমিতাভ সিরাজ ও পবিত্র মোহান্ত, বুনিয়াদপুর এবং সুনীল চন্দ, ইটাহার: লোকসভা ভোটের আঁচে ক্রমশ তেতে উঠছে মমতার ভাষণ। দ্বিতীয় দফার ভোটের ঠিক ৪৮ ঘণ্টা আগে আজ বুনিয়াদপুর ও ইটাহারের সভা থেকে দিল্লিতে নির্বাচন–পরবর্তী ভূমিকায় আরও স্পষ্ট করলেন দলের অবস্থান। এদিন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বললেন, ‘‌উত্তরপ্রদেশ আর বাংলা মিলেই সিদ্ধান্ত নেবে আগামী দিনে সরকার কে গঠন করবে।’‌ এরপরেই বুনিয়াদপুরের সভায় উপস্থিত জনতার উদ্দেশে মমতার প্রশ্ন,‌ ‘‌ভারত সরকার কে গড়বে?‌ তৃণমূল সরকার আবার কে!‌‌’ তৃণমূল সু্প্রিমো বলেন, ‘‌বাংলাকে এগিয়ে দিন, ‌৪২ আসনেই জয়ী করুন। তবেই বাংলা এগিয়ে যাবে।’‌ ‌মমতার দৃঢ় বিশ্বাস, এবারের লোকসভা ভোটে বিজেপি আর ক্ষমতায় আসবে না। তাঁর ভোটের অঙ্কের হিসেব এইরকম— ‘‌অন্ধ্রপ্রদেশে শূন্য পাবে বিজেপি। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে ৬০ আসনের মধ্যে বড়জোর ২০ পেতে পারে। উত্তরপ্রদেশে ৮০টির মধ্যে গত নির্বাচনে ৭৩টি আসন ছিল বিজেপি–র। এবার তা কমে ২০–তে দাঁড়াবে। দিল্লিতে আম আদমি পার্টি সবটাই দখল করবে। ওদিকে, বিহারে লালুপ্রসাদের দল, কর্ণাটকে দেবগৌড়া, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে সিংহভাগ আসন দখল করবে।’‌ মমতার বক্তব্য, ‌সারা দেশে বিজেপি–র এভাবেই শোচনীয় হার হবে। ইটাহারের সভা থেকে বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম–কে জগাই–মাধাই বলে এদিনও উল্লেখ করে বলেন, ‘‌বহরমপুর, জঙ্গিপুরে এদের জোট হয়েছে। বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম–কে ভোট দেবেন না। দিল্লির সরকারকে বদলে দিন। আগে বলতাম, ২০১৯ বিজেপি ফিনিশ। এখন বলছি, ১৪২৬ বেয়াল্লিশ–এ ৪২।’‌ 
এদিন বুনিয়াদপুরের নারায়ণপুর মাঠে ও উত্তর দিনাজপুরের ইটাহারে বালুরঘাট লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী অর্পিতা ঘোষের সমর্থনে বড় মাপের সমাবেশের আয়োজন করেছিল তৃণমূল। দু‌টি সভাতেই থিকথিকে ভিড় হয়। প্রচণ্ড গরমেও সভায় আসা সাধারণ মানুষের মমতার প্রতি আবেগ ও উচ্ছ্বাসে কোনও ভাটা পড়েনি। তাঁর বক্তৃতার মধ্যেই আদিবাসীদের মাদল, কখনও বা মহিলাদের উলুধ্বনি— সমাবেশকে অন্য মাত্রা এনে দেয়। এরই মধ্যে দিল্লির রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে মমতা কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ও মোদিকে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌বালুরঘাটে আমি অনেকবার এসেছি। বন্যা দেখতে আসতাম। এক কোমর করে জল হত। এখন তো নতুন রাস্তা হয়েছে। অনেক উন্নতি হয়েছে এইসব এলাকার। ৩৪ বছরে বামফ্রন্ট কিছুই করেনি। গত সাড়ে ৭ বছরে আমরা যা করেছি, সারা পৃথিবীর কাছে বিস্ময়। আমাদের ‘‌কন্যাশ্রী’‌ বিশ্বের গর্ব।’‌ গত বিধানসভা ভোটে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা থেকে মাত্র ২‌টি আসন পেয়েছিল তৃণমূল। মমতা বলেন, ‘‌আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে যাঁদের ভোট দিয়েছেন, তাঁরা কী কাজ করেছেন?‌’‌ মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এর আগে একলাখি–‌‌বালুরঘাট রেল প্রকল্প হয়েছে এই এলাকায়। তিনি রেলমন্ত্রী থাকতেই এই কাজ করেছিলেন। এছাড়াও ইটাহার–‌রায়গঞ্জ রেলপথ, বুনিয়াদপুরের রেলের ওয়াগন তৈরির কারখানার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু মোদি সরকার তা এখনও করে উঠতে পারেনি। অথচ, রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে বালুরঘাটে এয়ারপোর্ট, বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে। অর্পিতাকে ভোট দেওয়ার আবেদন জানিয়ে মমতা আরও বলেছেন, ‘‌বিজেপি দেশের অর্থনীতি পঙ্গু করে দিয়েছে। সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের রাজনীতি করছে। সীমান্ত এলাকায় উসকানি দিচ্ছে। টাকা ছড়াচ্ছে। টাকা দিয়ে ভোট হয় না।’‌ দু‌টি সভা থেকেই এনআরসি নিয়ে মোদিকে আক্রমণ করেছেন মমতা। তাঁর জোরালো সিদ্ধান্ত, ‘‌এখানে এনআরসি করতে দেব না। বাংলা ভাগ হতে দেব না আমরা।’‌
ইটাহারের সভায় তিনি বলেন, ‘‌মানুষ বিপদে পড়লে, বন্যা হলে, আগুনে বাড়ি পুড়ে গেলে, আমরা পাশে থাকি। সরকার সবসময় কল্যাণমূলক কাজের মধ্যেই রয়েছে। তাই তো আমার সরকার মা–মাটি–মানুষের সরকার। অবহেলিত উত্তরবঙ্গের কথা ভেবে আমি ‘‌উত্তরকন্যা’‌ করেছি। জলপাইগুড়িতে সার্কিট বেঞ্চ, এখানে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ হয়েছে, দিনাজপুরের বিখ্যাত তুলাইপাঞ্জি চাল বিক্রির ব্যবস্থা করেছি। হয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাস্টার।’‌ ইটাহারের সভায় মুখ্যমন্ত্রী এদিন তাঁর ভাষণে তুলে ধরেন সর্বধর্ম সমন্বয়ের কথা। বলেন, ‘‌আমরা যেমন হিন্দুর শ্মশান সংস্কার করেছি, তেমনই নির্মাণ করেছি মুসলমানদের কবরস্থানও। দক্ষিণেশ্বরের স্কাইওয়াকের পাশাপাশি ফুরফুরা শরিফের উন্নয়ন হয়েছে। এই সমন্বয়ই সরকারের বৈশিষ্ট্য। অথচ, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতিতে বিশ্বাসী।’‌এদিনের দুটি সভাতেই ছিলেন মন্ত্রী রাজীব ব্যানার্জি, প্রার্থী অর্পিতা ঘোষ। ইটাহারের সভায় ছিলেন বিধায়ক তথা উত্তর দিনাজপুর জেলা তৃণমূল সভাপতি অমল আচার্য, বুনিয়াদপুরে ছিলেন দলের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা সভাপতি বিপ্লব মিত্র, প্রাক্তন মন্ত্রী শঙ্কর চক্রবর্তী প্রমুখ।

জনপ্রিয়

Back To Top