দিব্যেন্দু ভৌমিক,কোচবিহার: ইতিহাস আজও জীবন্ত গোবিন্দমোহন দত্তপোদ্দারের গদি ঘরকে ঘিরে। সম্প্রতি রাজ্য সরকার হেরিটেজ ঘোষণা করেছে গোবিন্দমোহন দত্তপোদ্দারদের বাড়ি। রাজ আমলের ইতিহাসকে সংরক্ষণ করে রাখতে এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন গোবিন্দমোহনের বংশধরেরা। আজও বাড়িতে পা রাখলে দেখা যায় সেই সমস্ত লোহার বাক্স, যেগুলোতে থাকত কোচবিহার মহারাজার স্টেটের ‘‌পেপার নোট’‌। আছে সেই গদি ঘর, যেখানে বসে মহারাজার ‘‌পেপার নোট’‌–এর ওয়ারিশ গোবিন্দমোহন দত্ত পোদ্দার মোহরের বিনিময়ে পেপার নোট প্রজাদের হাতে তুলে দিতেন। আছে গদি ঘরের সামনে রাজ আমলের রোয়াক। যেখানে প্রায় সকালেই মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণ ভূপবাহাদুর ঘোড়া ছুটিয়ে এসে বসতেন এবং নোটের আদান প্রদান ও ভবানীগঞ্জ বাজারের পরিষ্কার–‌পরিছন্নতার কাজ খুঁটিয়ে দেখতেন। 
আছে কোচবিহার শহরের প্রাণকেন্দ্র ভবানীগঞ্জ বাজার চত্ত্বরে প্রায় ৮ বিঘে জমির উপর তিনমহলা বাড়ি, বিশাল পুকুর ও মন্দির নিয়ে হরিমোহন পোদ্দার ভবন। বাড়িটি সম্প্রতি ‘‌হেরিটেজ’‌ ঘোষিত হয়েছে। তিনশ বছরের পুরনো গদিঘর ২০ ইঞ্চি চুন সুড়কি দিয়ে ইটে গাথা। দু’‌ফুট উঁচু মাটির গদি। তার উপর চাটাই ও তোষক। সাদা চাদর। গোবিন্দমোহনের সঙ্গে এই গদিতে বসেই কোন কোনও দিন মহারাজা ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প জুড়ে দিতেন। উপরে ঝুলছে শত বছর অতিক্রান্ত বিশাল পাখা। একদিকে রাজ আমলের দঁাড়িপাল্লা। আর এক কোণে রাখা থরে থরে নীল লোহার বাক্স। যাতে থাকতো ‘‌পেপার নোট’‌ ও মোহর। 
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পৃথিবী ব্যাপী ধাতব সঙ্কট দেখা দেয়। সেই সময় আনুমানিক ১৯৪২ সাল নাগাদ মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণ কোচবিহার রাজ্যে কাগজের নোট চালু করেন। আর গোবিন্দমোহন দত্ত পোদ্দার তাতে সই করলেই সেই টাকা বৈধতা পেত। এমনটাই জানালেন কোচবিহার আর্কাইভের সভাপতি ঋষিকল্প পাল। ‘‌তবে এই নোট চলেছিল বছর দুয়েক। এরপর ফিরে আসে ধাতব মুদ্রা।’ বললেন মহারাজার এডিসি পূর্ণানন্দ রায়ের নাতি আশিস রায়। সেই সঙ্গে আশিসবাবু বহু ইতিহাসের সাক্ষী গোবিন্দমোহনের বাড়িটির সংস্কারেরও দাবিও তুলেছেন। গোবিন্দমোহনের জমিদারি ছিল পুণ্ডিবাড়ি, মধুপুরধামে। তবে গোবিন্দমোহনের মূল কারবার ছিল বাসনের। উত্তরবঙ্গের পাশাপাশি অসম জুড়ে ছড়িয়ে ছিল সেই কারবার। রাজবাড়ির বাসন সরবরাহের দায়িত্ব ছিল এই পরিবারের। গায়ত্রীদেবী, ইলাদেবী–‌সহ প্রাসাদের সমস্ত বিয়ের বাসন গেছে এই গদি থেকেই। আজও আছে সেই সাবেক বাসনের কারবার। এখন গোবিন্দমোহনের গদিতে বসেন তাঁর ছোট ভাই গজেন্দ্রমোহনের ছেলে খঞ্জন কুমার দত্ত পোদ্দার। তিনি বলেন, ‘‌আমরা আজও পারিবারিক বাসনের কারবার চালাই। বর্তমান প্রজন্ম আর নেই এই ব্যবসায়। আমাদের বাড়িটি হেরিটেজ হয়েছে জেনেছি। ভাল লাগছে।’‌ সময় এগোলেও দত্ত পোদ্দাররা আজও কম্পিউটার ঢোকাননি রাজ আমলের গদিঘরে। খেরোর খাতা ও সাবেক দাঁড়িপাল্লাতেই আস্থা রেখে চলেছে গোবিন্দমোহনের গদি। 

জনপ্রিয়

Back To Top