পার্থসারথি রায়, জলপাইগুড়ি, ১৮ মার্চ- বিয়ে হয়েছে মাত্র দুদিন। এর মধ্যেই শ্বশুরবাড়িতে হাতির হানা। নিজের চোখের সামনে হাতির তাণ্ডব দেখে কার্যত বাকরুদ্ধ নতুন বউ। এ যাত্রায় না হয় বেঁচে গেলেন, কিন্তু এই বাড়িতে দিনের পর দিন থাকতে হবে!‌ বিয়ের দুদিন পরেই নতুন বউয়ের বায়না, আমি আর শ্বশুরবাড়িতে থাকব না। আমি বাপের বাড়ি যাব। বেচারা বর!‌ হাতি যে তাঁর দাম্পত্যে এমন বাগড়া দেবে, কে জানত!‌ শ্বশুর বাড়ির লোকেরা বুঝিয়ে চলেছেন, ‘‌ভয়ের কিছু নেই। হাতি তো মাঝে মাঝেই আসে।’‌ এতে আতঙ্ক আরও বেড়ে গেল। বর দ্বারস্থ হলেন বনকর্তাদের। শেষমেষ রেঞ্জারের উদ্যোগে আপাতত শ্বশুরবাড়িতে থাকতে রাজি হয়েছেন নতুন বউ। 
রাজগঞ্জের ললিতাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা বিশ্বজিৎ রায়ের সঙ্গে দু’‌দিন আগেই বিয়ে হয় কোচবিহার জেলার হলদিবাড়ি ব্লকের বাসিন্দা মীনা রায়ের। বিয়ের আগে কখনও হাতি দেখেননি মীনা। অথচ তাঁর শ্বশুরবাড়ির গ্রামে মাঝে মধ্যেই বুনো হাতির তাণ্ডব চলে। এলাকার মানুষের কাছে এই ঘটনা একেবারেই গা সওয়া। যদিও সদ্য বিয়ে হয়ে আসা নববধূ হাতির তাণ্ডবের মুখে পড়ে নিজের বাবা মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার বায়না ধরেছেন। এর ফলে সমস্যায় পড়েছেন স্বামী বিশ্বজিত রায় ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গলের পাশেই রয়েছে ললিতাবাড়ি গ্রাম। মঙ্গলবার রাতেও একটি বুনো দাঁতাল এসে তাণ্ডব চালিয়েছে এই গ্রামে। গ্রামের বাসিন্দা রবীন রায়ের বাড়িতে হামলা চালায় হাতিটি। তাণ্ডব চালিয়ে দুটি ঘর ভেঙে দেয়। এই ঘটনায় কোনওরকমে প্রাণে বেঁচে যান রবীন রায়ের বৃদ্ধ বাবা। পরে হাতিটি সেখান থেকে যাওয়ার সময় তাণ্ডব চালায় বিশ্বজিত রায়ের ঘরে। হাতি তাণ্ডব চালানোর সময় ঘরে ছিলেন বিশ্বজিতের সদ্য বিবাহিত স্ত্রী। কোনও রকমে প্রাণে বেঁচে গেলেও আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না স্ত্রী মীনার। বুনো হাতির ভয়ঙ্কর তাণ্ডবের মুখে পড়ে শ্বশুরবাড়িতে থাকতে চাইছেন না। এদিন তিনি বলেন, ‘‌গ্রামে বুনো দাঁতাল হাতি ঢুকেছিল। ভয়ঙ্কর তাণ্ডব চালিয়েছে হাতিটি। এর আগে আমি কখনও হাতি দেখিনি। এখানে এসে হাতি দেখে আমি প্রচণ্ড ঘাবড়ে গিয়েছি। এই বাড়িতে আমি আর থাকতে চাই না। আমি বাপের বাড়ি চলে যাব।’‌ 
স্ত্রীর এহেন অবস্থানে বিপাকে পড়েছেন মীনার স্বামী বিশ্বজিৎ। স্ত্রীকে অনেক বুঝিয়েও আটকে রাখতে পারছেন না তিনি। বাধ্য হয়ে বন দপ্তরের দ্বারস্থ হন বিশ্বজিৎ। বলেন, ‘‌আমি তো মাঝে মধ্যেই গ্রামে বুনো হাতি ঢুকতে দেখি। তাই অভ্যেস হয়ে গেছে। তবে আমার স্ত্রী মীনা বুনো হাতির তাণ্ডব দেখে প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এখানে আর থাকতে চাইছে না। বাধ্য হয়ে বন দপ্তরের দ্বারস্থ হয়েছি। বন দপ্তরের কাছে আবেদন জানিয়েছি কর্মীদের টহলদারি বাড়ানোর জন্য।’‌ 
বিষয়টি জানতে পেরে বিশ্বজিতের বাড়িতে আসেন বন দপ্তরের রেঞ্জ অফিসার সঞ্জয় দত্ত। নববধূ মীনা রায়ের সঙ্গে কথা বলে তাঁকে আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য বলেন সঞ্জয়বাবু। পাশাপাশি এলাকায় বনকর্মীদের টহলদারি বাড়ানোর আশ্বাস দেন তিনি। এর আগেও এলাকায় হাতির হামলার জেরে আতঙ্কিত হয়ে নববধূর স্বামীর ঘর ছাড়ার নজির রয়েছে‌। জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জ ব্লকের মনিঙ্গাঝোড়া গ্রামের সেই ঘটনায় রীতিমত অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিলেন বন দপ্তরের কর্তারাও। সেক্ষেত্রেও ময়দানে নামেন রেঞ্জার সঞ্জয় দত্তই। মুশকিল আসান হয়ে নববধূকে অভয় দিয়ে তাঁর স্বামীর ঘরে ফিরিয়ে আনেন তিনি।

নবদম্পতি। বিশ্বজিৎ ও মীনা। ছবি:‌ প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top