অম্লানজ্যোতি ঘোষ, আলিপুরদুয়ার, ১১ নভেম্বর- ‘‌শুধুমাত্র একটি নথি চাই।’‌ যাতে প্রমাণ হয় তাঁরা এদেশেরই নাগরিক। ব্যাস, তার বাইরে আর কিছু চাওয়া নেই এই বয়সে। এনআরসি–র আতঙ্কে দিশেহারা ক্যান্সারে আক্রান্ত অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী সেই নথির খোঁজে হুগলি থেকে চলে এলেন আলিপুরদুয়ারে। 
৫০ বছর আগে চাকরি সূত্রে ভিটেমাটি বিক্রি করে আলিপুরদুয়ার ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন দীপক রায়চৌধুরি (এখন বয়স ৭৮)। ঘর বেঁধেছিলেন হুগলির কোন্নগরে। কিন্তু এনআরসি–র আতঙ্কে, ডিটেনশন ক্যাম্পে যাওয়ার ভয়ে কোন্নগর থেকে ভগ্ন শরীরেই স্ত্রী অপর্ণা রায়চৌধুরিকে সঙ্গে নিয়ে চলে এসেছেন আলিপুরদুয়ারে। ৭ দিন ধরে এখানেই পড়ে আছেন দু’‌জন। আছেন মাধবমোড় এলাকায় অবকাশ নামের একটি লজে। বিক্রি করে দেওয়া জমির রেকর্ড খুঁজতে সরকারি দপ্তরগুলিতে ছুটছেন রোজ। 
একসময় আলিপুরদুয়ারের বাবুপাড়ায় পৈতৃক ভিটে ছিল দীপকবাবুর। কিন্তু বদলির চাকরির কারণে ১৯৬৯ সালে ওই জমি বিক্রি করে দিয়ে আলিপুরদুয়ার ছাড়েন। এক মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ছেলেও সরকারি চাকুরে। ছেলে–মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই ছুটছেন অসুস্থ শরীরে। ৫০ বছর আগে শহর ছাড়ার কারণে এখন আর জেলা সদরকে চিনতেও পারছেন না দু’‌জনে। তাই দিশা না পেয়ে শেষপর্যন্ত সোমবার জেলার সংবাদমাধ্যমের দ্বারস্থ হয়েছেন তাঁরা। 
দীপকবাবুর কথায়, ‘‌আমি কচুপাতার ওপর জলের মতো। এই আছি এই নেই অবস্থা। দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে জমির নথি জোগাড় করতে আলিপুরদুয়ার ছুটে এসেছি। শরীর সায় দেয় না। কিন্তু মন তো মানে না। শেষে আমার কারণে যদি ছেলে–মেয়েকে দেশান্তরী হতে হয়।’‌ 
অপর্ণা দেবী জানিয়েছেন, আমি কোচবিহারের পুণ্ডিবাড়ির বাসিন্দা ছিলাম। আমার কাগজ সংগ্রহ করেছি। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির কোনও নথি আমাদের হাতে নেই। তাই এনআরসি–র আতঙ্কে স্বামীর জীবনের ঝুঁকি নিয়েও প্রচণ্ড অসুস্থ অবস্থায় তাকে নিয়ে আলিপুরদুয়ারে এসেছি।’‌ 
বিষয়টি জেনে উদ্যোগী হয়েছেন আলিপুরদুয়ারের তৃণমূল বিধায়ক সৌরভ চক্রবর্তী। তিনি জানিয়েছেন, ‘‌আমরা তো প্রথম থেকেই বলে আসছি যে, এনআরসি–র আতঙ্কে অনেকেই দিশেহারা। আমাদের আশঙ্কা যে মিথ্যে নয়, তার টাটকা প্রমাণ কোন্নগরের ওই রায়চৌধুরি দম্পতি। বিষয়টি আমি আজই জানতে পেরেছি। তাঁদের সঙ্গে দেখা করে, সহজেই যাতে তাঁরা জমির সরকারি নথি পেয়ে যান, সেই বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা করব। ভাবাই যায় না, ক্যান্সারে আক্রান্ত এক বৃদ্ধকে অযথা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।’‌ 
আলিপুরদুয়ার ছেড়ে যাওয়ার পর হুগলির কোন্নগরে স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছিলেন ওই রায়চৌধুরি দম্পতি। আলিপুরদুয়ারের মহকুমা শাসক অরুণাভ ঘোষ জানিয়েছেন, ‘‌এখনও ওই দম্পতি আমাদের কাছে আসেননি। এলেই সবরকমের সহায়তা করা হবে।’‌ কথা বলে বোঝা গেছে, দীপকবাবু আপাতত তাঁর সেই বিক্রি হয়ে যাওয়া জমির দাগ খতিয়ান নম্বর খুঁজে চলেছেন। জেলা সদরের এক আইনজীবীর সাহায্য নিতে হচ্ছে। যথেষ্ট কঠিন হলেও ১৯৬৯ সালের রেকর্ড জলপাইগুড়ি সদর থেকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কাগজ খুঁজে পেলেই তাঁরা ফিরে যাবেন নিজেদের বর্তমান ঠিকানায়।

 

দীপক রায়চৌধুরি ও অপর্ণা রায়চৌধুরি। ছবি:‌ প্রতিবেদক‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top