অভিজিৎ চৌধুরি,কালিয়াচক (‌মালদা)‌: এনআরসি নিয়ে প্রথম থেকেই আক্রমণাত্মক মমতা ব্যানার্জি। উত্তরবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে এসে প্রতি সভাতেই নিয়ম করে এনআরসি নিয়ে কেন্দ্রকে বিঁধেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার মালদার কালিয়াচকের জনসভা থেকেও এনআরসির বদলে বিজেপিকে ‘‌ন্যাশনাল বিদায় সার্টিফিকেট’‌ বা এনবিসি দেওয়ার কথা বলে তীব্র কটাক্ষ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‌ওঁরা সব নাগরিক অধিকার দেবেন, আমি বলি তোমাদের সব সার্টিফিকেট ঠিক আছে তো?‌ এনআরসি–‌‌র বদলে আমরা করব এনবিসি, ন্যাশনাল বিদায় সার্টিফিকেট। বিজেপি–‌কে বিদায় দিন, দেশটাকে বদলে দিন, বিজেপি–‌কে বিদায় দিন, এনআরসি–‌কে বাতিল করে দিন। বাংলায় এনআরসি ও সিটিজেনশিপ অ্যাক্টও করতে দেব না।’‌ 
বৃহস্পতিবার তীব্র গরমের মধ্যেও মালদা জেলায় পর পর তিনটে জনসভা করেন মুখ্যমন্ত্রী। দুপুর দেড়টায় প্রথম সভাটি হয় রতুয়া থানার সামসি কলেজ মাঠে। সভায় এত জনসমাগম হয় যে ভিড় সামলাতে মুখ্যমন্ত্রীকেই মঞ্চ থেকে নির্দেশ দিতে হয়। দ্বিতীয় সভাটি হয় কালিয়াচক থানার সুজাপুর হাতিমারি মাঠে। শেষ সভাটি করেন বামনগোলা থানার পাকুয়াহাট ময়দানে। শেষের দুটি সভাতেও ছিল থিকথিকে ভিড়। সর্বত্রই দলে দলে মানুষ মুখ্যমন্ত্রীর সভায় যোগদান করেন। মহিলাদের উপস্থিতি ছিল বেশি। প্রতিটি সভাতেই কংগ্রেস ও বিজেপিকে লক্ষ্য করে আক্রমণ শানান মুখ্যমন্ত্রী। মালদা দক্ষিণ কেন্দ্রের কালিয়াচকের সভায় বলেন, ‘‌মোয়াজ্জেম হোসেন বিধানসভা নির্বাচনে হেরেও এলাকা ছেড়ে যাননি, এই মানুষটা আপনাদের অনেক কাজে লাগবে।’‌ এরপরই বিদায়ী সাংসদ কংগ্রেসের আবু হাসেম খান চৌধুরিকে নিয়ে তঁার প্রশ্ন, ‘‌ডালুবাবুকে কতবার জেতাবেন?‌ অনেকবার জিতিয়েছেন তো। ক‌দিন পেয়েছেন। ডালুবাবুকে জিজ্ঞেস করুন পার্লামেন্টে মালদা নিয়ে কোনও কথা বলেছেন?‌ মালদার আমটা খেয়ে দেখেছেন?‌’‌ গনি খানের নাম করে তিনি বলেন, ‘‌বরকতদাকে আমরা সবাই সম্মান করি। কিন্তু বরকতদার নাম ভাঙিয়ে আর কতদিন?‌’‌ এরপরই তাঁর সংযোজন, ‘‌মৌসমও কংগ্রেস করত, আমিও কংগ্রেস করতাম। কিন্তু কংগ্রেসকে দেখেছিলাম তরমুজ, বাইরেটা সবুজ ভিতরটা লাল। আমাদের কর্মীরা মারা যেত আর ওরা সিপিএমের সঙ্গে বন্ধুত্ব করত। আমি এর প্রতিবাদ করে কংগ্রেস ছেড়ে এসেছিলাম। আর তৃণমূল কংগ্রেস যদি তৈরি না করতাম, তা হলে বাংলা থেকে বামফ্রন্ট কোনও দিন হারত না।’‌

 

মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণে স্বাভাবিক ভাবেই আসে কালিয়াচকের শ্রমিকদের ভিনরাজ্যে মৃত্যুর প্রসঙ্গও।
 তিনি বলেন, ‘কেউ ফিরে তাকায়নি, ‌আমাদের সরকার মৃতদেহ নিয়ে এল, আমি ফিরহাদ হাকিম, শুভেন্দুকে পাঠালাম, আড়াই লক্ষ টাকা করে সাহায্য করলাম। আপনারা আমাকে মানুন বা না মানুন, আপনাদের সুদিন–‌‌দুর্দিনে আমি আছি।’‌ 
সর্বভারতীয় রাজনীতির কথা যেমন উঠে আসে, তেমনি অন্য রাজ্যে কংগ্রেস বেশি আসন পেলে তাঁর আপত্তি নেই, এটাও স্পষ্ট করেন। তবে বাংলার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা, সেটাও তুলে ধরেন, ‘‌বাংলার বাইরে যেখানে কংগ্রেস শক্তিশালী, সেখানে কংগ্রেসকে ভোট দিতে বারণ করব না। কিন্তু বাংলায় কংগ্রেস নেই। এখানে কংগ্রেস–‌সিপিএমকে ভোট দিলে বিজেপি–‌র হাত শক্তিশালী হবে।’‌‌ উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ‘‌মালদায় ভূতনি সেতু, পলিটেকনিক, আইটিআই করা হয়েছে। সিল্ক সেন্টার, আইটি সেন্টার হয়েছে। নতুন এয়ারপোর্ট করে দেওয়া হয়েছে। এখানে মেডিক্যাল কলেজের মাধ্যমে ভাল চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। বিহার, ঝাড়খণ্ড–‌সহ অন্যান্য রাজ্যের রোগীরা এসে চিকিৎসার সুযোগ নিচ্ছেন। কৃষকদের খাজনা মকুব করা হয়েছে। শস্যবিমা করা হয়েছে। বাংলাদেশ আম নিচ্ছে না। আমরাই সৌদি আরব, ইরাক, আমিরশাহিতে আম রপ্তানি করছি, যাতে আমের ফলন নষ্ট না হয়।’ এরপরই বিজেপি–‌র ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতিকে নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তঁার তোপ, ‘কয়েকটা লোক হিন্দু ধর্মের নামে আমাদের ধর্মকে বদনাম করে বেড়াচ্ছে। বিজেপি–‌র হিন্দু ধর্মকে বিশ্বাস করি না। আমাদের ধর্মে পরিষ্কার বলা আছে, তুমি কাউকে ঘৃণা করবে না। এরা ভয়ঙ্কর। আমাকে জগন্নাথদেবের পুজো দেওয়া থেকে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। বিক্ষোভ দেখিয়েছিল।’‌ তঁার কথায়, ‌আর মোদিকে কেউ চাইছে না। বাংলা সবাইকে নিয়ে চলে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সব রকম সুবিধে পাচ্ছে। অথচ পাঁচ বছর ধরে লুঠেরাদের নিয়ে দেশ চলছে দিল্লিতে। বাংলায় একটি আসনও পাবে না বিজেপি। বিজেপি ক্ষমতায় থাকবে না।‌ দিল্লিতে সরকার গড়তে বাংলাই মুখ্য ভূমিকা নেবে।

হাতিমারির জনসভায় মুখ্যমন্ত্রী ও মৌসম নুর। বৃহস্পতিবার। ছবি: পিটিআই

জনপ্রিয়

Back To Top