‌‌সংবাদ সংস্থা, আমেদাবাদ, ২৪ ফেব্রুয়ারি- ‘‌হাগপ্লোমেসি’‌। কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধীর সৌজন্যে এখন চালু কথা। উৎপত্তি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘‌বন্ধুতা’‌ দেখে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই চিরপরিচিত আলিঙ্গন‌ দিয়ে শুরু হল ‘‌নমস্তে ট্রাম্প’‌। এদিন ট্রাম্পের ঘণ্টা চারেকের আমেদাবাদ সফরে ছ’‌বার পুনরাবৃত্তি হয়েছে এই দৃশ্যের।
সদ্য বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিকেট স্টেডিয়ামের শিরোপা পাওয়া মোতেরার উদ্বোধনে, ১ লক্ষ ১০ হাজার জমায়েতের সামনে একে অপরের পিঠ চাপড়ালেন মোদি–‌ট্রাম্প। দরাজ প্রশংসা করলেন। ভাল ভাল কথা বললেন। তবে তারই মোড়কে ভারতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের পটভূমিকায় বিশেষ অতিথি অভ্যাগত, অনাবাসী ভারতীয়দের প্রতিনিধিদল, দু’‌দেশের সংবাদ মাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সামনে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে কার্যত হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার, সহিষ্ণুতার কথা মনে করিয়ে দিলেন। বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে তাগাদাও দিলেন। চলতি বছরের শেষের দিকে আমেরিকায় সাধারণ নির্বাচন। অনাবাসী ভারতীয় ভোটদাতার সংখ্যা ৪০ লক্ষ। সে প্রসঙ্গ মাথায় রেখে মোদির স্তুতির পাশাপাশি বলিউড, ক্রিকেট নিয়ে দু’‌চারটি কথা বলে ভারতবাসীর মন পাওয়ার চেষ্টা করলেন। 
ভাষণের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘‌আমেরিকা ভারতকে ভালবাসে। আমেরিকা ভারতকে শ্রদ্ধা করে। ভারতের প্রতি চিরকাল বিশ্বস্ত থাকবে আমেরিকা।’‌ নাগরিকত্ব আইনের নাম না করেও বলেন, ‘‌ভারত বহুত্ববাদের দেশ। শত শত ভাষার দেশ। বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ভাষা সংস্কৃতের উৎপত্তি এখানে। এদেশে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টানের সহাবস্থান। সম্প্রীতির বাতাবরণে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এখানে পাশাপাসি নিজেদের ধর্মাচরণ করেন। বিবিধ সংস্কৃতি সত্ত্বে আপনারা ঐক্যবদ্ধ। এই সহিষ্ণুতা, এই মানবাধিকার সারা বিশ্বের কাছে দৃষ্টান্তমূলক।’‌ ভারতে ব্যক্তি স্বাধীনতা, আইনের শাসনের প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। স্বাধীনতার মাত্র সাত দশকের মধ্যে ভারতের ‘‌উন্নতিকে’‌ কুর্নিশ জানিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ভারত অনুপ্রেরণা দেয়। উল্লেখ করেছেন ‌চন্দ্রযানের। 
করের বোঝা মার্কিন বিনিয়োগকারীদের অস্বস্তির কারণ। ভাষণে তা ঠারেঠোরে মোদিকে বুঝিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। বুঝিয়েছেন, দু’‌দেশের পারস্পরিক চুক্তির পরিপন্থী ভারতের আমলাতন্ত্রের কড়াকড়ি সরালে ভারত–‌আমেরিকা উভয়েরই মঙ্গল। তাঁর আমলে দু’‌দেশের বাণিজ্য বেড়েছে ৪০ শতাংশ— এই দাবি করে ট্রাম্প মনে করিয়েছেন, ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানির বাজার আমেরিকাই। ২০ ঘণ্টা বিমানযাত্রা করে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ৩৬ ঘণ্টার ঝটিকা সফরের আসল উদ্দেশ্য ৩০০ কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি। আগামী কাল দিল্লিতে তা স্বাক্ষরিত হবে। ভারতই হবে আমেরিকার প্রতিরক্ষার সবচেয়ে বড় শরিক, মোতেরাতেই জানিয়ে দেন ট্রাম্প। আবারও এ–‌ও বলে দিলেন, মোদির ‌সঙ্গে রফা করা বড়ই কঠিন!‌ ভারত–‌আমেরিকা যৌথ সামরিক মহড়া ‘‌টাইগার ট্রায়াম্ফ’‌–‌এর কথা উল্লেখ করেন। অবধারিতভাবেই এসেছে সন্ত্রাসদমনের কথা। বলেছেন, ভারত ও আমেরিকা দু’‌দেশই ’‌মুসলিম সন্ত্রাসবাদীদের’‌ থেকে নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষায় দায়বদ্ধ। আবার, পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে সেদেশের মাটি থেকে সন্ত্রাসবাদীদের উৎখাত করতে কাজ করছে আমেরিকা, সে কথাও বলেন ট্রাম্প। 
আমেরিকার কাজ ভারতে চলে যাওয়া নিয়ে ট্রাম্পের উষ্মা সুবিদিত। গত নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট হলে আমেরিকার চাকরিতে মার্কিনিদের অগ্রাধিকার থাকবে। এদিন বললেন, ‘‌অর্থনৈতিকভাবে চাঙ্গা আমেরিকা ভারতের পক্ষে ভাল। বিশ্বের পক্ষেও। তাই আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, আমেরিকা সেরা সব কর্মসংস্থানের সুযোগ দিচ্ছে। ব্যবসা করার পথ সুগম করেছে। নতুন বিনিয়োগকারীর সুবিধা দেখছে। আমলাতন্ত্রের বাড়াবাড়ি রুখে অযথা করের বোঝা ছেঁটেছে।’‌ 
প্রধানমন্ত্রী মোদিকে এদিন প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বলেছেন, একদা–‌‘‌চাওয়ালা’‌ মোদির এই উত্থান প্রতিটি ভারতীয়ের কাছে জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত— পরিশ্রমে কী না হয়!‌ দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে দিনরাত এক করে কাজ করেন মোদি। যদিও, ট্রাম্পের উচ্চারণে ‘‌‌চাওয়ালা’‌ হয়ে যায় ‘‌চিওয়ালা’‌। আর বলেছেন,  ক্যাফেটেরিয়ায় কাজ করতেন মোদি!‌ উচ্চারণ–‌বিভ্রাট আরও ঘটিয়েছেন তিনি। ভারতের মাহাত্ম্য বর্ণনায় বেদকে বলেছেন ‘‌ভেস্তা’‌। স্বামী বিবেকানন্দের নাম উচ্চারণের ভুলে দাঁড়িয়েছে ‘‌বিবেকামানান’‌!‌ ক্রিকেটে সুপার–‌পাওয়ার ভারতের দুই যশশ্বীকে বলেছেন ‘‌শুচিন’‌ তেন্ডুলকর এবং ‘‌বিরুট’‌ কোহলি। উপস্থিত জনতাকে আমোদিত করে বলিউডের প্রসঙ্গ তোলেন ট্রাম্প। বলেন, বলিউড সারা বিশ্বের মানুষকে আনন্দ দেয়। ভারতের সংস্কৃতি বোঝার বড় মাধ্যম ভারতের ছবি। প্রতি বছর ২ হাজার ছবি হয় বলিউডে। ‘‌শোলে’‌ এবং ‘‌দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে’–‌র‌ উল্লেখ করেন ট্রাম্প। প্রসঙ্গত, ২০১৫–‌এ মুম্বইয়ে এক অনুষ্ঠানে ‘‌দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে’–‌র‌ একটি বিখ্যাত সংলাপ আওড়েছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। 
আজ দুপুর দেড়টায় মোতেরায় পৌঁছোন অতিথিরা। সজ্জিত তোরণ পেরিয়ে স্টেডিয়ামের মূল ফটকে যান লিফটে চড়ে। স্টেডিয়ামে ঢোকার পথে ট্রাম্প ও মেলানিয়া, ইভাঙ্কা ও জারেডকে অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, সস্ত্রীক গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রূপাণি। দুই রাষ্ট্রনেতার ২২ কিমির এই রোড–‌শো–‌র নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। তবে আসলে যা হল, তাকে ঠিক চেনা রোড–‌শো বলা চলে না। কালো কাচে ঢাকা গাড়িতে বেরিয়ে গেলেন ট্রাম্প, মোদি ও তাঁর পার্ষদরা। পেছনে পেছনে রওনা দিল কনভয়। অপেক্ষারত জনতা দেখলেন স্রেফ গাড়ির মিছিল। এইটুকুর জন্য স্টেডিয়াম সংলগ্ন বস্তির মালিন্য দেওয়াল তুলে ঢাকতে হল!‌ আজ বেলা ১১-‌৫৫ নাগাদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের আকাশযান এয়ারফোর্স ওয়ান আমেদাবাদের মাটি ছুঁতে শুরু হয়ে যায় ‘‌হাগপ্লোমেসি’‌। বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। গভীর আলিঙ্গনে আপ্যায়ন করেন ট্রাম্পকে। মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে করমর্দন করে তাঁদের এগিয়ে দিলেন লাল কার্পেট অভ্যর্থনায়। 
শুরু হল শঙ্খনিনাদ। তাতে কিঞ্চিৎ বিস্মিত ট্রাম্পের কানের কাছে মুখ রেখে এর গুরুত্ব বোঝান মোদি। শঙ্খধ্বনি শেষ হতে লাল কার্পেট মোড়া চত্বরের দু’‌পাশে গুজরাটের বিভিন্ন লোকনৃত্য পরিবেশন করলেন শিল্পীরা। ট্রাম্প এবং মেলানিয়া একবার ডাইনে, একবার বাঁয়ে দেখলেন কেবল। এরপর হেঁটে গেলেন অপেক্ষারত বিস্ফোরণ–‌প্রতিরোধক বিশাল গাড়ির দিকে, যার চালু নাম ‘‌দ্য বিস্ট’‌। সাত আসনের ওই গাড়ির পেছনে আরও একটি পেল্লায় গাড়িতে উঠলেন ট্রাম্পকন্যা ইভাঙ্কা ও তাঁর স্বামী জারেড কুশনার, যাঁরা মার্কিন প্রশাসনের পদস্থ উপদেষ্টাও বটে। তারও পেছনে চলল ট্রাম্পের সুবিশাল কনভয়। 

‌বলছি না, দেখছি না, শুনছি না। গান্ধীর সেই তিন বঁাদরের তাৎপর্য ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মেলানিয়াকে বোঝাচ্ছেন মোদি।  সাবরমতীর গান্ধী আশ্রমে, সোমবার। ছবি:‌ পিটিআই
 

জনপ্রিয়

Back To Top