বিভিন্ন ভোটে তাঁর কৌশল মেনে সফল রাজনীতিকরা। মমতা ব্যানার্জি এবার বাংলায় আনলেন সেই প্রশান্ত কিশোরকে। সাফল্যের কাহিনি মাপলেন রাজীব ঘোষ।

‘‌পিকে’‌। আমির খানের সুপারহিট ছবি নয়। এই চরিত্রটি রাজনীতির ব্লকবাস্টার। পলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজিস্ট প্রশান্ত কিশোর। রহস্যময় কোনও উড়ন্ত চাকতি থেকে নেমে আসা মহাজাগতিক প্রাণী নন। এই ‘‌পিকে’‌ নেহাতই মাটির মানুষ। আর সেটাই তাঁর ইউএসপি। নির্বাচনী গবেষণাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন বলেই এত চাহিদা। বুথ ধরে সমীক্ষা, স্থানীয় সমস্যা বুঝে পরিকল্পনাই তাঁর কাজ। এই কাজটা অতীতে বামপন্থীরা চমৎকার করেছেন। প্রয়োগে সফলও হয়েছেন। নির্বাচনী কৌশলের জেনারেশনেক্সট বলা যায় প্রশান্তকে। কারণ, নিছক স্বেচ্ছাসেবী রাজনৈতিক কর্মী বা হোলটাইমারদের বদলে তিনি এনেছেন পেশাদারদের। অভিনবত্ব এনেছেন প্রচারে ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে। নিজেদের শক্তি আর বিপক্ষের দুর্বলতা বুঝে এগোতে শিখিয়েছেন। নীতীশ কুমারের দলের ভোটব্যাঙ্ক কুর্মীরা। বিহারে যাদের ভোট মাত্র ৩ শতাংশ। কিন্তু ওই ৩ শতাংশই নীতীশকে ক্ষমতায় রেখে দিচ্ছে। কারণ, নীতীশ যে জোটে যাবেন, সেই জোটের ভোট চলে যাবে ৪৫ শতাংশে। এটা প্রশান্তের অঙ্ক। লালুরা নীতীশকে জোটে পেয়ে বড় জয় পেয়েছিলেন। বিজেপি–‌ও তাই নিজেদের জেতা আসন ছেড়ে জোট করতে দ্বিধা করেনি।  
বিভিন্ন সমীকরণ বিশ্লেষণ করে খামতি মিটিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছনই প্রশান্তের সাফল্যের চাবিকাঠি। তিনি যাঁর সঙ্গে থেকেছেন, তিনিই সাফল্যের স্বাদ পেয়েছেন। নিজে অন্তরালেই থাকেন ‘মেঘনাদ’ প্রশান্ত। গুজরাট, বিহার, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ হয়ে এ বার প্রশান্তের টাস্ক— পশ্চিমবঙ্গ। ভারতের কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা বলা যায় প্রশান্তের কোম্পানি আইপ্যাক–‌কে। ‘‌সিক্সপ্যাক’‌–‌এর মতেই শক্তিশালী এখন।  
জন্ম ১৯৭৭ সালে, বিহারের রোহতাস জেলার কোরান গ্রামে। বাবা পরে চলে যান বক্সারে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে হায়দরাবাদে যান প্রশান্ত। যোগ দেন রাষ্ট্রপুঞ্জের স্বাস্থ্যবিভাগে। কর্মস্থল আফ্রিকা। আট বছর চাকরি। ২০১১ সালে ফেরেন দেশে। গড়েন সিটিজেন্স ফর অ্যাকাউন্টেবল গভর্নমেন্ট (সিএজি)। নিয়োগ করেন আইআইটি, আইআইএমের পেশাদারদের। পরের বছরই গুজরাটে বিধানসভা ভোটের রণকৌশল তৈরি করতে তাঁকে নিয়োগ করেন নরেন্দ্র মোদি। জহুরির চোখ, মানতেই হবে। 
কাজটা সহজ ছিল না। তখন ১০ বছর মুখ্যমন্ত্রী মোদি। প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া ছিল। কিন্তু উন্নয়নের সঙ্গে ঐক্যের বার্তা জুড়ে দিলেন প্রশান্ত। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সেই শুরু। মোদি জিতলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ভিত সেদিনই গড়া হল, পাকা হল প্রশান্তের আসনটিও। জাতীয় স্তরে মোদিকে তুলে ধরার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে পড়তেই প্রশান্তের মাস্টার স্ট্রোক–‌ ‘চায় পে চর্চা’, ‘রান ফর ইউনিটি’। বিপুল জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন মোদি। 
কিন্তু ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরই শুরু সঙ্ঘাত। মূলত অমিত শাহের সঙ্গে। মোদিকে ছেড়ে গড়লেন ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি। কানাডার সংস্থা পিএসির অনুকরণে। মার্কিন মুলুকে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের ভোটপ্রচার এবং রণকৌশল তৈরির কাজ করে এই সংস্থা। আমেরিকায় ভোট প্রচারের মন্ত্র হল ‘‌লবি’‌ করা। প্রশান্তর সংস্থা রাজনৈতিক দলের প্রচারকে একটা শৃঙ্খলায় বেঁধে দেয়। বলে দেয়, বক্তৃতায় কী বলতে হবে, কীভাবে প্রতিক্রিয়া সামলাতে হবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় কোন বিষয় তুলতে হবে, মতামতের অভিমুখ নিজেদের দিকে ঘোরাতে হবে৷ ভোটের ময়দানে প্রচারকে  বিজ্ঞানের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াই প্রশান্তের মূল দক্ষতা। নির্বাচনে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেছেন, হলোগ্রামে মোদিকে পৌঁছে দিয়েছেন প্রত্যন্ত এলাকায়। তাঁর দেখানো পথে নয় নয় করে ১৫০ টি সংস্থা নির্বাচনী কাজে নেমেছে। নরেশ অরোরা, বিবেক বাগড়িরা সফল হচ্ছেন। ভারতের নির্বাচনের ন্যারেটিভও যেন ঝুঁকে যাচ্ছে মার্কিন ধাঁচে রাষ্ট্রপতিপ্রধান সরকারের দিকে। 
২০১৫ সালের প্রশান্ত যোগ দেন নীতীশের সঙ্গে। বিপুল সাফল্য পায় লালুর মহাজোট। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হন নীতীশ। এলাকাভিত্তিক নীতীশের বয়ান তৈরি করতেন প্রশান্ত। মোদিও সেই পথেরই পথিক। নীতীশের উপদেষ্টা হিসেবে বেশ কিছু জনমুখী পরিকল্পনার রূপায়ণ হয়েছে প্রশান্তের হাত ধরেই।
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে থেকেই মোদির ‘কোর টিমে’ সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন প্রশান্ত। মোদি কীভাবে সংবাদমাধ্যম সামলাবেন, সোশ্যাল নেটওয়ার্কে বিজেপি কোন বিষয়ে লিখবে— সব ঠিক করতেন তিনি। এক টিভি সাক্ষাৎকার থেকে মেজাজ হারিয়ে উঠে গিয়েছিলেন মোদি। সেই সাক্ষাৎকার একাধিকবার মোদিকে দেখিয়ে ভুল ধরিয়ে দেন প্রশান্ত। 
কিন্তু অমিত শাহ তাঁকে দূরে ঠেলেছেন। নীতীশই বলেছেন, প্রশান্তকে দলে নিতে দু’‌বার তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন অমিত। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে নীতীশের দলেই যোগ দেন প্রশান্ত। যদিও সেই কেরিয়ার খুব উজ্জ্বল নয়। সহ সভাপতি করে দিলেও প্রশান্তকে বক্সার থেকে টিকিট দেননি নীতীশ। দলে বড় দায়িত্বও দেননি। ২০১৫ সালের পর মোদির সঙ্গে দেখা হয়নি। প্রশান্তের মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে সম্প্রতি ফোন করা ছাড়া।
প্রশান্তের হাত ধরেছিল কংগ্রেসও। ২০১৬ সালে পাঞ্জাবে ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিংহের নিশ্চিত জয়ের কারিগর ছিলেন ‘পিকে’। পরের বছর উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার ভোটেও প্রশান্ত। কেরিয়ারের প্রথম এবং একমাত্র ধাক্কা প্রশান্ত খেয়েছেন সেখানেই। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নামাতে বলেন। তখন কংগ্রেস রাজি হয়নি। এখন প্রিয়াঙ্কাকে নামাতে হয়েছে, সেই উত্তরপ্রদেশেই।
প্রশান্ত অবশ্য দমে যাননি। অন্ধ্রপ্রদেশে জগন্মোহন রেড্ডির সঙ্গে প্রায় দু’বছর ধরে কাজ করে বিপুল সাফল্য এনে দিয়েছেন। অন্ধ্রের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন জগন। লোকসভাতেও ২৫ আসনের মধ্যে ২৩টি দখল। কার্যত ধুয়েমুছে সাফ চন্দ্রবাবু এবং তাঁর দল টিডিপি। ‘‌বাই বাই বাবু’‌ স্লোগান দুরন্ত সফল। ৪ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষের কাছে  জগনকে পৌঁছে দেওয়া চাট্টিখানি কথা ছিল না।
এ বার ডাক পড়েছে কলকাতায়। আগামী বছর কলকাতা–সহ একাধিক পুরসভার নির্বাচন। তার সঙ্গেই ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের কৌশল ঠিক করবেন। মমতা ব্যানার্জি খুব ভাল জানেন নিজের ‘প্লাস পয়েন্ট’। নিজে ফিরছেন লড়াকু মেজাজে। পুলিশ, প্রশাসনে নাড়া দিয়েছেন। গোটা রাজ্যে দলের সংগঠন ঢেলে সাজিয়েছেন। দলকে ব্যস্ত রাখতে চাইছেন। ২০১৬ সালে প্রশান্তকে অপরিহার্য মনে করেননি। সম্ভবত এবারও মনে করছেন না। কিন্তু কোনও ফাঁকও রাখতে চান না মমতা। ‌

 

জনপ্রিয়

Back To Top