রাজীব চক্রবর্তী, দিল্লি: গলায় গাঁদাফুলের মালা। হুডখোলা গাড়ির ‌ওপর জোড়হাত। মুখে সর্বক্ষণ কৃত্রিম হাসি। ভোটভিক্ষার মোটামুটি এটাই পরিচিত ছবি। সিনেমার পর্দা থেকে শহুরে ভোটের ময়দান, এই ছবিই চোখে পড়ে। কিন্তু, অন্যরকমও হতে পারে। সাধারণ পোশাকে এ বাড়ি, ‌ও বাড়ি দৌড়চ্ছেন প্রার্থী। কলিং বেল বাজিয়ে সমস্যা জানতে চাইছেন। পার্কে মিঠে রোদ পোহানো বয়স্কদের পা-‌ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করছেন, কেমন আছেন?‌ তারপর ওই বয়স্ক নাগরিকরা প্রার্থীকে বুকে টেনে নিয়ে বলছেন, ‘কিছু খেয়েছিস?‌ ‌অনেকক্ষণ বেরিয়েছিস নিশ্চয়।‌ ঘরে আয়, কিছু খেয়ে যা।’‌ প্রার্থী যে এমন ভাবে ‌ঘরের ছেলে হয়ে উঠতে পারেন, সে ছবিটা সত্যিই অন্যরকম। 
২০১৩ সাল থেকে দক্ষিণ দিল্লির গ্রেটার কৈলাস কেন্দ্রের বিধায়ক সৌরভ ভরদ্বাজ। চিরাগ দিল্লির বাসিন্দা বছর চল্লিশের এই তরুণকে এবারও প্রার্থী করেছেন আপ প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল। এই কেন্দ্রে বাঙালি ভোটার সবচেয়ে বেশি। সৌরভের সঙ্গে ঘুরে তাঁর প্রচার দেখার কথা ছিল। নির্দিষ্ট সময়েই এলেন বিধায়ক। ছটফটে সুদর্শন যুবক। জনা তিরিশেক কর্মী, সমর্থককে সঙ্গে নিয়ে শুরু হল প্রচার। কয়েকশো লিফলেট চার ভাগে ভাগ করে দেওয়া হল। বিধায়ক যে পাড়ায় পা-‌রাখছেন, সবাই জড়িয়ে ধরছেন। তিনি কেমন আছেন জানতে চাইছেন। বেশির ভাগের বক্তব্য, ‘‌এলেন কেন, ভোট তো এমনিতেই দেব।’‌ এরমাঝে বিধায়ককে সামনে পেয়ে বাঙালি গৃহবধূ নমিতা মুখার্জির ও তাঁর স্কুলপড়ুয়া ৭ বছরের মেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। কোনও এক শংসাপত্র প্রয়োজন। বিধায়ক সব শুনে বললেন, ‘‌দিদি, যখন খুশি এসে নিয়ে যাবেন।’‌ সৌরভ বললেন, ‘‌বাঙালি ভোটারদের সঙ্গে মিশে দেখেছি, ওঁরা অন্যদের থেকে সব দিক থেকে আলাদা। যুক্তি দিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন। বিজ্ঞানমনস্ক হন। সংস্কৃতি চর্চা করেন। উদারমনস্ক হন। তাই এই কেন্দ্রে বিজেপি–‌‌র সুবিধে হবে না।’‌ 
এই কেন্দ্রে পুর নিগম পার্ষদ শিখা রায়কে প্রার্থী করেছে বিজেপি। রয়েছেন বিজেপি সাংসদ মীনাক্ষী লেখি। কিন্তু, সৌরভ এগোচ্ছেন নিশ্চিন্তেই। এক পার্কে সুরমা আগরওয়াল নামে এক বৃদ্ধার গলায় উল্টো সুর। কপালে গেরুয়া তিলক টানা বৃদ্ধার জোর গলায় অভিযোগ, কোথায় বিনামূল্যে বিদ্যুৎ?‌ গতমাসে ৭ হাজার টাকা বিদ্যুতের বিল মেটাতে হয়েছে!‌ সঙ্গী আরও কয়েকজন বৃদ্ধাকে নিজের বক্তব্যের সমর্থনে গলা মেলাতে বললেন তিনি। বিধায়ক সৌরভ ও তাঁর দলের কর্মীরা শান্ত হয়ে বললেন, ‘‌মাতাজি, আমরা দাঁড়াচ্ছি, আপনি ওই বিদ্যুতের বিলটা আনুন।’‌ বৃদ্ধা আর নড়লেন না। এগিয়ে গেলেন আপ প্রার্থী। পড়শিরা বললেন, ‘উনি বিজেপি সমর্থক। শেখানো বুলি আওড়েছেন। ‌এ পাড়ায় গত ৮ মাসে নব্বই শতাংশ বাসিন্দার বিদ্যুতের বিল শূন্য এসেছে।’‌ 
স্থানীয় আরাবল্লি মসজিদ থেকে দুপুরের নমাজ সেরে বেরোচ্ছেন বহু মানুষ। তাঁদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে লিফলেট। শনিবার সন্ধ্যা ছ’‌টায় ডিডিএ ফ্ল্যাট–‌‌সংলগ্ন রঘুনাথ মন্দিরের সামনে জনসভা। ভাষণ দেবেন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। উপস্থিত থাকার আবেদন রয়েছে লিফলেটের এক পিঠে। উল্টো দিকে ডিডিএ ফ্ল্যাট এলাকায় আপ আমলে এপর্যন্ত যে ১০টি বড় কাজ হয়েছে, তার উল্লেখ করা হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ৪২৯ বাসস্ট্যান্ডে বাতানুকূল মহল্লা ক্লিনিক, যেখানে সমস্ত রোগের চিকিৎসা–‌‌সহ বিনামূল্যে ২১৪ ধরনের টেস্ট করা হয়। জনবসতি এলাকায় ৪টি মদের দোকান বন্ধ করা হয়েছে। প্রচুর সিসিটিভি লাগানো হয়েছে। পুর নিগমের পার্কে জিম–‌‌সহ ছোটদের খেলাধুলার সরঞ্জাম বসানো হয়েছে, ইত্যাদি। এসবের উল্লেখ তো থাকতেই হবে। কারণ, আপ যে শুধু কাজের নিরিখেই ভোট চাইছে।‌‌

প্রচারে আপ প্রার্থী সৌরভ ভরদ্বাজ। ছবি: প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top