আজকাল ওয়েবডেস্ক:‌ সাম্প্রতিককালে ইউপিএসসি পরীক্ষায় সংখ্যালঘুদের সাফল্য নজর কেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই চর্চার কেন্দ্রে জামিয়া এবং জাকাত ফাউন্ডেশনের মতো সংখ্যালঘুদের জন্য তৈরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ প্রভাবিত এক কোচিং সেন্টার দাবি করেছে, এ বছর ইউপিএসসি–তে কৃতীদের ৬১ শতাংশই তাঁদের প্রশিক্ষিত। 
এবছর ইউপিএসসি–তে সফল হয়েছে ৭৫৯ জন। তাঁদের মধ্যে ৪৬৬ জনি নাকি সঙ্কল্প ফাউন্ডেশনের ইন্টারভিউ গাইডেন্স প্রোগ্রাম (‌আইজিপি)‌–এ ভর্তি হয়েছিলেন। আজ থেকে নয়, ১৯৮৬ সাল থেকে কাজটা করে চলেছে সঙ্কল্প। ৩৪ বছর ধরে সাফল্যের ধারা অব্যাহত বলেও তাদের দাবি। 
প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে লেখা রয়েছে, ২০১৮ সালে ৯৯০ জন ইউপিএসসি–তে সফল হন। তাঁদের মধ্যে ৬৪৯ জনই নাকি এই আইজিপি–তে ভর্তি হয়েছিলেন। ২০১৭, ২০১৬ এবং ২০১৫ সালে এই সংখ্যাটা ছিল ৬৮৯, ৬৪৮, ৬৭০। সেখানে ওই বছরগুলোয় ইউপিএসসি–তে মোট কৃতীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১,০৯৯, ১,০৭৮ এবং ১,২৩৬। যদিও অন্তরের খবর, প্রতি বছর কৃতীদের মধ্যে ১০ শতাংশ এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পড়াশোনা করে থাকেন। 
দেশে ইউপিএসসি–র প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য যে ক’‌টি কোচিং সেন্টার রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম এই সঙ্কল্প। তবে বরাবর প্রচারের আড়ালেই থেকেছে এই অলাভজনক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন দিল্লির প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার আর জি গুপ্তা। তিনি জানালেন, ‘‌আমাদের কাজের ধরন অন্য কোচিং সেন্টারের থেকে একেবারে আলাদা। আমরা চুপচাপ কাজ করতে পছন্দ করি। সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথাবার্তা বলি না। প্রচার চাই না। ৩০ বছর সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কোনও কথাই বলিনি।’‌ গুপ্তা এও জানালেন, এই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য শুধু শিক্ষার্থী এবং তাঁদের পরিবারকেই দেওয়া হয়। 
বলা হয়, এই কোচিং সেন্টার নাকি আসলে সঙ্ঘচালিত। তবে প্রকাশ্যে কেউ একথা স্বীকার করেন না। সে কোচিং সেন্টারেরই হোক বা সঙ্ঘের। প্রতি বছর এই কোচিং সেন্টারের অনুষ্ঠানে যোগ দেন বিজেপি–র নেতা–মন্ত্রীরা। আসন্ন একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চলেছেন কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এবং প্রাক্তন আইপিএস অফিসার আর এন রবি। প্রতিষ্ঠানের কৃতী পড়ুয়াদের সঙ্গে কথা বলবেন তাঁরা। গত বছর এসেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি, প্রকাশ জাভরেকর, রমেশ পোখরিয়ালের সঙ্গেও পড়ুয়াদের ছবি রয়েছে। 
তার পরেই যদিও সঙ্ঘের সঙ্গে যোগ মানতে চাইলেন না প্রাক্তন আইপিএস গুপ্তা। বললেন, ‘‌আমরা স্বাধীন সংগঠন। সোসাইটিস রেজিস্ট্রেশন আইন মোতাবেক।’‌ তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সঙ্ঘ কর্মী বললেন, ‘‌এটা সঙ্ঘ চালিত নয়, বরং প্রভাবিত বলা ঠিক হবে।’‌ 
তিনিই জানালেন এই কোচিং সেন্টার প্রতিষ্ঠার কারণ। আটের দশকে অনেক সঙ্ঘকর্মীই ইউপিএসসি দিতে চাইতেন। তাঁদের প্রশিক্ষণের জন্যই এই সঙ্কল্প ফাউন্ডেশন গড়ে ওঠে। তাছাড়া আরও একটা অভিসন্ধিও ছিল। তখন আমলারা ‘‌বামপন্থা’‌ দ্বারাই প্রভাবিত হতেন। ভাবা হত, জেএনইউ বা তার মতো অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা ছেলে–মেয়েরাই দেশের আমলা হবে। সেই ধারণায় ইতি টানতেই সঙ্কল্পের জন্ম। 
ওই কর্মীর কথায়, ‘‌এখন যেমন দেখছেন, অনেক আমলাই জাতীয়তাবাদী, তখন বিষয়টা এ রকম ছিল না।’‌ প্রতিষ্ঠান বছরে ২৬ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল সঙ্কল্প। ১৪ জনই ইউপিএসসি–তে সফল হয়। ধীরে ধীরে এই সাফল্য বাড়তে থাকে। ১৯৯৯–২০০০ সালে এখানে পাঠরত ৯০ শতাংশেরও বেশি পড়ুয়া ইউপিএসসি–তে সফল হয়। দিল্লির পর আগ্রা, লুধিয়ানা, ভোপাল, ভিলাইতেও খোলা হয় এর শাখা।
এই কোচিংয়ে ভর্তি হতে গেলে কি পরীক্ষা দিতে হয়?‌ গুপ্তা জানালেন, সে রকম কোনও ব্যবস্থা এই। তবে ওই সঙ্ঘ কর্মীর কথায়, প্রাথমিক একটি স্ক্রিনিং হয়। ‘‌কট্টরপন্থী’‌দের ভর্তি নেওয়া হয় না। ওই কর্মী এও জানালেন, পড়ানোর ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা অবলম্বন করা হয়। 
কী রকম?‌ ওই কর্মীই বুঝিয়ে দিলেন পড়ানোর ধরন। ‘‌নক্সালবাদ বা কমিউনিজ্‌মকে মহিমান্বিত করে দেখানো হয় না। ৩৭০ ধারা রদ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধির গুরুত্ব বোঝানো হয়।’‌
প্রাক্তন আমলারা অবশ্য এধরনের কোনও ভাবাধারায় প্রভাবিত কোচিং সেন্টার নিয়ে আশঙ্কার কিছু দেখছেন না। প্রাক্তন আইএএস অফিসার টিআর রঘুনন্দনের মতে, ‘‌সঙ্কল্প আমলাতন্ত্রের কাঠামো বা ‘‌সর্বব্যাপী প্রকৃতি’‌ বদলাতে পারবে না। যতদিন ইউপিএসসি–র বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে, ততদিন ভয়ের কিছু নেই।’‌

জনপ্রিয়

Back To Top