ভোলানাথ ঘড়ই ■ ‌মাধেপুরা: বিহার জুড়ে কথাটা খুবই প্রচলিত, ‘‌রোম অগর পোপ কা, তো মাধেপুরা গোপ কা’‌। কোশি নদীর কোলে জনপদ। মূলত গোপ অর্থাৎ যাদবদের এলাকা। যেন মথুরা থেকে বৃন্দাবনে এলাম। মাধেপুরার গ্রাম গোপালন, চাষবাসে অভ্যস্ত প্রাচীন জনপদ। পুরনো পুরসভা ঘিরে শহরে আধুনিকতার ছোঁয়া, হাতে হাতে মোবাইল ফোন। প্রার্থিতালিকা দেখলেই বোঝা যাবে, কেন ‘‌মাধেপুরা গোপ কা’‌। বিহারে ছাপড়ার পর এই মাধেপুরা লালুপ্রসাদের ‘‌দ্বিতীয় গড়’‌। তবে ভারতের সর্বত্র মাধেপুরার নাম ছড়িয়ে দিয়েছেন বাহুবলী রাজনীতিবিদ রাজেশ রঞ্জন। নাম না বলে বদনাম বলা উচিত। রাজেশ রঞ্জন নামটা কি অচেনা ঠেকল?‌ পাপ্পু যাদব। তিনি অবশ্য চান তাঁকে সবাই নেতাজি ডাকুক, তাঁর প্রসাদ পাওয়া ভক্তরা ডাকেনও এই নামে। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি, কংগ্রেস এমনকী তাঁর শেষ ভরসা লালুপ্রসাদের দুয়ার থেকেও ঘাড়ধাক্কা খেয়ে ফিরেছেন। কেউ টিকিট দেয়নি। কংগ্রেস অবশ্য তাঁর স্ত্রী রঞ্জিত রঞ্জনকে টিকিট দিয়েছে। কিন্তু সিটিং এমপি, নেতাজি ভোটে দাঁড়াবেন না?‌ তাই কি হয়?‌ ২০১৫ সালে নিজের গড়া দল জনঅধিকার পার্টির নামে হকিস্টিক ও বল চিহ্নে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। নিন্দুকে বলছে নরেন্দ্র মোদির ইশারাতেই তিনি এখানে ভোট কাটতে দাঁড়িয়েছেন। 
অন্যদিকে, এবার এনডিএ–‌‌র জনতা দল ইউনাইটেডের দীনেশচন্দ্র যাদব। তিনবারের এমএলএ। আর রাষ্ট্রীয় জনতা দলের বর্ষীয়ান শারদ যাদব। মানে এবার মাধেপুরা লোকসভায় যাদবদেরই ত্রিমুখী লড়াই। ১৯৯৭ থেকে ‌২০১৯। বিহারে একটি রাজনৈতিক ইতিহাসের বৃত্ত সম্পূর্ণ হতে ২২ বছর লাগল।‌‌ একসঙ্গে পথচলা দুই সমাজবাদী নেতা লালুপ্রসাদ ও শারদ যাদবের মিত্রতার কথা সবাই জানে। শত্রুতার কথা আরও বেশি জানে মানুষ। শত্রুতার শুরু ১৯৯৭-‌এ। লালুপ্রসাদ তখনও লালু যাদব। জনতা দলের সর্বভারতীয় সভাপতি। পশুখাদ্য মামলায় বিহারের মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে সরগরম সবাই। দলের মধ্যেই লালুকে কোণঠাসা করে ফেলেন শারদ। মুখ্যমন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগের দাবি তোলেন। কোণঠাসা অবস্থায় প্রথমে লালু ১৬ জন সাংসদ, ৬ জন রাজ্যসভার সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে আলাদা দল গড়েন, রাষ্ট্রীয় জনতা দল। তারপর বিহারে নিজের সরকার বাঁচাতে নিজে পদত্যাগ করে রাবড়ি দেবীকে মুখ্যমন্ত্রী করেন। শত্রুতা অবশ্য এখানেই শেষ হয়নি। প্রায় সাপে–‌নেউলে হয়ে ওঠেন তাঁরা। কী দিল্লিতে কী বিহারে। যেখানেই সামনে পেয়েছেন, সেখানেই জনতাদল নেতা শারদ যাদবকে চূড়ান্ত অপদস্ত করেছেন লালু। এই মাধেপুরাতেই তিন তিনবার নির্বাচনে পরাস্ত করেছেন। ১৯৯৮ সালেই নির্বাচনে শারদ যাদবের মাধেপুরা লোকসভা কেন্দ্র কেড়ে নেন লালু। আরও দুবার, একবার তিনি নিজে, আর একবার এই বাহুবলী নেতা পাপ্পু যাদবকে দিয়ে মাধেপুরায় গো-‌হারান হারান শারদ যাদবকে। কিন্তু সময় যখন খারাপ হয়, দুর্যোগ সামনে আসে, তখন সাপ আর নেউল একই গাছে আশ্রয় নেয়, অস্তিত্বের সঙ্কটে। ২০১৪-য় মোদি হাওয়া যা পারেনি, ২০১৯ কিন্তু তাই করে দেখাল। কারণ সঙ্কট এখন উভয়পক্ষে। লালুপ্রসাদ জেলে। আর জেডিইউ–‌তেও এখন কোণঠাসা শারদ যাদব। নীতীশকুমারও তাঁর পাশে নেই। বিজেপিও তাঁর বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত। এতটাই খড়্গহস্ত যে, শারদ যাদবের আতঙ্কিত মন্তব্য, ‘‌নরেন্দ্র মোদি ফের প্রধানমন্ত্রী হলে হয় আমায় জেলে ঢোকাবে, না হয় খুন হয়ে যাব।’‌ তাই সঙ্কটে আজ গলায় গলায় লালু ও শারদ?‌ মাধেপুরায় এবারে তিনি রাষ্ট্রীয় জনতা দলের হারিকেন প্রতীকেই লড়বেন। ৭০ পেরিয়েছেন, দাপট কমেনি এতটুকুও। সরাসরি বিজেপির বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে তিনি বলছেন, এই বিজেপি–‌কে হারাতে না পারলে দেশের গণতন্ত্র, সংবিধান কিছুই বাঁচানো যাবে না। দেশও বাঁচবে না। 
মাধেপুরা লোকসভা এলাকা যাদবদেরই গড়। সেই সঙ্গে সামান্য কিছু অন্য জাতের মানুষ থাকলেও, একটা বড় অংশ মুসলমান। তারা লালু যাদব, শারদ যাদব বুঝতে চান না। বলছেন, বিজেপি–‌কে হারাও। নীতীশকুমার বিজেপির সঙ্গে আছে। মহাগঠবন্ধনের প্রার্থীকে জেতাও। এখানে এনডিএ জোটের প্রার্থী জেডিইউ নেতা দীনেশচন্দ্র যাদব কিন্তু খাতায়–‌কলমে এগিয়ে। এই লোকসভা এলাকায় ৬টি বিধানসভা। আলমনগর, বিহারিগঞ্জ, মাধেপুরা, মাহিসি, সহর্ষ ও শোনবর্ষা। তিনটি জেডিইউ–‌র, একটি বিজেপির, দুটি আরজেডি-‌র দখলে। তবে স্কোরবোর্ড গাধা। কারণ এটা ২০১৫ সালের ভোটের ফল। যখন লালু আর নীতীশ একসঙ্গে লড়েছিলেন বিজেপির বিরুদ্ধে। স্থানীয় লোকে বলছে, মাধেপুরা লালুর গড়। সবচেয়ে বড় কথা বিজেপির সঙ্গে যাওয়ায় নীতীশেরও আর সে দিন নেই মাধেপুরায়। আর পাপ্পু যাদব?‌ ২০১৫ সালের ভোটে জন অধিকার পার্টি নাম নিয়ে কোথাও তেমন কোনও দাগ কাটতে পারেননি। আগে বেশ কয়েকবার নির্দল হয়ে জিতে যাওয়ায়, এলাকায় তিনি নেতাজি বা মসিহা নামে পরিচিত হয়েছিলেন ঠিকই, তবে কোশি নদী দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। চড়া পড়েছে কোথাও কোথাও। তিনদিন নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহের দুয়ারে ধর্না দিয়েও এনডিএ-‌র টিকিট জোটেনি।‌ আপাতত ভোট কাটার অ্যাসাইনমেন্ট। কিন্তু এবার মাধেপুরার ভোট তাঁর নয়, নীতীশেরও নয়।
তেমন আগমার্কা গো–‌সন্তানের দেখা মেলেনি মাধেপুরায়। মাধেপুরার লড়াই এবার মহাজোট বনাম নরেন্দ্র মোদির। সেই সঙ্গে লালুপ্রসাদ আর শারদ যাদবের অস্তিত্বের লড়াই, দুই সমাজবাদী নেতার সম্পর্কের বৃত্ত সম্পূর্ণ হওয়ার লড়াই।‌

জনপ্রিয়

Back To Top