আজকাল ওয়েবডেস্ক: ‘রিপাবলিক’। প্রজাতন্ত্র। সাধারণ মানুষ ‘রাষ্ট্র’ তৈরি করে। অর্থাৎ ভোট দিয়ে সরকার তৈরি করে। এ তো গণতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবেই জানা কথা। তার উপর আবার প্রজাতন্ত্র কেন? রাজার বিপরীতে প্রজা। মানে, যে সব দেশ রাজ-শাসিত নয়, সেগুলোই প্রজাতন্ত্র! ‘রিপাবলিকান’ দেশ। শব্দটার মধ্যে আসলে রাজা-প্রজা বাদ দিয়েও একটা আলাদা কথা আছে। কেবল ভোট দিয়ে সরকার তৈরি-র ব্যাপার নয়। সব রকম সরকারের উপরে ‘রাষ্ট্র’। সেটাই আসলে জনসাধারণের। সব সাধারণের সম্পত্তি। সেখানেই এ দেশের সব মানুষের সমতা ও দায়িত্বের নির্দেশ। ব্যক্তি-স্বাধীনতা। ব্যক্তি-অধিকারের চূড়ান্ত স্বীকৃতি। এই সব চেনাশোনা কথাগুলো ভাবতে গিয়ে মনে হয়, ২০২০ সালের প্রজাতান্ত্রিক দিবসটা যেন বিগত কয়েক বছরের মতো খানিক তির্যকতায় আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। দিল্লির রাজপথে উদযাপনের তুঙ্গ সমারোহে তুষ্টি হচ্ছে দেশি-বিদেশি রাষ্ট্রনায়কদের। কিন্তু তাঁদের উজ্জ্বল আলোকবর্তিকার পিছনকার বিপুল আঁধারের দেশ থেকে ভেসে আসছে একটা ভর্ত্সনা। রাষ্ট্র দেশের সব মানুষের সম্পত্তি। ‘প্রজাতন্ত্র’ অর্থাৎ সকলের অধিকার ও দায়িত্ব প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। সেটা গণতন্ত্রের অধিকারের চেয়ে অনেকখানি বড়। শ্রেণি, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, সমাজ, সব কিছুর ঊর্ধ্বে ব্যক্তির সেই অধিকার। সব নাগরিককে রাষ্ট্র সমান করে দেখবে। সব নাগরিক রাষ্ট্রকে সমান করে কাছে পাবে। প্রজাতন্ত্র গণতন্ত্রের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। আর সেই গণতন্ত্র আজ বিপন্ন। নির্বাচনী গণতন্ত্র জেনে-বুঝে ডেকে এনেছে সংখ্যাগুরু তন্ত্রকে। এই সংখ্যাগুরু তন্ত্রই আজ মারনযজ্ঞে নেমেছে গণতন্ত্র এবং প্রজাতন্ত্রের বিনাশ ঘটাতে। ঠিক যেভাবে ১৯৩৩ সালে জার্মানিতে হিটলারও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিলেন। যে সংখ্যাগুরু তন্ত্রের জোর খাটিয়ে রাষ্ট্রনায়করা গণতন্ত্র সর্বোপরি প্রজাতন্ত্র কে ধ্বংস করতে চাইছে সেই সংখ্যাগুরু তন্ত্র কেই হাতিয়ার করে যুদ্ধে নামার সময় এসে গিয়েছে। প্রত্যাখ্যান প্রয়োজন। রেডিক্যাল প্রত্যাখ্যান। পর্তুগিজ লেখক হোসে সারামাগো রেডিক্যাল প্রত্যাখ্যানের ডাক দিয়েছিলেন। ‘অ্যান এসে অন ল্যুসিডিটি’। ১৯৯৪ সালে পর্তুগিজ ভাষায় উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। এক অনামা গণতান্ত্রিক দেশ। রাজধানী শহর। নির্বাচনের দিন শহরে ভয়ঙ্কর বৃষ্টি। পোলিং বুথে কারও দেখা নেই। মনে হচ্ছে একটিও ভোট পড়বে না। ক্রমশ আবহাওয়া পরিষ্কার হয়। মানুষ দল বেঁধে পোলিংবুথে যান। ভোট গোনার পর্ব। দক্ষিণপন্থী দল পেয়েছে ১৩ শতাংশ ভোট। মধ্যপন্থী দল ৯ শতাংশ। বামপন্থী দলটি ২.৫ শতাংশ। বাকি ৭০ শতাংশ ব্যালট ফাঁকা। সেখানে কাউকেই ভোট দেওয়া হয়নি। দেশের সংবিধান অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে পুনর্নির্বাচন জরুরি। সরকার সম্মতিও দেয়। কিন্তু পুনর্নির্বাচনে অবস্থা আরও খারাপ। ৮৩ শতাংশ ব্যালট ফাঁকা। কাউকে ভোট দেওয়া হয়নি। মানুষ ভোটদানে অনুপস্থিতও ছিলেন না। তাঁরা ব্যালট পেপার নষ্টও করেননি। তাঁরা শুধু কাউকে ভোট দেননি। দক্ষিণপন্থী ও মধ্যপন্থীদের মধ্যে প্যানিক সৃষ্টি হয়। বামপন্থী পার্টি বলল, খালি ব্যালট মানে মানুষ তাদের চাইছে। সরকার অবশ্য একে প্রতিবাদ হিসেবে দেখছে না। সংবাদমাধ্যম সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। প্রশ্ন ওঠে, এটা কি তা হলে সংগঠিত ষড়যন্ত্র? যা শুধু সরকারকে উল্টে দিতে চায় না, বরং সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক সিস্টেমকে পাল্টে দিতে চায়? কারা আছে এর পিছনে? কীভাবে তারা হাজার হাজার মানুষকে সংগঠিত করল? যখন সাধারণ নাগরিক বলল, এটা তাঁদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। প্রশ্ন উঠল, ব্যালট ফাঁকা রাখা কি তাঁদের অধিকারের মধ্যে পড়ে? সরকার বলল, একটা গণতন্ত্র বিরোধী ষড়যন্ত্র চলছে। তাই সরকার দ্রুত একে 'সন্ত্রাসবাদ’ অ্যাখ্যা দেয়। দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে। পাঁচশো নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। যখন এ সব পদক্ষেপেও কোনও ফলই মেলে না, তখন দক্ষিণপন্থী সরকার দেশে শান্তিভঙ্গ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির নানান প্লট তৈরি করে। শহরের সব পথ বন্ধ করে দেয়। শহর কিন্তু স্বাভাবিক ভাবে চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত মাথা নত করে সরকার। উপন্যাসের এই ঘটনা পর্তুগাল বা অন্য গণতান্ত্রিক দেশে এখনও হয়নি। কিন্তু হতে পারে। এদেশেই পারে।

জনপ্রিয়

Back To Top