অরূপ বসু: ধানবাদের এ কে রায় ভাল নেই। তিন বারের সাংসদ, চার বারের বিধায়ক এখন কোনও–‌না–‌কোনও কমরেডের কুটিরে থাকেন। পক্ষাঘাতে শরীরের ডান দিক অসাড়। স্মৃতি ধূসর। বেশির ভাগ সময়ে মৌন। সাংসদ ও বিধায়ক হিসেবে প্রাপ্য পেনশন অনেক আগেই রাষ্ট্রপতির ত্রাণ তহবিলে দিয়ে দিয়েছেন। কোনও সরকারি সুযোগ–‌সুবিধাও নেন না।
রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হয়ে সাংসদদের ভাতা ও সুযোগ–‌সুবিধা বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সংসদে প্রতিবাদে একা মুখর হন এ কে রায় (‌অরুণ কুমার রায়)‌। লালকৃষ্ণ আদবানির সঙ্গেও তর্ক হয়। বলেছিলেন, ‘‌ভাল আয়, সচ্ছল জীবন চাইলে অন্য চাকরি বা ব্যবসা ছেড়ে আমরা জনতার সেবা করতে এসেছি কেন?‌’‌
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। সিন্ধ্রি ফার্টিলাইজারে গবেষক পদে যোগ দেন। শোষণ–বঞ্চনার প্রতিবাদে শ্রমিক–কর্মীদের আন্দোলন সমর্থন করায় বরখাস্ত হয়ে যেন হঁাফ ছেড়ে বঁাচলেন। এআইটিইউসি এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে নেমে পড়লেন।
১৯৩৫ সালে পূর্ব বঙ্গের সোপুরা গ্রামে জন্ম। ছাত্রজীবন কেটেছে দুই বাংলায়। ১৯৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়ে ঢাকার জেলে যান। মা–‌বাবা‌‌ও ইংরেজ–বিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৬০ সালে আইনজীবী বাবা পুরোপুরি ভারতে চলে আসেন। ১৯৬৭ সালে তিনি সিপিএমে‌র পক্ষে বিহারে নিরসা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক হন, ১৯৬৯ সালে আবার। ১৯৭১ সালে সমর সেনের ‘‌ফ্রন্টিয়ার’‌ কাগজে একটি নিবন্ধ লেখেন। তখন বিহারের সংগঠন দেখছেন প্রমোদ দাশগুপ্ত। বিহার রাজ্য কমিটির সদস্যকে শো–‌কজ করেন। জবাবে রায়বাবু (‌বিহারে এই নামেই পরিচিত)‌ লেখেন, ‘‌স্বতন্ত্র পার্টির লাইনে চলা পত্রিকায় তো পি রামমূর্তি লিখেছেন। নকশাল লাইনের সমর্থক ফ্রন্টিয়ারে লিখলে দোষ কেন?‌’‌ এ কে রায় বহিষ্কৃত হয়ে নতুন দল গড়েন, জনবাদী কিসান সংগ্রাম সমিতি। পরে মার্কসিস্ট কো‌অর্ডিনেশন কমিটি (‌এমসিসি)‌ নামে পরিচিত হয়।
একটা টেবিল, দুটি চেয়ার। শোয়ার জন্য মাদুর, খাবার ছাতু। ছোট্ট ঘর পার্টির অফিস, থাকার ঘর। আর ছিল কাঠের বাক্সে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ। বলতেন, ‘‌দরকারে ওদের ওষুধ দেবে কে?’‌‌ পাজামা–‌পাঞ্জাবি পরনে হেঁটেই এলাকা ঘুরতেন।
১৯৭৫ সালে জয়প্রকাশের ডাকে তিনিই প্রথম বিধায়ক পদ ছাড়েন। ১৯৭৭–এ‌র লোকসভা ভোটে জেল থেকেই বিরাট ব্যবধানে জেতেন।
শিবু সোরেন, গুরুদাস চ্যাটার্জি, আনন্দ মাহাতো, কৃপাশঙ্কর চ্যাটার্জি তঁারই হাতে গড়া। ২০০০ সালে গুরুদাস খুন হন। ২০১৪ সালের ১৪ জুন সাংসদ হিসেবে পাওয়া উপহার হাতঘড়িটি ছিনতাই হয়ে যায়। তঁারই আন্দোলনের জেরে একদা ১০ হাজার কর্মীর কাজ পাকা হয়েছে কোলিয়ারিতে। এখন ভোটার চায় নগদ বিদায়। দুসাড়, কুর্মি বস্তিতেও তাই টিপ্পনী:‌ রায়বাবুকে ভোট দিয়ে কী লাভ?‌ পরঞ্জয় গুহ ঠাকুরতা এ কে রায়কে নিয়ে অবশ্য একটি তথ্যচিত্র করছেন। এখন তার চিত্রনাট্য লেখায় ব্যস্ত এমসিসি–‌র এক কমরেড অজিত রায়।‌‌‌‌‌

এ কে রায়

জনপ্রিয়

Back To Top