অরুন্ধতী মুখার্জি ■ পুরী: বদলে গেল পোশাকটা। বদলে গেল সাজগোজ। ছিলেন ফর্মাল শার্ট‌–‌জ্যাকেটে কেতাদুরস্ত কেউকেটা। হয়ে গেলেন সাদা ধুতি, কুর্তা–‌পরা ‘কাছের মানুষ’। কুর্তা হলুদ হোক বা সাদা, তার ওপর গেরুয়া চাদর বা উত্তরীয়। কপালে অঁাকা গেরুয়া তিলক, গলায় বেশির ভাগ সময়েই ঝুলছে গঁাদা ফুলের মালা। পুরীর মাঠেঘাটে টইটই করে ঘুরছেন, কে এই ছদ্মবেশী? 
সম্বিত পাত্র পুরীতে বিজেপি–‌র প্রার্থী। বিজেপি–‌র টিভি–‌মুখ। দলের মুখপাত্র, সেই ‘স্ট্যাম্প’ অর্জিত। টেলিভিশনে তঁাকে সবাই ফর্মাল শার্টে দেখতে অভ্যস্ত। বেশির ভাগ সময় কালো বা নীল জহর কোট। নাকি মোদি–‌জ্যাকেট? দেশের মানুষ, পুরীর মানুষ তঁাকে অমন বেশভূষাতেই চেনেন। রাতারাতি তিনি দিল্লির বেশ ছেড়ে আম–‌রাজনীতিকের বেশ ধরলেন!‌
ভোট বড় বালাই। ভোট পেতে নাকে শিকনি–‌লাগা বাচ্চা কোলে নিতে হয়, ঘেমো মানুষের পিঠে ‘স্নেহের’‌ হাত রাখতে হয়, বস্তির অগোছালো ঘরে ‘কী আর এমন’ বা ‘এটাই তো স্বাভাবিক’ ভান করে ঢুকে পড়তে হয়। দলিতের ঘরের মেঝেয় বসে, সোনামুখ করে অচেনা রান্না খেতে হয়। এমন আরও অনেক ‘অনভ্যস্ত’ টিকা পরতে হয়। আর এ তো কেবল বেশ–‌বদল!‌ ভোটের সময় সম্বিত ‘আমি তোমাদেরই লোক’ সেজেছেন। ‘গো অ্যাজ ইউ লাইক’ খেলছেন বলে মেনে নিলেই হয়!
পুরীর রঞ্জু পান্ডা বহু দিনের চেনা। জগন্নাথ মন্দিরের সামনে পারিবারিক দোকান। ওডিশা হ্যান্ডলুমেরও। পুরীর অন্যতম প্রধান সেবায়েত জগন্নাথ দয়িতাপতি ওই পরিবারেরই অংশ। ওঁদের এক কর্মচারী জানালেন, জগন্নাথ দয়িতাপতি সম্বিত পাত্রের সঙ্গে ঘুরেছেন। তিনি চান, পুরীতে সম্বিতই জিতুন। ওডিশার ভোটে এই সার্টিফিকেটের গুরুত্ব আছে। বিশেষত পুরীতে। সমুদ্রতট পুরীর মানুষের কাছে যত প্রিয়, তার থেকে হাজার গুণ বেশি লর্ড জগন্নাথের জোর। পুরীর অর্থনীতির বনিয়াদ জগন্নাথ মন্দির। বিজেপি তাই লর্ড জগন্নাথের নবকলেবরের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। তাদের ইস্তাহারে বলছে, রাজ্যের সব মন্দিরের সেবায়েতকে মাসে হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। এখানে যত্রতত্র ঠাকুর–‌দেবতার মন্দির। তাই সেবায়েতের সংখ্যা গুণে বলা নিতান্তই কঠিন। রঞ্জু পান্ডার ওখান থেকেই শুনলাম, এ রাজ্যে অন্তত ৪০ হাজার সেবায়েত আছেন। তার বাস্তব ভিত্তি কী, জানা হয়নি।
চায়ের আড্ডা। এই চঁাদি–‌ফেটে–‌যাওয়া রোদে আর ঘামে জ্যাবজেবে গরমে কারাই–‌বা চায় পে চর্চা করবে! অটোচালক গ্র্যান্ড রোডের দিকে নিয়ে গেলেন। ওখানে শপিং মলের সামনে জুস, লস্‌সি হইহই করে বিক্রি হচ্ছে। লস্‌সিতে চুমুক দিতে দিতেই কথাবার্তা। সেবায়েত–‌ভাতার কথা তুলতে একজন বললেন, ‘সাত মন তেলও পুড়েছে, রাধাও নেচেছে!‌’মানে আর জিজ্ঞেস করিনি। বিজেপি ইস্তাহারে বলেছে, পুরী হবে দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। পুরীকে বিশেষ তকমা দেওয়া, নবকলেবরের জন্য টাকা বরাদ্দ করা, সেবায়েত–‌ভাতা ঘোষণা করেও বিজেপি সুবিধে করতে পারবে না? রাজ্যে পরিবর্তনের ডাক দেওয়া আর লোকসভায় অনেক আসন পাওয়া— দুই–‌ই বিজেপি–‌র অ্যাজেন্ডা। সম্বিত পাত্র হেরে গেলে দলের মুখ পুড়বে। তাই পুরীতে ধর্মের জল। বিজু জনতা দল ১৯৯৮ থেকে পুরী কেন্দ্র দখলে রেখেছে। এবার বিজেডি–‌র পিনাকী মিশ্র ‘বলশালী’ প্রার্থী। তবে সম্বিত পাত্র খুব খাটছেন। সকাল সাড়ে ছ’‌টা–‌সাতটা থেকে প্রচার শুরু। দিনে ষোলো– ‌সতেরো– ‌আঠেরো ঘণ্টা প্রচারে দিচ্ছেন। পুরীর ভিআইপি রোডের প্রাইড অনন্যা হোটেল এখন তঁার অস্থায়ী ঠিকানা। সম্বিত বা বিজেডি প্রার্থী পিনাকী মিশ্র কেউই পুরীর ভূমিপুত্র নন। সম্বিত ওডিশার জাজপুরের। ওডিশাতেই পড়াশোনা। রাজনীতিতে যোগ দিতে মেডিক্যাল অফিসারের চাকরি ছাড়েন। তারপর দিল্লিতে। বিজেপি–‌তেই রাজনীতির হাতেখড়ি। দিল্লি পুরসভায় একবারই লড়েছিলেন। এবার পুরীর ‘যুদ্ধক্ষেত্রে’। জগন্নাথ মন্দিরে পুজো দিয়ে ‘শুভারম্ভ’।  জগন্নাথ–‌মূর্তি মাথায় করে ঘুরছেন। সর্বত্র বলছেন, লর্ড জগন্নাথ ডেকেছেন, আর মোদিজি পাঠিয়েছেন। তাই তিনি শ্রীক্ষেত্রে অবতীর্ণ। ভোট–‌প্রচারে ধর্ম ব্যবহারের দায়ে কমিশনের বকুনি খেতেও হয়েছে। তা হোক। হুডখোলা গাড়িতে প্রচারের পথে প্রায় সব মন্দিরেই তিনি প্রণাম করছেন। শিবমন্দির, প্রতাপেশ্বর বা সম্বলেশ্বরী মন্দির কিংবা লিঙ্গরাজ মন্দির— সর্বত্র। ঠাকুর বড় জাগ্রত!‌ গরিবগুর্বোদের দাওয়ায় বসছেন, ‘পরম সমাদরে’ তঁাদের দেওয়া খাবার খাচ্ছেন। কিন্তু ‘মোদিজি’–‌কে ‘ফঁাসিয়ে’ দিয়েছেন। দলিত মহিলার ঘরে পাত পেড়ে বসে খেয়েছেন। তিনিও মহিলাকে খাইয়ে দিয়েছেন। এ–‌পর্যন্ত ঠিক ছিল। গোল বাধল টুইটারে সে–ছবি ভাইরাল হতে। দেখা গেল, মহিলাটি উনুনে রান্না করছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে হইচই। তা হলে মোদির উজ্জ্বলা যোজনার কী হল! ওই মহিলা কেন গ্যাস পাননি? কেন উনুনে রঁাধছেন? বিজেপি–‌র প্রতিষ্ঠা দিবসে তিনি বকু গ্রামে যান। ১৯৭২ সালে আরএসএসের প্রচারক নরেন্দ্র মোদি ওই গ্রামে রাত কাটিয়েছিলেন। পরদিন কাকভোরে উঠে মোদি সেখানকার পুন্যিপুকুরে স্নান সারেন। সম্বিত পাত্র সেই গ্রামে একজনের বাড়ি রাত কাটিয়ে পরদিন ভোরে পুকুরটির পুণ্যজলে ডুব দেন।
জগন্নাথদেব দর্শনে তঁার ভুল হচ্ছে না। লর্ড জগন্নাথ ঠুঁটো হয়ে যাবেন না তো? প্রভু ভোট–‌বৈতরণী পার করে দেবেন তো?‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top