আজকাল ওয়েবডেস্ক: ‘গ্রাম থেকে আমরা যখন শহরে কাজ করতে যাই, অন্তত কাওকে না কাওকে পাই একটু সাহায্য করার জন্য। পাশে থাকার জন্য। কিন্তু এই হাইওয়েতে কে আছে বলুন আমার চেনা পরিচিত?’ ট্রাকের কেবিনের সিটে শুয়ে নিরস মুখে বলছিলেন কানহাইয়া সিং। মোবাইলের রেডিয়োতে প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন কিছু খবর শোনা যায় কি না। 
বছর ৩৫ এর হরপ্রীত সিংকে নিয়ে বছর ৪০ এর কানহাইয়া রওনা দিয়েছিলেন বেঙ্গালুরু থেকে। ট্রাকে ৪০ টি মোটরসাইকেল ডেলিভারি দিতে হবে পুণের শোরুমে। কিন্তু ৭০০ কিলোমিটার পাড়ি দেওয়ার পরে লকডাউনের পাল্লায় পড়ে ৮৫ কিলোমিটার রাস্তা বাকি থাকতেই আটকে গিয়ে  আপাতত ওঁদের ঠিকানা সাতারার কাছে ওম পঞ্চতন্ত্র ধাবা। 
যদিও কেন্দ্রীয় সরকার বলেছে মালবাহী ট্রাকগুলোকে রাজ্য বা জেলার সীমানায় আটকানো চলবে না, মহারাষ্ট্র তো বটেই গোটা দেশ জুড়ে এই ট্রাকগুলো কোথাও আটকে ধাবায় , তো কোথাও বা পোট্রলপাম্পে। পকেটে যা পয়সা কড়ি ছিল, তা সব ফুরিয়ে আসছে এঁদের। সঙ্গে যে বিশেষ চাল ডাল তেল নুন আছে তাও নয়। কিন্তু এরমধ্যেই কোনওরকমে উদ্বেগের প্রহর কাটাতে হচ্ছে কানহাইয়াদের। কেউ কেউ আবার ট্রাক কোনও ধাবায় রেখে চলে গেছেন কোনও আশ্রয়ের সন্ধানে। যেমন ওসমানাবাদের তুর্জাপুরে সুচার সিংয়ের ধাবায় পাঁচটি ট্রাক রয়েছে, যার ড্রাইভাররা গাড়ির কাগজপত্র সব তাঁর কাছে রেখে আপাতত চলে গেছেন। তবে যাননি এমন লোকও আছেন। যেমন রাণা প্রতাপ, জানালেন তিনি রায়পুর থেকে তুলো নিয়ে কোলাপুরে যাচ্ছিলেন। পথে আটকে পড়েছেন এভাবে। তাঁদের জন্য সরকার কিছু খাবার দাবারের ব্যবস্থা করছে না?এ প্রশ্নের জবাবে প্রতাপ বলছেন ‘কিছু না, আমরা রাস্তায় এভাবে না খেতে পেয়েই মরব’।
অল ইন্ডিয়া মোটর ট্রান্সপোর্ট কংগ্রেসের তরফে রাজ্যগুলোকে অনুরোধ করা হয়েছে তারা যেন জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে রাস্তায় আটকে পড়া ট্রাক ড্রাইভারদের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেয়। কিন্তু সংগঠনই স্বীকার করছে যে, বহু ক্ষেত্রেই ট্রাকচালকরা কোনও সাহায্য পাচ্ছেন না। অলইন্ডিয়া ট্রান্সপোর্টারস অ্যাসোশিয়েসনসের জয়েন্ট সেক্রেটারি অভিষেক গুপ্ত জানান ‘ন্যাশনাল পার্মিট প্রাপ্ত ৭০ হাজার ট্রাকের জিপিএস ডেটা আমাদের কাছে আছে, তারমধ্যে সাড়ে ছ হাজার ট্রাক চলছে। বাকিগুলো সব এদিক ওদিক আটকে আছে।’ তেমনই এক আটকে থাকা ট্রাকের চালক হরপ্রীত জানালেন, পয়সা বাঁচানোর জন্য নিজেরাই রান্না করে খাচ্ছেন। মাঝে মাঝে অবশ্য বন্ধ ধাবার কর্মীরা নিজেদের জন্য যে চাল ডাল রান্না করছেন তা থেকে ভাগ দিচ্ছেন। কানহাইয়া জানালেন পুণের যে শোরুমে তাঁর মোটরবাইক ডেলিভারি করার কথা ছিল, সেখানেও ফোন করে সাহায্য পাঠাতে বলেছিলেন, কিন্তু কোনও লাভ হয়নি।
কাছের আরেকটি ধাবায়, এভাবেই আটকে আছেন মনবীর যাদব। উত্তরপ্রদেশের ফিরোজাবাদে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী, সঙ্গে রয়েছে দুটি সন্তান। ছোটটির বয়স ১ বছর, তার জন্য মনবীরের স্ত্রী গ্রামের পড়শিদের কাছে দুধটুকুও কার্যত ভিক্ষে করছেন। এদিকে মনবীর আটকে রয়েছেন ১৮ দিন। পকেটও ফাঁকা। সামনেও অনিশ্চিত অন্ধকার।

জনপ্রিয়

Back To Top