রাজীব চক্রবর্তী, দিল্লি: গরিবের পেটে লাথি!‌ অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের  তালিকা থেকে বাদ পড়ল চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, ভোজ্য তেল, তৈলবীজের মতো পণ্য। উঠে গেল এইসব পণ্য মজুত করার ঊর্ধ্বসীমা। বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগের দরজা হাট হয়ে গেল এই সব পণ্যেও। মঙ্গলবার এই সংক্রান্ত বিল পাশ করিয়ে নিল নরেন্দ্র মোদি সরকার। লোকসভার পর বিরোধীশূন্য রাজ্যসভাতেও ধ্বনিভোটে পাশ হয়ে গেল ‘‌অত্যাবশ্যকীয় পণ্য (‌সংশোধনী)‌ বিল, ২০২০’‌।
নতুন বিল রাষ্ট্রপতির সইয়ের পর আইনে পরিণত হলে বদলে যাবে ১৯৫৫–‌‌র অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন। এদিন অন্য বিরোধীরা না–থাকলেও রাজ্যসভায় এই বিলে কিছু সংশোধন করার দাবি জানিয়েছে ওডিশার নবীন পট্টনায়কের দল বিজেডি এবং অন্ধ্রপ্রদেশের ওয়াইএসআর কংগ্রেসের মতো দলগুলি। বেশ কিছু ক্ষেত্রে সরকারি ব্যাখ্যা দাবি করেছে এই দলগুলি। যদিও পরে তারা বিলে সমর্থন জানিয়েছে।
বিরোধীদের অভিযোগ, গায়ের জোরে দেশের গরিব মানুষকে ভয়ঙ্কর বিপদের মুখে ঠেলে দিল কেন্দ্র। এই আইনের সুযোগ নিয়ে পুঁজিপতিরা চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, ভোজ্য তেল–‌সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ইচ্ছেমতো মজুত করতে শুরু করলে অথৈ জলে পড়তে হবে গরিব মানুষকে। না–খেয়ে মরতে হবে উৎপাদনকারী কৃষকদেরও। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশের কথায়, ‘‌করোনা বিপর্যয়ে সাধারণ মানুষ অনেক আগেই সাধ–আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছে। এখন দু’‌‌মুঠো খাবারের সংস্থান করতেই নাভিশ্বাস উঠছে। পুঁজিপতিদের চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ যত খুশি মজুত করার ছাড়পত্র দিয়ে গরিবের পেটে লাথি মারল মোদি সরকার।’‌
এই বিলে সরকার নির্ধারিত অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকা থেকে খাদ্যশস্য, ডাল, তৈলবীজ, পেঁয়াজ এবং আলু বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। দেশে যুদ্ধ, অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি, দুর্ভিক্ষ, ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো ‘‌অস্বাভাবিক পরিস্থিতি’‌ ছাড়া এই জাতীয় পণ্যগুলি মজুতের ক্ষেত্রে আর কোনও ঊর্ধ্বসীমা থাকবে না। বেসরকারি সংস্থা বা প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এই ধরনের কৃষিতে লগ্নি করতে পারবেন। নিজেদের উদ্যোগে এইসব পণ্য যত খুশি মজুত করতে পারবেন। এক্ষেত্রে কোনওরকম সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপ থাকবে না। বিনিয়োগকারীরা হিমঘর, কৃষি পরিকাঠামো এবং খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল আধুনিকীকরণে বিনিয়োগ করতে পারবেন।
লোকসভায় এই বিলের তুমুল বিরোধিতা করেছিল বিরোধী দলগুলো। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আগের দুটি কৃষিবিলের মতো এই বিলটিও পাশ করিয়ে নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। 

 

আগের দুটি বিল পাশের বিরোধিতায় বিরোধীরা এদিন রাজ্যসভা বয়কট করেছিল। ফলে, বিরোধীশূন্য সভায় বিনা বাধায় পাশ হয়ে গিয়েছে এই বিলটিও। কেন্দ্রীয় উপভোক্তা, খাদ্য ও গণবণ্টন রাষ্ট্রমন্ত্রী দানভে রাওসাহেব দাদারাও সংসদে দাবি করেছেন, ‘‌এই বিল আইনে পরিণত হলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন কৃষক ও উপভোক্তা। কৃষিক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়লে দেশের কৃষিতে বিপ্লব আসবে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারের পরিবেশ তৈরি হবে। কৃষিজ উৎপাদনের অপচয় বন্ধ হবে।’‌ 
তৃণমূলের সৌগত রায়ের অভিযোগ, ‘একের পর এক ‌কৃষকবিরোধী পদক্ষেপ করছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকায় কাটছাঁট করার ফলে গরিব কৃষক নয়, লাভবান হবেন পুঁজিপতিরা। মুষ্টিমেয় শিল্পপতির হাতে গোটা দেশ বেচে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে মোদি সরকার। এর বিরুদ্ধে আগের মতোই আন্দোলন চালিয়ে যাবে তৃণমূল।’‌
করোনা আবহে ৫ জুন ১৯৫৫ সালের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনে পরিবর্তন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারি করেছিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা। আইন সংশোধনের সূত্রপাত হয়েছিল করোনা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ‘আত্মনির্ভর ভারত অভিযান’ প্রকল্পের ঘোষণার সময়েই। এবার আরও একধাপ এগোল মোদি সরকার। এখন রাজ্যসভায় পাশের পর রাষ্ট্রপতির সইয়ের অপেক্ষা। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top