রাজীব চক্রবর্তী, দিল্লি: গেরুয়া ও হলুদ রঙে সেজে উঠেছে অযোধ্যা। পাড়ায় পাড়ায়, প্রতিটি মোড়ে, এমনকী চায়ের দোকানেও ভগবানরূপী রামচন্দ্র। কা‌টআউট। তোরণ। কথিত, রাম হলুদ বসন পরতেন। তাই অযোধ্যার প্রতিটি বাড়ির সামনের অংশ হলুদ রং করা হয়েছে। লালরঙের প্রাচুর্যও চোখে পড়ছে। কাল রামের পুজো। তার আগে আজ হনুমানগড়িতে হল হনুমান ও গণেশের পুজো। 
কাল, বুধবার অযোধ্যায় রামমন্দিরের ভূমি পুজো করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাই চারিদিকে সাজসাজ রব। ব্যারিকেড। অতন্দ্র প্রহরা। সাম্প্রতিককালে দেশ এত জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান দেখেনি। সেটা ঘটছে করোনা সঙ্কটকালে, দেশ মৃত্যুমিছিল যখন অব্যাহত, দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যায় ভারত বিশ্বে এক নম্বরে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট খোঁচা দিচ্ছেন, ভারতে তো সমস্যা সাঙ্ঘাতিক!‌ ঘটনা এই যে এর মধ্যেই সংক্রমণ ধরা পড়েছে অযোধ্যার এই মন্দির–‌আড়ম্বরের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যেও। এবং দেশের মন্দির–‌উৎসাহী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও আক্রান্ত করোনায়। কিন্তু এমন অবস্থাতেও মঙ্গলবার সমাগত ভক্তদের অনেকের মুখে মাস্ক পর্যন্ত দেখা যায়নি।
রামমন্দিরের এটা দ্বিতীয় ভূমিপুজো। তা হোক, গেরুয়া শিবিরের আগ্রহের পারদ শিখরে পৌঁছে গিয়েছে। সকলেই ঐতিহাসিক ক্ষণের অপেক্ষা করছেন। তবে, রাম নয়, বুধবারের অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও থাকবেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রধান মোহন ভাগবত ও উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। মোট ১৩৫ জন পুরোহিত ও ধর্মীয় নেতার উপস্থিতিতে বুধবারের রামমন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হবে। করোনার সময় বলেই অতিথির সংখ্যা নিয়ন্ত্রিত। মোট আমন্ত্রিত ১৭৫ জন। কেউ যাতে এসে ভিড় জমাতে না পারেন তার জন্যই শহরের রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড। অযোধ্যায় যাতে বাইরের লোক আসতে না পারে সেদিকেও রয়েছে কড়া নজর। ঠিক যেমন করা হয়েছিল পুরীর রথযাত্রার সময়। 
এদিকে রামমন্দির আন্দোলনের পুরোধা লালকৃষ্ণ আদবানি বুধবারের অনুষ্ঠান সম্পর্কে বলেছেন, ‘‌এ এক আবেগপূর্ণ ও ঐতিহসিক মুহূর্ত। এতদিনের প্রতীক্ষা সার্থক হয়েছে।’‌
তামিলনাড়ুর সাধুরা শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টকে সোনা এবং রুপোর দুটি ইট উপহার দিয়েছেন। সোনার ইটের ওজন ৫ কেজি। রুপোর ইটটির ওজন ২০ কিলোগ্রাম। ওই ইট স্থাপন করবেন নরেন্দ্র মোদি। অযোধ্যায় মোট ৩ ঘণ্টা কাটাবেন মোদি। দিনভর ঠাসা কর্মসূচি তাঁর। সকাল সাড়ে ৯‌টা নাগাদ দিল্লি থেকে বিমানে লখনউয়ের উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী। ১ ঘণ্টার মধ্যে লখনউয়ে অবতরণ করবেন। ১০ মিনিটের মধ্যে হেলিকপ্টারে চড়ে অযোধ্যার উদ্দেশে রওনা হবেন। অযোধ্যার সাকেত কলোনিতে নামবে প্রধানমন্ত্রীর হেলিকপ্টার। সেখান থেকে সবার আগে হনুমানগড়ি মন্দির দর্শনে যাবেন মোদি। বেলা ঠিক ১২টায় রামমন্দিরের ভূমিপুজো স্থলে পৌঁছোবেন, রামলালাকে দর্শন করবেন। কিছুক্ষণ পর প্রস্তাবিত মন্দির চত্বরে বৃক্ষরোপণ করবেন মোদি। এরপর ১২টা ৪০ মিনিটে মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। তারপর দুপুর ১টা ১০ মিনিটে স্বামী নৃত্যগোপাল দাস–‌সহ রামজন্মভূমি ট্রাস্টের অন্য সদস্যদের সঙ্গে কথা বলবেন। দুপুর ২টো ৫ মিনিটে আবার সাকেল হেলিপ্যাডের উদ্দেশে রওনা। দুপুর আড়াইটের আগেই লখনউ থেকে দিল্লির উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
এদিকে, মঙ্গলবার সরকারের পক্ষ থেকে রামমন্দিরের মডেল–‌ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। ১৬১ ফুট উচ্চতার মন্দিরে ৫টি মণ্ডপ ও ১টি মুখ্য শিখর তৈরি হবে। দাবি করা হচ্ছে, অযোধ্যার প্রতিটি কোণ থেকে এই মন্দির দেখা যাবে।
১৯৮৯ সালে রামমন্দিরের মডেল তৈরি করা হয়েছিল, যাতে পরিবর্তন করেছে শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট। এই মন্দির সম্পূর্ণ তৈরি হতে সময় লাগবে সাড়ে ৩ বছর। মাত্র ৩ একর জমিতে মন্দির তৈরি হলেও মন্দির এলাকায় মোট ৭০ একর জমি থাকবে। প্রকাশিত ছবিগুলিতে দেখা যাচ্ছে, পাথরের ভিত্তির ওপর বহু স্তম্ভ, চূড়া ও গম্বুজ–‌সহ বিশালাকার তিনতলা মন্দির নির্মাণ হতে চলেছে। উচ্চতা হবে ১৬১ ফুট, যা এর আগের নকশার প্রায় দ্বিগুণ। মন্দিরের অন্দরসজ্জায় থাকবে খোদাই করা কারুকার্য–‌সহ গম্বুজ।
অযোধ্যায় ২.‌৭৭ একর জমি নিয়ে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের দুই গোষ্ঠীর সুদীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের প্রেক্ষিতে গত নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের রায় আসে। তারপর নতুন করে মন্দির নির্মাণের নকশা তৈরি করা হয়েছে। সর্বোচ্চ আদালত বলেছে, বিতর্কিত জমিটি রামমন্দির নির্মাণের জন্য দেওয়া হবে, আর বিকল্প হিসেবে ৫ একর জমি দেওয়া হবে মুসলিম সম্প্রদায়কে। আজ থেকে ৩০ বছর আগে বংশানুক্রমিক স্থপতি চন্দ্রকান্ত সোমপুরাকে রামমন্দিরের মডেল তৈরির বরাত দেওয়া হয়েছিল। তাঁর বাবা প্রভাশঙ্কর সোমপুরা গুজরাটের সোমনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণের স্থপতি ছিলেন। ৭৭ বছর বয়সি সোমপুরা জানিয়েছেন, নতুন নকশা নির্মাণে তিনি ‘‌নাগাড়া স্টাইল’‌ অনুসরণ করেছেন। ভক্তদের থাকার জন্য নকশায় দুটি গম্বুজের পরিবর্তে ৫টি গম্বুজ তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়াও গর্ভগৃহের ওপরে তৈরি হবে একটি বিশালাকার শিখর।‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top