স্বদেশ ভট্টাচার্য, বসিরহাট: করোনা এবং আমফান, এই দুই বিপর্যয় মোকাবিলায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে যেভাবে রাজ্য সরকার লড়াই করেছে তার ভূয়সী প্রশংসা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বলেন, করোনার সঙ্গে চলে এসেছে আমফান বিপর্যয়। দুই ক্ষেত্রেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি দক্ষতার সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়েছেন। শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে দুই ২৪ পরগনার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলি পরিদর্শন করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ও রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়। পরে বসিরহাট কলেজে প্রশাসনিক বৈঠকও করেন তিনি। সেখানে ছিলেন রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, মুখ্য সচিব রাজীব সিনহা, দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় ও দেবশ্রী চৌধুরি। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনর্গঠনে আপাতত এক হাজার কোটি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। সেই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ে মৃতদের ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা জানান। তিনি বলেন, বাংলার পরিস্থিতি সমীক্ষা করতে একটি কেন্দ্রীয় দল আসবে।
কলকাতায় ফিরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘‌প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন ১ হাজার কোটি টাকা তিনি আমাদের সাহায্য করছেন। এটা জরুরি তহবিল নাকি অগ্রিম হিসেবে দিচ্ছেন, তা নিয়ে কিছু বলেননি।’‌ মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, সব ধান জলের তলায়। মৎস্য, পশুপালন, হর্টিকালচার, স্কুল–‌কলেজের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির সমস্ত ছবিই প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে। মমতা ব্যানার্জি বলেন, ‘‌গ্রামের সীমান্ত বলে কিছু নেই এখন। সব মিলেমিশে একাকার। নদীবাঁধ ভেঙে গেছে। জমির পর জমি জলের তলায়। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যসচিব রাজীব সিনহা বিস্তারিত বলেছেন। আমিও বলেছি। ওরা টিম পাঠাবে।’‌ 
কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল পাঠানো–সহ আর্থিক সাহায্যের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে দ্রুত পদক্ষেপ করতে অনুরোধ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।‌‌ মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেন, ‌লাখ লাখ মানুষকে বাঁচাতে পেরেছি। তারপরও ৮০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন। এদিন আকাশপথে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রওনা হওয়ার আগে মমতা ব্যানার্জি জানান, ৬ লাখ মানুষকে সরানো হয়েছে। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় রাজ্য সরকার কাজ করছে। সব জায়গায় এখনও পৌঁছন সম্ভব হয়নি। তাই কিছুটা হয়তো সময় লাগবে। কলকাতাও বিপর্যস্ত। কিছু বাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছে।’‌
এদিনের বৈঠকে আলোচনায় মোদি বারবার রাজ্যের ভূমিকার প্রশংসা করেন। বলেন, ‘‌আমি ভাগ্যবান, রাজা রামমোহন রায়ের জন্মদিনে আমি বাংলায় রয়েছি। আমি, মুখ্যমন্ত্রী আর রাজ্যপাল ঘুরে দেখলাম, ‌এখানকার মানুষের অনেক ক্ষতি হয়েছে। করোনা রোখার মন্ত্র আর ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার মন্ত্র দুটি বিপরীত। করোনা রুখতে হলে ভেতরে থাকতে হবে। সামাজিক দূরত্ব মানতে হবে। আর ঘূর্ণিঝড় ক্ষতি আটকাতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিরাপদ স্থানে এনে এক জায়গায় রাখতে হবে।’‌ 
এই জোড়া সঙ্কট মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলা যেভাবে সামলাচ্ছে তার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনা আতঙ্কের মধ্যেই আমফান দুর্গতের জন্য কঠিন লড়াই করছে মমতাজির সরকার। যতটা ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব তার জন্য রাজ্য সরকার ব্যবস্থা নিয়েছিল। করোনা ও ঘূর্ণিঝড়ে একসঙ্গে লড়ছে কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গ। মমতাদির নেতৃত্বে রাজ্য সরকার প্রয়াস চালাচ্ছে। ভারত সরকার পশ্চিমবঙ্গের পাশে আছে। এই সঙ্কটে গোটা দেশ বাংলার পাশে। আগামী দিনেও থাকবে। বাংলাকে ঘুরে দাঁড়াতে সবরকম সাহায্য করা হবে। কৃষি, বিদ্যুৎ, টেলিকম ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় দল আসবে।’‌ 
এদিনের বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের বিপর্যয়ের তথ্য তুলে ধরেন। কেন্দ্রের কাছে পুনর্গঠনের জন্য সহযোগিতার দাবি করেন। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীকে বাংলায় আমফানের বিপর্যয় দেখে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী দিল্লি থেকে আসেন। মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যপালকে একই হেলিকপ্টারে নিয়ে পরিদর্শনে যান। আরেকটি হেলিকপ্টারে ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়, দেবশ্রী চৌধুরি, ধর্মেন্দ্র প্রধান, প্রতাপচন্দ্র সারাঙ্গি। 
৩টি হেলিপ্যাড তৈরি করা হয়। প্রান্তিক মাঠে ২টি ও বসিরহাট কলেজের পেছনের মাঠে ১টি। প্রান্তিক মাঠে প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা রক্ষীদের হেলিকপ্টার নামার জন্য এবং কলেজের পেছনের মাঠে হেলিপ্যাডে প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর নামার জন্য। শুক্রবার সকাল থেকেই বায়ুসেনা মহড়া দেয়। 
বেলা ১২–‌১০ মিনিটে বায়ুসেনার চপারে বসিরহাটে নামেন নরেন্দ্র মোদি ও মমতা ব্যানার্জি। আশপাশের বাড়ি থেকে মহিলারা শাঁখ, উলুধ্বনি দিতে শুরু করেন। হেলিপ্যাড থেকে বসিরহাট কলেজ সভাকক্ষে এসে প্রশাসনিক বৈঠক করেন তাঁরা।

জনপ্রিয়

Back To Top