সৌরভ নন্দী:‌ গত আগস্ট মাসে কাশ্মীর থেকে অনুচ্ছেদ ৩৭০ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। সেই থেকেই উপত্যকায় বন্ধ ইন্টারনেট ব্যবস্থা। প্রায় ১৫০ দিন মতো হতে চলল। কোনও গণতন্ত্রে এত দীর্ঘ সময় ধরে ইন্টারনেট বন্ধ রাখার ঘটনা এর আগে কখনই ঘটেনি। যেখানে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলির মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার একটি। সংবিধানেই বলা রয়েছে। তাও ১৪৪ ধারার দোহাই দেখিয়ে এতগুলো মাস ধরে একেবারে অন্ধকারে রাখা হয়েছে উপত্যকাবাসীকে। দিনের পর দিন তাঁদের মৌলিক অধিকার খর্ব করে যাচ্ছে কেন্দ্রের মোদি সরকার। সম্প্রতি ইন্টারনেট সহ জম্মু–কাশ্মীরে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রশাসনকে এক সপ্তাহের মধ্যে পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত। কেন্দ্রের মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত একরকমভাবে অসাংবিধানিক তো বটেই। পাশাপাশি এই সিদ্ধান্ত অর্থনীতিতে বেশ প্রভাব ফেলেছে। সাম্প্রতিক একটি রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছে সেই তথ্য। জানা গিয়েছে, ২০১৯ সালে মোদি সরকারের ইন্টারনেট বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্তে অর্থনীতিতে মোট ক্ষতি হয়েছে ‌১.‌৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ভারতীয় টাকায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। ২০১৯ সালে গোটা দেশের হিসাবে মোট ৪,‌১৯৬ ঘন্টা বন্ধ রাখা হয়েছে ইন্টারনেট। এদিক থেকে ইরাক এবং সুদানে পরেই রয়েছে ভারতের নাম। ইন্টারনেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে বিপুল পরিমাণ ক্ষতির শিকার হয়েছে যে দেশগুলি, তাদের মধ্যে ভারত তৃতীয়। শুধু কাশ্মীরই নয়, সম্প্রতি সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। বিক্ষোভ আটকাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের নামে গোটা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইন্টারনেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মোদি সরকার। অরুণাচল প্রদেশ, অসম, মেঘালয়ে রাজস্থান, ত্রিপুরা এবং উত্তরপ্রদেশে বেশ কয়েকদিন ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছে। বিতর্কিত অযোধ্যা মামলার রায়দানের আগেও উত্তরপ্রদেশ সহ দেশের একাধিক অঞ্চলে বন্ধ ছিল ইন্টারনেট। 
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর রিসার্চ অন ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক রিলেশন (‌‌আইসিআরআইইআর)–এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত, পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইন্টারনেট বন্ধ রাখার জন্য ক্ষতি হয়েছিল ৩.‌০৪ বিলিয়ন ডলার। সেই জায়গায় শুধু ২০১৯ সালেই ক্ষতি হয়েছে ‌১.‌৩ বিলিয়ন ডলার। ইন্টারনেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত শুধু সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপই নয়, দেশের অর্থনীতির পক্ষেও যে বিপজ্জনক, তারই প্রমাণ দিচ্ছে জম্মু–কাশ্মীর। গোটা দেশের অর্থনীতি তো ভেঙে পড়েছেই। উপত্যকার পরিস্থিতি আরও খারাপ। সেখানে সমস্ত ছোট মাঝারি শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে। স্থানীয় অর্থব্যবস্থা এখন আইসিইউ–তে। পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িত হোটেল রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষগুলো জানাচ্ছে, ইন্টারনেট বন্ধ থাকার ফলে বিগত মাস দু’‌য়েক ধরে কোনও বুকিং নেই। সংবাদমাধ্যমে সাহিল ভর্মা নামে এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ‘‌মুম্বইতে অনেক টাকার চাকরি ছেড়ে কাশ্মীরেই ফিরে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম, এখানেই ব্যবসা করব। সব ব্যবস্থাও করে ফেলেছিলাম। ই–কমার্সের ব্যবসা ছিল। একটা ওয়েবসাইটও বানিয়েছিলাম। আর সেই সময়েই বুরহান ওয়ানির ঘটনাটা ঘটে গেল। প্রায় ১০০ দিন মতো উপত্যকায় বন্ধ রাখা হয়েছিল ইন্টারনেট। যে কারণে আমার গোটা ব্যবসা লাটে ওঠে। অনেক ক্ষতি হয়ে গিয়েছে আরমা।’‌ কাশ্মীরে ইন্টারনেট বন্ধ রাখার কারণে স্থানীয় ব্যাঙ্ক এবং স্বাস্থ্য পরিষেবাতেও অনেক সমস্যা দেখা দিয়েছে। জানাচ্ছে উপত্যকার সংবাদমাধ্যমগুলি। সাম্প্রতিক রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছে, ২০১৯ সালে ১০০ বারেরও বেশি ইন্টারনেট বন্ধ রেখেছে প্রশাসন। শুধুমাত্র অশান্তির দোহাই দিয়ে। ভারতের মতো বৃহৎ গণতন্ত্রে সরকারের এমন সিদ্ধান্তে কতটা যৌক্তিকতা রয়েছে, তা অবশ্যই বিবেচনা করা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার যাতে কোনওভাবেই খর্ব না হয়, তা দেখার দায় যেমন দেশের শীর্ষ আদালতের, তেমনই সরকার পক্ষের। প্রবণতা বলছে, বিষয়টি নিয়ে মোদি সরকার বিবেচনা করতেই চায় না।তাই আগামী দিনে সুপ্রিম কোর্ট কী পদক্ষেপ নেয়, সেটাই দেখার।  ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top