উৎসা সারমিন- বিশেষ মর্যাদা হারাতেই থমথমে জম্মু–কাশ্মীর। রাস্তা শুনশান। দোকানপাট বন্ধ। টহল দিচ্ছে সেনাদল। সেখানকার পাথরবাজদের সম্পর্কে সতর্ক করেছে সংবাদ মাধ্যম। কিন্তু কীভাবে কাশ্মীরি কিশোর পাথরবাজ হয়ে যায় সে কথা বলে না কেউ। সে কাহিনি থেকে যায় আড়ালে। 
বছর উনিশ–কুড়ির কাশ্মীরি যুবক মুজতবা (‌নাম বদল)‌। মাঝারি উচ্চতা, তামাটে চেহারা। মুখে হাসি। দেখলে বিশ্বাস হয় না কাশ্মীরের পাথরবাজ দলের সদস্য মুজতবা। বইপত্র ছেড়ে পাথর হাতে নেওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারত না। অথচ হয়েছে সেটাই। নিজের এই অবস্থার জন্য প্রকারান্তরে পুলিশের বিরুদ্ধেই ক্ষোভ উগরে দিয়েছে মুজতবা। মুজতবা সেই সব কাশ্মীরি যুবকদের প্রতিনিধি যাদের বাবা হয় নিখোঁজ, নয়তো নির্যাতিত, কিংবা যারা সেনাবাহিনীর মিথ্যা অভিযোগের শিকার। 
জম্মু–কাশ্মীর তখন বিশেষ মর্যাদা হারায়নি। ২০১৮ সালের এক শুক্রবার। কথা হয় মুজতবার সঙ্গে। শ্রীনগরের জামিয়া মসজিদের কাছে দেখা করার কথা ছিল। সেখান থেকে সরু অলিগলি পেরিয়ে নির্জন এলাকায় গাছপালা, বাড়িঘর পেরিয়ে খেলার মাঠের কাছে দেখা হয় তাঁর সঙ্গে, বিকেল চারটে নাগাদ। সেনাবাহিনী সচরাচর সেদিকে যায় না। মাঠে বসেই কথা হয়। বলল, অনেক কাশ্মীরির মতো তার বাবাও নিরুদ্দেশ হয়েছে। মা আর কাকা বড় করেছে তাকে। তার পড়াশোনার জন্য আখরোট কারখানায় কাজ শুরু করেন মা। ১৫–১৬ বছর বয়স পর্যন্ত কখনও কোনও প্রতিবাদে শামিল হয়নি সে। ক’‌দিন আগেও প্রতি শুক্রবার প্রার্থনার পর রাস্তায় নেমে পড়ত পাথরবাজরা। ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দেখাতে। এমনই এক শুক্রবার পাথরবাজদের সঙ্গে পুলিশের সঙ্ঘর্ষের মাঝে পড়ে যায় মুজতবা। ক্লাস নাইনের পড়ুয়া। পুলিশ এগোতেই পাথরবাজরা গা–ঢাকা দেয়। তাকে টেনে নিয়ে যায় পুলিশ। কিছু করেনি, নির্দোষ, বললেও কথায় কান দেয়নি পুলিশ। থানায় চলে নির্যাতন। সেদিন থেকে অনেক কিছুই বদলে যায়। অন্য খাতে বইতে শুরু করে জীবন। ওর মায়ের কথায়, ‘‌এখন ওকে পাথরবাজদের সঙ্গে যেতে নিষেধ করলেও শোনে না। অত্যাচার ওকে ভেঙে দিয়েছে।’‌
পাথরবাজদের মূলস্রোতে ফেরাতে পুনর্বাসনের হরেক প্রকল্প করেছে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার। সেই প্রকল্পের সাহায্যে আগের জীবনে ফিরতে চেয়ে নৌকা চালানোর প্রশিক্ষণ নেয় মুজতবা। আন্তর্জাতিক স্তরে নৌকা চালানোর প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে উদ্যোগী হয়। সেখানেও ধাক্কা খেতে হয় তাকে। একবার গ্রেপ্তার হওয়ায় তাকে পাসপোর্ট দিতে অস্বীকার করে প্রশাসন। তখন পাশে দাঁড়াননি শিক্ষক। সুস্থ জীবনে ফেরার স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায় তার। সেই থেকে প্রশাসনের ওপর বিশ্বাস হারিয়েছে এই কাশ্মীরি যুবক। তার শরীর জুড়ে পেলেটের ক্ষত। সোজা হয়ে হাঁটতে পারে না। ডান চোখ টকটকে লাল। চোখ ভাল হবে, সে আশা নেই।  উপত্যকা জুড়ে রয়েছে এমন অনেক মুজতবা।‌‌‌‌

কাশ্মীরি পাথররাজ। ফাইল ছবি

জনপ্রিয়

Back To Top