সংবাদ সংস্থা, দিল্লি: কোভিড–‌১৯ মহামারী ও দীর্ঘ লকডাউনের জেরে নজিরবিহীনভাবে এদেশের অর্থনীতি সঙ্কুচিত হতে চলেছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা করা ২০ লক্ষ কোটি টাকার প্যাকেজের বেশির ভাগটাই ঋণ। সেই ঋণকে আরও সহজলভ্য করতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক রেপো রেট আরও ৪০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে করল ৪ শতাংশ। ২০০০ সালের পর থেকে রেপো রেট কখনও এত নীচে নামেনি। এর উদ্দেশ্য বাণিজ্যিক সংস্থাগুলিকে এবং সাধারণ মানুষকে আরও বেশি ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যাঙ্কগুলিকে উৎসাহিত করা। একইসঙ্গে রিভার্স রেপো রেটও ৪০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে করা হচ্ছে ৩.৩৫ শতাংশ। রিজার্ভ ব্যাঙ্কে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলোর টাকা জমা রাখাকে নিরুৎসাহিত করতেই এই পদক্ষেপ। অর্থাৎ, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক চাইছে, ব্যাঙ্ক মানুষকে যত বেশি সম্ভব ঋণ দিক। এর কারণ, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বক্তব্য অনুযায়ী, কোভিড–‌১৯ ও লকডাউনের কারণে ২০২০–২১ আর্থিক বছরে সঙ্কুচিত হবে জিডিপি। এমনকি বছরের প্রথমার্ধে বৃদ্ধির হার নেতিবাচক হওয়ারই সম্ভাবনা। 
রেপো রেট কমলে কমবে বাড়ি, গাড়ি ও অন্যান্য ঋণের সুদের হার। তবে এরইসঙ্গে তাল মিলিয়ে ফিক্সড ডিপোজিট ও অন্যান্য সঞ্চয়েও সুদের হার কমবে। ফলে বিশেষভাবে অসুবিধায় পড়বেন সেইসব প্রবীণ নাগরিক যাঁরা সুদের ওপর নির্ভরশীল। সুদের হার কমার সুবিধা পাবে আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাঙ্ক, সমবায় ব্যাঙ্ক, নন–‌ব্যাঙ্কিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সর্বভারতীয় ফিনান্স কোম্পানিগুলি। মানিটারি পলিসি কমিটির সিদ্ধান্ত, বিভিন্ন কোম্পানিতেও ঋণের পরিমাণ বাড়াতে পারবে ব্যাঙ্কগুলি। দেশের সঙ্কট মোকাবিলায় শুক্রবার এগিেয় আনা হয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মানিটারি পলিসি কমিটির বৈঠক। বৈঠকের পর আরবিআইয়ের গভর্নর শক্তিকান্ত দাস জানান, সাধারণ মানুষের হাতে যাতে নগদের অভাব না হয়, সেজন্য ব্যাঙ্ক থেকে নেওয়া মেয়াদি ঋণের কিস্তি শোধে ছাড় দেওয়া হবে আরও তিন মাস, অর্থাৎ ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। এর আগেই ১ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ঋণের কিস্তি ছাড়ের ঘোষণা করেছিল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের সুদের ওপরেও ৩ মাস ছাড় দেওয়া হবে। 
ক্ষুদ্র শিল্পকে চাঙ্গা করার জন্য স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভলপমেন্ট ব্যাঙ্ক বা সিডবিকে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এর আগে ৯০ দিনের মেয়াদে রেপো রেটে ১৫ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ঋণ জুগিয়েছিল। সেই ঋণের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে আরও তিন মাস। ফলে ঋণ শোধের জন্য আরও তিন মাস বাড়তি সুবিধা পাবে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলি। রপ্তানিতে উৎসাহ দিতে শিপমেন্টের আগে ও পরে ঋণের মেয়াদ ১ বছর থেকে ১৫ মাস পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া আমদানি ও রপ্তানি বাড়াতে এক্সিম ব্যাঙ্ককে ১৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেবে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। দরকারে ভবিষ্যতে সুদের হার আরও কমানোর ইঙ্গিত দিেয়ছেন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর। শক্তিকান্ত দাস বলেন, গোড়ায় যা আন্দাজ করা গিেয়ছিল অর্থনীতিতে কোভিডের প্রভাব তার চেয়ে অনেক বেশি মারাত্মক। মার্চের গোড়া থেকেই গ্রাম ও শহরের চাহিদা ধসে পড়েছে। পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবিকা বিপন্ন। মুদ্রাস্ফীতিও চলতি আর্থিক বছরের তৃতীয় বা চতুর্থ ত্রৈমাসিকের আগে কমার সম্ভাবনা নেই। চাহিদা সঙ্কোচন ও জোগানের অব্যবস্থার কারণেই এবছরের প্রথমার্ধে অর্থনৈতিক কাজকর্ম ব্যাহত হবে। তবে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে হাল কিছুটা ফিরতে পারে। 
বিশেষজ্ঞদের অনুমান, কোভিড–‌১৯ ও লকডাউনের জেরে বিশ্ব বাণিজ্যের পরিমাণ এবার কমতে পারে ১৩ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত। এদেশের অর্থনীতিতে আশঙ্কার বিষয় হল, কনজিউমার ড্যুরেবেলসের চাহিদা কমে গেছে ৩৩ শতাংশ। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কথা, দারুণভাবে কমছে বেসরকারি ভোগ ব্যয় যা জিডিপি–‌র প্রায় ৬০ শতাংশ। ‌এদিকে এদিন আরবিআই ঋণ শোধে আরও তিন মাসের ছাড় ঘোষণার পরপরই ৮ শতাংশ কমে যায় বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক ও নন–‌ব্যাঙ্কিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম। দাম কমেছে অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক, আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক, এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক, এসবিআই, কোটাক মাহিন্দ্র ও ইন্ডাসিড ব্যাঙ্কের শেয়ারের। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ছোটখাটো যেসব সংস্থা ঋণ দেয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের এই সিদ্ধান্তে তারাও সঙ্কটে পড়বে।‌

জনপ্রিয়

Back To Top