আবু হায়াত বিশ্বাস: নোবেল জয়ের পর প্রথমবার দেশে ফেরা। শুক্রবার গভীর রাতে দিল্লি পৌঁছন অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জি। আর শনিবার সাত সকালেই নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পৌঁছে গেলেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রহ্মপুত্র হস্টেলে, লাইব্রেরি ক্যান্টিনে ঢুঁ দিলেন। চায়ে চুমুক দেওয়ার পাশাপাশি চেখে দেখলেন আলুর পরোটা, ঘুগনি। আশির দশকের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনের দিনগুলি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করলেন বোধহয়। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর দেখা করার কথা রয়েছে। সরকারি সূত্রের খবর, দেখা করাটা শেষ পর্যন্ত ঘণ্টাখানেকের বৈঠকে পরিণত হতে পারে।
এদিন সকাল সাড়ে ন’‌টা নাগাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছন অভিজিৎ ব্যানার্জি। সেখানে সর্বভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনের রান্নাঘরেও দেখা যায় তাঁকে। সাক্ষাৎকারের ফাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের সঙ্গে আড্ডা দেন অভিজিৎ ব্যানার্জি। খেললেন টেবিল টেনিস। নোবেলজয়ীর সঙ্গে সেলফি নেওয়া কি কম কথা!‌‌ প্রাক্তনীর কাছে বর্তমান পড়ুয়াদের সেই আবদারও মেটালেন তিনি। রাতে অভিজিৎ তাঁর ভাই অনিরুদ্ধ ভাস্কর ব্যানার্জির সঙ্গে দেখা করেছেন। সোমবার দিল্লির এক পাঁচতারা হোটেলে তাঁর বই‘‌ দ্য গুড ইকনমিকস ফর হার্ড টাইমস’‌ প্রকাশ অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি। ওইদিন সন্ধ্যায় ‘‌দ্য প্রিন্টের’‌ একটি অনুষ্ঠানেও যোগ দেওয়ার কথা তাঁর।  
এদিন অভিজিৎ ব্যানার্জি বলেছেন, সরকারের কর্পোরেট করে ছাড় দেওয়া ভুল পদক্ষেপ। দেশের অর্থনৈতিক নীতি ভুল পথে চলছে। চাহিদা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া উচিত। তাঁর বক্তব্য, প্রত্যেকের ন্যূনতম আয় সুনিশ্চিত না হওয়ায় সরকারি প্রকল্পগুলির যথার্থ বাস্তবায়নে ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষকে আলাদা ভাবে বাছাই করা প্রয়োজন। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে কংগ্রেসের ‘‌ন্যায়’  প্রকল্পের রূপ দিতে যাঁরা সহায়তা করেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অভিজিৎ ব্যানার্জি। কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে দেশের ২০ শতাংশ গরিব পরিবারকে ন্যায় প্রকল্পের আওতায় আনবে বলে লোকসভা ভোটের ঠিক আগে ঘোষণা করে। ন্যায় প্রকল্পকে ‘‌দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’‌ আখ্যা দিয়েছিল কংগ্রেস। কিন্তু, নির্বাচনে ভরাডুবি হয় কংগ্রেসের। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘‌লোকসভা নির্বাচনে মানুষ ভোট দিয়েছেন মোদিকে। অন্য সব ইস্যুকে ছাপিয়ে জাতীয়তাবাদ, সন্ত্রাসবাদ বড় ইস্যু হয়েছিল। জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অটল দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মোদির। দেশবাসী তাতে 
সাড়াও দিয়েছেন।’‌
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে অভিজিৎ নিজের পারিবারিক জীবন নিয়েও কথা বলেছেন। মার্চ মাসে কলকাতায়  প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর বাবার (‌দীপক ব্যানার্জি)‌ স্মারক বক্তৃতা দিতে আসবেন বলে জানিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী এস্থার দুফলো সঙ্গে আসবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‌আশা করছি আসবে।’‌ এস্থারের কোন দিকটা তাঁর পছন্দের? অভিজিতের উত্তর, ‘‌ও সব সময়েই আশাবাদী। সব সময়ে নতুন কিছু করতে আগ্রহী। নতুন ভাবনা নিয়ে মেতে থাকে। ওর মধ্যে অনেক প্রশংসনীয় গুণ আছে।’‌ নিজে রান্না করতে ভালবাসেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রী কী ভালবাসেন?‌ ফুলকপি আর ভাজা মুগ ডাল, জানিয়েছেন অভিজিৎ। রসগোল্লা না ইলিশ, প্রবাসে কোনটা মিস করেন?‌ অভিজিৎ জানিয়েছেন, ইলিশ। 
গত কয়েকদিনে অভিজিৎ–‌‌এর নোবেল পাওয়া নিয়ে বিজেপি নেতা, সরকারের মন্ত্রীরা কটাক্ষ করেছেন। 
‘‌ন্যায়’ নিয়ে‌ তাঁর ভাবনা ভারতের জনগণ খারিজ করে দিয়েছে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের মন্তব্যে কিছুটা হতাশ বলে জানিয়েছেন অভিজিৎ ব্যানার্জি। গতকালই রেলমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল মন্তব্য করেছিলেন, ‘অভিজিৎ ব্যানার্জিকে অভিনন্দন। কিন্তু ওঁর ভাবনা পুরোটাই বাম ঘেঁষা। উনি ন্যায় প্রকল্পেরও অনেক গুণগান গেয়েছেন। দেশবাসী তাঁর ভাবনাকে খারিজ করে দিয়েছে।’‌ এর আগে বিজেপি সাংসদ অনন্ত হেগড়ে অভিজিৎ–‌‌এর সমালোচনা করেন। বাংলার বিজেপি নেতা রাহুল সিনহা তাঁকে ব্যক্তিগত আক্রমণও করেন। এদিন কংগ্রেস নেতা কপিল সিবাল বলেছেন, ‘‌পীযূষ গোয়েল বলছেন দেশে অর্থনীতি সঙ্কট নেই। অভিজিৎ ব্যানার্জিকে বামঘেঁষা বলছেন। আমার প্রশ্ন, আইএমএফ, বিশ্বব্যাঙ্ক, ফিচ রেটিংস কি বামঘেঁষা?’‌ 
বিজেপি নেতা–‌‌মন্ত্রীদের মন্তব্য নিয়ে কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও সরব হয়েছেন। প্রিয়াঙ্কা টুইটে লিখেছেন, ‘‌দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। সরকারের কাজ অর্থনৈতিক সঙ্কটের সমাধান করা, কমেডি সার্কাস চালানো নয়!‌ নিজেদের কাজ না–করে বিজেপি নেতারা অন্যদের কৃতিত্বকে খাটো করার চেষ্টা করছে। নোবেল যিনি পেয়েছেন তিনি সততার সঙ্গে দ্ব্যর্থহীন ভাবে নিজের কাজ করেছেন, তাই নোবেল পেয়েছেন।’‌

জনপ্রিয়

Back To Top