আবু হায়াত বিশ্বাস
দিল্লি, ২৭ নভেম্বর

প্রতিবাদী কৃষকদের অদম্য জেদের কাছে হার মানতে বাধ্য হল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে থাকা দিল্লি পুলিশ। লাঠি, কাঁদানে গ্যাস ব্যর্থ হওয়ার পর কৃষক নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হল দিল্লি পুলিশ। বৈঠকের পর দুপুরে রাজধানীতে কৃষকদের ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়। বুরারি এলাকায় নিরঙ্করী সমাগম মাঠে প্রতিবাদ–অবস্থান করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে কৃষকদের। 
আন্দোলনের উদ্যোক্তা কৃষক সংগঠনের দাবি, দেশের অন্নদাতা কৃষকদের আন্দোলনকে ভয় পেয়েছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী আন্দোলনরত কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছেন, নরেন্দ্র মোদি সরকারকে কৃষকদের দাবি মানতে হবে। 
বৃহস্পতিবারের মতোই এদিন সকাল থেকেই ফের কৃষক বিক্ষোভে উত্তাল হয় দিল্লি–‌‌হরিয়ানা সীমানা। কৃষকদের আটকাতে চলে লাঠি। দিল্লির সিংঘু সীমানায় বিক্ষোভরত কৃষকদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসও ছোড়ে পুলিশ। তবে এত কিছুর পরেও রোখা যায়নি কৃষকদের। ব্যারিকেড, কাটাতাঁরের বেড়া, জলকামান, কাঁদানে গ্যাস উপেক্ষা করে দিল্লি অভিমুখে এগিয়ে চলেন কৃষকরা। তারপরেই বৈঠকে বসে পুলিশ।
কৃষক–বিরোধী তিনটি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে হাজার হাজার কৃষক ‘‌দিল্লি চলো’ অভিযানে নেমেছেন। রাজধানীতে যাতে কৃষকরা ঢুকতে না পারেন তার জন্য দিল্লি সীমানায় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। চিল্লা, তিকরি, বাহাদুরগড়, ফরিদাবাদ, কালিন্দী, ও সিংঘু বর্ডারে ব্যারিকেড গড়ে তোলে দিল্লি পুলিশ। কৃষকদের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধও বাধে। প্রবল ঠান্ডার মধ্যেই হরিয়ানার সোনপতে গত রাতে কৃষকদের ওপর জলকামান চালায় হরিয়ানা পুলিশ। তবে, এত কিছু করেও দমিয়ে রাখা যায়নি কৃষকদের। 
এদিন সকালে দিল্লির যন্তরমন্তরে কৃষক সংগঠনের নেতারা মিছিল করেন। পুলিশ বিক্ষোভরতদের আটক করে। গতকালের মতোই এদিনও দিল্লিতে গ্রিন লাইনে মেট্রো পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়। প্রতিবেশী রাজ্যগুলির একাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর জেরে রাজধানীর বিস্তীর্ণ অংশে ব্যাপক যানজট হয়। দিল্লি সীমানায় কৃষকদের ট্রাক্টর মিছিলে অবরুদ্ধ হয় রাস্তা। 
এদিন কৃষকদের রাজধানীতে প্রবেশের জন্য দিল্লি–‌‌হরিদ্বার রোড খুলে দেয়  পুলিশ। শনিবার সকালেই উত্তরপ্রদেশ–সহ উত্তর ভারতের কৃষকরা দিল্লিতে পৌঁছবেন বলে জানিয়েছে অল ইন্ডিয়া কিসান সঙ্ঘর্ষ কো–‌‌অর্ডিনেশন কমিটি। কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে দীর্ঘ লড়াইয়ের হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা। কৃষক সংগঠনের তরফে এদিনই প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেওয়া হয়। তাতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের নিয়ে সর্বভারতীয় কৃষক সংগঠন ও‌ আঞ্চলিক সংগঠনগুলির সঙ্গে আলোচনায় বসার আবেদন জানানো হয়েছে।
এদিন, রাজধানীর ৯টি স্টেডিয়ামকে অস্থায়ী জেলখানা হিসেবে ব্যবহারের জন্য দিল্লি পুলিশের তরফে দিল্লি সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, অরবিন্দ কেজরিওয়াল সরকার পুলিশের আবেদন খারিজ করে দেয়। জানিয়ে দেওয়া হয়, আন্দোলনকারী কৃষকদের দাবি ন্যায্য এবং তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছেন। এটা সাংবিধানিক অধিকার। তাই তাঁদের আটক রাখার জন্য কোনও ক্রীড়াঙ্গন বা অন্য কোনও রাজ্য সরকারি পরিকাঠামো ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। 
এদিকে, গতকালই কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র সিং তোমর আলোচনার বার্তা দিয়েছিলেন। ৩ ডিসেম্বর ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের বিষয়ে আলোচনায় বসার জন্য কৃষক প্রতিনিধিদলের কাছে আবেদন জানিয়েছেন তিনি। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা না–করে এখনই আলোচনায় বসার দাবি জানিয়েছেন। দিল্লিতে কৃষকদের ঢোকার অনুমতি দেওয়া প্রসঙ্গে অমরিন্দর বলেছেন, ‘‌কৃষকদের প্রতিবাদের গণতান্ত্রিক অধিকার দেওয়ায় কেন্দ্রের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছি। কৃষি আইন নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে আলোচনায় বসা উচিত কেন্দ্রের এবং একটা সমাধানের রাস্তা বার করা উচিত।’‌
কৃষকদের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী দাবি করেছেন, কৃষকবিরোধী কালা কানুন প্রত্যাহার করতে হবে। টুইটে রাহুল লেখেন, ‘‌প্রধানমন্ত্রীর মনে রাখা উচিত, যখন অহঙ্কার সত্যের মুখোমুখি হয়, তখন অহঙ্কার হেরে যায়। কৃষকরা সত্যের জন্য লড়াই করছে, বিশ্বের কোনও সরকারই তাদের আটকাতে পারবে না। মোদি সরকারকে কৃষকদের দাবি মানতে হবে এবং কালা কানুন প্রত্যাহার করতে হবে। এ তে সবে শুরু!’‌ 
এদিকে সারা ভারত কিসান সভার নেতা হান্নান মোল্লা বলেন, ‘কৃষক আন্দোলন নিয়ে মোদি সরকার রীতিমতো আতঙ্কে রয়েছে। শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন করতে লাঠি, গ্যাস, জলকামান প্রয়োগ করছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও জনগণের কন্ঠস্বর রোধ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে মোদি সরকার। দেশের অন্নদাতা কৃষকদের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ চালিয়েছে বিজেপি সরকারের পুলিশ। এটা ফ্যাসিবাদী বর্বরতা ছাড়া কিছু নয়।’‌ হান্নানের আরও বক্তব্য, ‘‌কেন্দ্রীয় সরকার শুধু পাঞ্জাবের কৃষকদের নিয়ে আলোচনায় বসতে চাইছে। দেখাতে চাইছে, কেবল পাঞ্জাবের কৃষকরাই প্রতিবাদে নেমেছে। আমাদের দাবি, তিনটি কৃষক বিরোধী আইনের প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনার টেবিলে গোটা দেশের কৃষক সংগঠনগুলির সঙ্গে বসুক কেন্দ্র।’‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top