রাজীব চক্রবর্তী
দিল্লি, ১৮ সেপ্টেম্বর

কৃষি বিল বিতর্কে জর্জরিত নরেন্দ্র মোদি সরকার। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দিয়েছেন খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ মন্ত্রী হরসিমরত কউর বাদল। ওদিকে, হরিয়ানায় মনোহরলাল খট্টর সরকারের ওপর চাপ বা‌ড়াচ্ছে শরিক  জননায়ক জনতা পার্টি (‌জেজেপি)‌। গত বছর মহারাষ্ট্রে বিজেপি–‌‌র সঙ্গ ছেড়েছে তাদের সবচেয়ে পুরনো সঙ্গী শিবসেনা। এখন জল যেদিকে গড়াচ্ছে, পাঞ্জাব ও হরিয়ানাতেও বড়সড় ধাক্কার আশঙ্কা করছে কেন্দ্রের শাসক দল। হরিয়ানার এনডিএ সরকার জেজেপি–র ওপর নির্ভরশীল।
মন্ত্রিসভায় ভাঙন ও শরিক দলের ক্ষোভ সত্ত্বেও কৃষি বিল ইস্যুতে পিছু হটতে নারাজ কেন্দ্রীয় সরকার। শুক্রবার বিহারে কোশী নদীর ওপর প্রস্তাবিত একটি সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে ভার্চুয়াল সভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘কৃষকদের উস্‌কে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ভুল তথ্য ও পরিসংখ্যান পেশ করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, কৃষক নাকি ফসলের ন্যায্য দাম পাবেন না! কিন্তু যাঁরা এ–‌সব রটাচ্ছেন, তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন, আজকের কৃষক অনেক সচেতন।’ মোদি আরও বলেছেন, ‘ঐতিহাসিক এই বিল কৃষকের রক্ষাকবচ। কৃষককে ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য পাইয়ে দিতে কেন্দ্রীয় সরকার বদ্ধপরিকর।’‌
লোকসভায় বৃহস্পতিবার কৃষি বিল পাশ হওয়ার সময়েই মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে গিয়েছেন অকালি দলের হরসিমরত কউর। ইস্তফা দেওয়ার পর টুইটে তিনি জানান, কৃষক ‘ভাইবোনদের’ স্বার্থেই তাঁর এই সিদ্ধান্ত। বিলগুলিকে ‘‌‌‌কৃষকবিরোধী’ আখ্যাও দিয়েছেন তিনি। এনডিএ ছাড়ার বিষয়ে তাঁর দলে আলোচনা চলছে। শুক্রবার তিনি বলেছেন, অনেক চেষ্টা করেও নিজের সরকারকে তিনি এই বিলটি অন্তত সিলেক্ট কমিটিতে পাঠাতেও রাজি করাতে পারেননি। এদিকে হরিয়ানা সরকারের শরিক দল জেজেপি–‌‌র অসন্তোষ এদিন সামনে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী মনোহরলাল খট্টরের সঙ্গে দেখা করেছেন জেজেপি নেতা দুষ্মন্ত সিং চৌতালা। সেখানে সরকারের ওপর কালো মেঘ ঘনিয়েছে। 
কংগ্রেস যেভাবে অকালি ও জেজেপি–‌‌র ওপর চাপ বাড়াচ্ছে তাতে ওই দুই দলের পক্ষে এনডিএ–‌‌তে থেকে নিজেদের রাজ্যে রাজনীতি করা প্রায় অসম্ভব হতে পারে। ৩টি বিল নিয়েই পাঞ্জাব, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশে কৃষক বিক্ষোভ চলছে ৷ দলমত নির্বিশেষে পথে নেমেছে কৃষক। দাবি, বিল ফেরত নিতে হবে। কৃষক অসন্তোষের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে রাজস্থান, ছত্তিশগড় ও তামিলনাড়ুতেও। বাস্তব পরিস্থিতি এমন যে, দিল্লিতে বিজেপি সরকারের মন্ত্রিসভায় থেকে পাঞ্জাবে গিয়ে মানুষের সম্মুখীন হওয়া অকালিদের পক্ষে এক মস্ত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। তাতে দলের ভিত নড়ে যেতে পারে। ধাক্কা খাচ্ছে ভোটব্যাঙ্ক। সেক্ষেত্রে দল বাঁচলে পরে মন্ত্রিত্ব নিয়ে ভাবা যাবে, এই পন্থা বেছে নিয়েছেন হরসিমরতের স্বামী অকালি দলের প্রধান সুখবীর সিং বাদল। সংসদে বিলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে প্রয়োজনে এনডিএ ছাড়ার কথাও বলেছেন তিনি। 
হরসিমরত বলেছেন, ‘‌বিলগুলি আনার আগে একবারও আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেনি বিজেপি। কৃষকদরদি দল হিসেবে নৈতিক ভাবে মন্ত্রিসভার সদস্য থাকা সম্ভব নয়। তবে, এনডিএ–‌‌তে থাকা না–‌থাকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে দল।’‌ পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দর সিং এবং কংগ্রেস মুখপাত্র রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা প্রশ্ন তুলেছেন, হরসিমরত সংসদে বিল আসার আগে ৫ জুন মন্ত্রিসভার বৈঠকে অধ্যাদেশের বিরোধিতা করেননি কেন?‌ তাঁদের অভিযোগ, চাপে পড়ে বিরোধিতা করছে অকালি দল।
হরিয়ানাতেও চাপে পড়েছে বিজেপি। ওই রাজ্যেও রাস্তায় নেমেছেন কৃষকরা। আন্দোলন দমনে লাঠি চালিয়েছে পুলিশ। তাতে আন্দোলন এতটুকু কমেনি, বরং আরও কয়েকগুণ বেড়েছে। স্বভাবতই নানা মহল থেকে চাপ বাড়ছে দুষ্মন্ত সিং চৌতালার ওপরেও। তিনি পাল্টা চাপ সৃষ্টি করেছেন রাজ্য সরকারের ওপর। শুক্রবারই তিনি মুখ্যমন্ত্রী মনোহরলাল খট্টরের সঙ্গে দেখা করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। হরিয়ানায় জেজেপি–র ১০ বিধায়কের সমর্থনে ক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছিল বিজেপি। বিজেপি–‌‌কে সমর্থন করার বদলে জেজেপি নেতা দুষ্মন্ত সিং চৌতালাকে উপমুখ্যমন্ত্রীর পদ দেওয়া হয়েছে। খট্টরের সঙ্গে বৈঠকের পর দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেছেন দুষ্মন্ত।
এদিকে দুষ্মন্তকে কটাক্ষ করে কংগ্রেস নেতা রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা বলেছেন, ‘‌দুষ্মন্তজি, হরসিমরতকে দেখে আপনারও উপমুখ্যমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেওয়া উচিত। তবে, আপনি পদ আঁকড়ে আছেন। কৃষকদের স্বার্থের থেকে আপনার নিজের চেয়ারটাই বেশি পছন্দ।’
লকডাউনের মধ্যেই গত ৫ জুন কৃষিক্ষেত্রে সংস্কার সংক্রান্ত ৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল মোদি সরকার। প্রথমটিতে পণ্য আইনে সংশোধন করে চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, গম, ভোজ্যতেল, তৈলবীজ যত ইচ্ছে মজুত করার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়টিতে কৃষিপণ্যের ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারী ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ সংস্থাগুলি যাতে চুক্তির ভিত্তিতে চাষ করিয়ে সরাসরি কৃষকের থেকে ফসল কিনতে পারে, তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তৃতীয়টিতে এমন একটি বন্দোবস্ত তৈরি করার কথা বলা হয়েছে যেখানে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ‘‌এপিএমসি’‌(‌এগ্রিকালচারাল প্রোডিউস মার্কেট কমিটি)‌–‌‌র আওতায় নিবন্ধিত বাজারে তাদের ফসল বিক্রি ও ক্রয়ের স্বাধীনতা পাবেন। লোকসভায় দুটি বিল পাশ হয়েছে। রাজ্যসভায় এখনও পাশ হয়নি। বিরোধীদের অভিযোগ, ৩টি বিলই ‘কৃষকবিরোধী’। কৃষকদের স্বার্থের পরিবর্তে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখা হয়েছে।

জনপ্রিয়

Back To Top