‌‌সংবাদ সংস্থা
দিল্লি, ৩০ সেপ্টেম্বর

‌রাত ১টা। দিল্লি থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে উত্তপ্রদেশের হাথরসে গণধর্ষিতা তরুণীর বাড়ি ঘিরে ধরেছিল বিশাল পুলিশবাহিনী। মাটিতে শুয়ে হাহাকার করছিলেন তরুণীর মা। টেনে হিঁচড়ে তরুণীর পরিবারের লোকজনকে একে একে ঘরে ঢুকিয়ে দেয় পুলিশ। বাইরে থেকে তালা মেরে দেয়। অ্যাম্বুল্যান্সে ছিল তরুণীর দেহ। আচমকাই অ্যাম্বুলেন্সের ওপর ঝাঁপিয়ে প‌ড়েন এক মহিলা। পরিবার অনুরোধ করেছিল, একবার যেন শেষ দেখা দেখতে দেওয়া হয়। মাঝরাতে চুপিসারে অন্ত্যেষ্টি করেছে পুলিশ ও প্রশাসন। 
মেয়েটির দাদা বলছেন, ‘‌প্রশাসন সমানে চাপ দিচ্ছে। স্থানীয় পুলিশকে আর ভরসা করতে পারছি না। নিরাপত্তা চাই। বিচারবিভাগীয় তদন্ত চাই। ‌বলেছিলাম সকালে আমরাই শেষ কাজ করব। অন্ত্যেষ্টির আগে কিছু রীতি ছিল। সেটুকুও করতে দিল না। ওরা আমাদের কথাই শুনল না।’‌ গতরাতে দিল্লির সফদরজং হাসপাতাল থেকে মরদেহ পাওয়ার পর পরিবারকে আর কাছে ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি। মেয়েটির বাবা দিল্লি থেকে হাতরাস পৌঁছোতেই তাঁকে সরাসরি শ্মশানে যেতে বলে পুলিশ। ৩০–‌‌৪০ পড়শি, আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে চাঁদপা থানা অন্তর্গত স্থানীয় বুলগরহি শ্মশানে রওনা দেন মেয়েটির বাবা। 
শ্মশানে নয়, নির্যাতিতার দেহ পোড়ানো হয়েছে বাড়ি থেকে কিছু দূরে এক গমের ক্ষেতে। কোনও রীতি মানা হয়েছে কিনা জানা নেই, বলেছেন মৃতার বাবা। রাতের আঁধারে ক্ষেতের মাঝে দাউদাউ আগুনে পুড়ে গেছে ১৯ বছরের মেয়েটার দেহ। ঘরে বসে সেই বীভৎস দৃশ্য কল্পনা করে জ্ঞান হারিয়েছেন মা। সোশ্যাল মিডিয়ায় ফাঁস হওয়া কিছুতে দেখা গিয়েছে বর্ম, হেলমেট পরে হাজির ছিল সশস্ত্র পুলিশ!‌ 
৮ বছর আগে নির্ভয়া–‌কাণ্ড মনে করিয়ে দেওয়া উত্তরপ্রদেশের এই গণধর্ষণ সারা দেশে তোলপাড় ফেলে দিয়েছে। দোষীদের কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তির দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। চাপে পড়েই দু’‌ সপ্তাহ আগে হাতরাসের গণধর্ষণ কাণ্ডের তদন্তে তিন সদস্যের সিট গঠন করেছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। তাদের ৭ দিনের মধ্যে তদন্তের রিপোর্ট জমা দিতে বলেছেন। পরে তিনি ভিডিও কনফারেন্সিং করে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। জানিয়ে দেন, পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা ও একটি বাড়ি দেওয়া হবে, আর পরিবারের এক সদস্যকে দেওয়া হবে চাকরি।
এর আগে, যোগীর শাসনকালেই উন্নাওয়ে দু’‌টি গণধর্ষণ ঘটে গিয়েছে। তার একটি একদা বিজেপি বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গারের লালসার শিকার নির্যাতিতা এইমসে কোমায় আচ্ছন্ন। উন্নাওয়ের অন্য ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে গিয়ে তাদের স্যাঙাতদের হাতে প্রহৃত হয়ে নির্যাতিতার মৃত্যু হয়। 
মেয়েটির পরিবারের মামলা নিতে পুলিশের টালবাহানা, চিকিৎসার জন্য আগেই দিল্লিতে না পাঠানো এবং সর্বোপরি পরিবারের অমতে গা জোয়ারি করে তার অন্ত্যেষ্টি সেরে ফেলায় উত্তরপ্রদেশ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। পরপর টুইটে প্রিয়াঙ্কা জানিয়েছেন, হাতরাসের নির্যাতিতার মৃত্যুর পর তাঁর বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলাম। তাঁর অসহায় কান্না শুনেছি। উনি বলছিলেন মেয়ের জন্য ন্যায়বিচার চাই। গতরাতে শেষবারের মতো মেয়ের মরদেহ বাড়িতেই নিয়ে যেতে পারেননি তিনি। তড়িঘড়ি অন্ত্যেষ্টি করে দেওয়া হয়েছে। পরিবারকে কাছে ঘেঁষতেই দেওয়া হয়নি।’‌
অন্য একটি টুইটে যোগী আদিত্যনাথের পদত্যাগ দাবি করেন প্রিয়াঙ্কা। জানান, ‘‌পদত্যাগ করুন!‌ নির্যাতিতা এবং তাঁর পরিবারকে নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে আপনি মৃত্যুর পরেও ন্যূনতম মানবাধিকার রক্ষা করতেও ব্যর্থ হয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী থাকার নৈতিক অধিকার আর আপনার নেই।’‌
আরেকটি টুইটে কংগ্রেস নেত্রী জানান, ‘‌রাত আড়াইটে অবধি প্রশাসনকে অনুরোধ করেছে পরিবার। তবু তারা জোর করে মেয়েটির অন্ত্যেষ্টি করে ফেলে। মেয়েটি বেঁচে থাকতে সরকার সুরক্ষা দেয়নি। নির্যাতনের পর, সময়মতো তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেনি। মৃত্যুর পর মেয়েটির কাজ করার অধিকারও তাঁর পরিবারের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। মৃতের প্রতিও তাঁদের সম্মান নেই। চরম অমানবিকতা।’‌
প্রসঙ্গত, ১৪ সেপ্টেম্বর মায়ের সঙ্গে খেতে কাজ করতে গিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যান ১৯ বছরের মেয়েটি। পরে দূরে তাঁর ক্ষতবিক্ষত, বিবস্ত্র দেহ উদ্ধার হয়। সংজ্ঞা ফিরলে মেয়েটি জানান, তাঁর ওড়না টেনে নিয়ে সেটা গলায় পেঁচিয়ে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ৪ যুবক। পালা করে ধর্ষণ করে, অত্যাচার করে পালায়। 
 

জনপ্রিয়

Back To Top