রাজীব চক্রবর্তী
দিল্লি, ৩০ সেপ্টেম্বর

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় অভিযুক্তরা বেকসুর খালাস হতে আদালতেই উঠল ‘‌জয় শ্রীরাম ধ্বনি’‌। আর টিভিতে এই রায় শুনে আকাশ থেকে পড়লেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব মাধব গোডবোলে। তাঁর মতে, ‘‌এতবছর পর এমন রায় হলে তো দেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।’‌
এদিকে, রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অল ইন্ডিয়া পার্সোনাল ল’‌ বোর্ড। দীর্ঘ ২৮ বছর পর এমন রায়ে অখুশি কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিএম, মিম–‌‌সহ বিরোধী শিবিরও। তাদের দাবি, লখনউয়ের বিশেষ সিবিআই আদালতের রায় সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পরিপন্থী। সাংবিধানিক স্বচ্ছতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখতে এই রায়কে শীর্ষ আদালতে চ্যালেঞ্জ করুক কেন্দ্রীয় সরকার ও যোগী আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশ সরকার। 
রায় সম্পর্কে প্রাক্তন আমলা মাধব গোডবোলে বলেছেন, ‘‌সিবিআই বিশেষ আদালতের রায়ে খুবই অবাক হয়েছি৷ ‌আগাম পরিকল্পনা ছাড়া অমন বিপুল সংখ্যক করসেবক জড়ো করা সম্ভব ছিল না। তাই স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে জড়ো হওয়ার তত্ত্ব মানতে পারছি না। সুপ্রিম কোর্ট এই ঘটনাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছিল। তার পরেও সিবিআই কোনও প্রমাণ পেল না! দীর্ঘ ২৮ বছর পরে যদি এমন রায় দেওয়া হয়, তাহলে তো আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।‌’ ২৮ বছর আগে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব ছিলেন।
কংগ্রেস নেতা রণদীপ সিং সুরজেওয়ালার মতে, বিশেষ সিবিআই আদালতের রায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিপরীত। তিনি বলেছেন, ‘‌দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সংবিধানের ওপর ন্যূনতম আস্থা যাঁদের রয়েছে, তাঁরা আশা করছেন বিশেষ আদালতের এই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানাবে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার।’‌ শিবসেনা নেতা সঞ্জয় রাউত অবশ্য মনে করছেন, অযোধ্যা মামলার রায় ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ভূমিপুজোর পরেই বাবরি মসজিদ ধবংসের মামলা গুরুত্ব হারিয়েছিল। গত বছর ৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ৫ বিচারপতির বেঞ্চ কিন্তু জানিয়েছিল, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনাটি বেআইনি এবং সম্পূর্ণ আইনবিরুদ্ধ ছিল। 
বুধবার লখনউয়ের বিশেষ সিবিআই আদালতের বিচারক সুরেন্দ্রকুমার যাদব বলেছেন, ‘‌বাবরি মসজিদ ধ্বংস পূর্বপরিকল্পিত ছিল না। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে এই ঘটনার সঙ্গে আরএসএস এবং ভিএইচপি–‌র কোনও সম্পর্ক ছিল না।’ ফলে রেহাই পেলেন লালকৃষ্ণ আদবানি, মুরলীমনোহর যোশি, উমা ভারতী, কল্যাণ সিং, সাক্ষী মহারাজ–‌সহ বিজেপি এবং আরএসএসের ৩২ নেতা। রায় শুনেই দিল্লির বাড়িতে ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ ধ্বনি তুললেন ৯২ বর্ষীয় আদবানি। টিভিতে রায় শুনেই আদবানির বাড়িতে ছুটে যান কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ। আদবানি, যোশিদের শুভেচ্ছা জানান বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডা, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। রাজনাথ টুইটারে লিখেছেন, ‘‌রায়কে স্বাগত। দেরিতে হলেও বিচারব্যবস্থার জয় হল।’ 
আদবানি নিজে বলেছেন, ‘এই রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খুশির খবর। অনেক দিন পর এমন খুশির খবর শুনলাম। বিশেষ সিবিআই আদালতের রায়কে স্বাগত জানাই। এই রায়ে রামজন্মভূমি আন্দোলনের প্রতি আমার এবং বিজেপি–‌র বিশ্বাস ও আস্থার জয় হল।’ যোশি বলেছেন, ‘ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। প্রমাণ হল, ঘটনার পিছনে কোনও ষড়যন্ত্র ছিল না। আমাদের কর্মসূচি ও সমাবেশ কোনও ষড়যন্ত্রের বিষয় ছিল না।  আমরা খুশি। এবার প্রত্যেকেরই উচিত রাম মন্দিরের নির্মাণে মনোযোগ দেওয়া।’
ওদিকে, ‘‌অল ইন্ডিয়া মজলিস–‌ই–‌ইত্তেহাদুল মুসলেমিন’–‌‌এর প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি বলেছেন, ‘আজ ভারতীয় বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে কালো দিন। আদালত বলছে কোনও ষড়যন্ত্র ছিল না। আমাকে বলুন, কোনও ঘটনা যে স্বতঃস্ফূর্ত নয়, সেটা প্রমাণ করতে কত দিন বা কত মাসের প্রস্তুতি প্রয়োজন হয়।’
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর করসেবকদের হাতুড়ি ও কুড়ুলের ঘায়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বাবরি মসজিদ। অভিযোগ ছিল, সেই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে করসেবকদের প্ররোচনা দিয়েছিলেন অনেকে। শুরুতে দুটি এফআইআর দায়ের হয়েছিল। একটি অজ্ঞাতপরিচয় করসেবকদের বিরুদ্ধে। দ্বিতীয়টি নেতাদের বিরুদ্ধে। তার পরে মোট ৪৫টি এফআইআর দায়ের করা হয়। রায়বরেলিতে তৈরি হয় সিবিআইয়ের বিশেষ আদালত। তারপর থেকেই মামলা চলছে। ২০০১–‌এ আদবানি, যোশিদের অভিযোগ থেকে রেহাই দেয় এলাহাবাদ হাইকোর্ট। কিন্তু, ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দেয়, হাইকোর্টের রায় ভুল। আদবানিরা অভিযুক্তই। মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ সিবিআই আদালত গঠন করে দু’‌‌বছরের সময়সীমা বেঁধে দেয় শীর্ষ আদালত। নির্দেশ দেওয়া হয়, প্রতিদিন শুনানি করে দ্রুত মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে। পরে অবশ্য সেই সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। 
এরইমধ্যে গতবছর নভেম্বরে অযোধ্যার জমি সংক্রান্ত মামলার চূড়ান্ত রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। বিতর্কিত জমিতে রামমন্দির নির্মাণে সম্মতি দেওয়া হয়। গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে অযোধ্যায় রামমন্দিরের ভূমিপূজোও সম্পন্ন হয়েছে।‌‌
প্রশ্ন, সিবিআই কি এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাবে?‌ নাকি তারাও নিষ্কৃতি পেল এই রায়ের পর?‌ তদন্ত সংস্থার কোঁসুলি ললিত সিং জানান, রায়ের পুরো কপি পাওয়ার পর তা দিল্লিতে সিবিআই সদর দপ্তরে পাঠানো হবে। সংস্থার আইন সংক্রান্ত শাখা তা পর্যালোচনা করে যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেবে। বস্তুত, সিবিআই বা আইনি প্রক্রিয়া থেকে নতুন কিছুর আশা কেউই সেভাবে করছেন না। গত ২৮ বছরে কেন্দ্রে একাধিকবার সরকার বদল হয়েছে। এর মধ্যে বিজেপি সরকার চালিয়েছে ১২ বছরেরও বেশি সময়। এর মধ্যে মামলার গতিপ্রকৃতিতেও নানা বদল আসে।
মনে পড়তে পারে, গত বছর নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ অবসর নেওয়ার ঠিক আগেই তাঁর বেঞ্চ অযোধ্যা মামলার রায় দেয়। মার্চেই গগৈ পেলেন রাজ্যসভার মনোনয়ন।‌
ছবি: পিটিআই

জনপ্রিয়

Back To Top