আজকালের প্রতিবেদন: তিনি ‘‌গরিবের অর্থনীতি’‌ নিয়ে কাজ করেন। তঁার গবেষণা ভারত–সহ সারা বিশ্বে দারিদ্র‌্য দূর করতে যে সহায়ক হয়, সেই স্বীকৃতি খোদ নোবেল কমিটি তঁাকে দিয়েছে। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা, কংগ্রেসের ‘‌ন্যায়’‌ কর্মসূচির রূপরেখা তৈরি হয়েছে তঁারই পরামর্শ মেনে। আরও সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার, তিনি সরকার–বিরোধিতার পীঠস্থান জেএনইউ–তে পড়াশোনা করেছেন এককালে। সেসময় অধ্যক্ষকে ঘেরাও করার অপরাধে গ্রেপ্তার হয়ে কিছুদিন তিহার জেলেও থাকতে হয়েছে তঁাকে। কাজেই এ ‌বছর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জিকে স্বাভাবিক এবং সহজ শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে সময় নষ্ট করেনি বিজেপি। অর্থনীতিতে নোবেল যে আসলে নোবেল পুরস্কার নয়, বরং সুইডেনের সরকারি ব্যাঙ্কের দেওয়া সমগোত্রীয় একটি পুরস্কার— এই কূটতর্ক থেকে শুরু করে অভিজিৎ ব্যানার্জির ব্যক্তিগত জীবন, সবই বিজেপি নেতাদের কুৎসা, কটাক্ষের নিশানা হয়েছে। কিন্তু অভিজিৎ নিজে বলছেন, কোনও ভাল জনকল্যাণ কর্মসূচি রাজনৈতিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। কংগ্রেস তাদের ন্যায় প্রকল্পের জন্য তঁার কাছে তথ্য–পরিসংখ্যান চেয়েছিল, তাই তিনি দিয়েছেন। বিজেপি যদি চাইত, তাদেরকেও দিতেন। নির্দ্বিধায়। অবশ্য এই সৎ স্বীকারোক্তির পরও যে তিনি নেতাদের আক্রমণের লক্ষ্য হবেন না, এমন কথা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। কিন্তু নিজের নিরপেক্ষ বিশ্বাসের কথা বলতে পিছপা হচ্ছেন না অভিজিৎ। ঠিক যেভাবে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির খবরে নিজের প্রথম প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে, সাংবাদিকদের অনুরোধে বাংলায় বলেছিলেন— বড়লোকদের নয়, গরিবের হাতে অর্থ যাওয়া জরুরি।
এক জাতীয় দৈনিককে দেওয়া খোলামেলা সাক্ষাৎকারে অভিজিৎ এবং তঁার নোবেল বিজয়িনী সহ–গবেষক স্ত্রী এস্থার দুফলো নিজেদের কাজের নানা বিষয়ে আলো ফেলেছেন। সেই প্রসঙ্গে অবধারিতভাবেই উঠেছিল কংগ্রেসের ‘‌ন্যায়’‌ প্রকল্পের জন্য রাহুল গান্ধীকে পরামর্শ দেওয়া নিয়ে এখনকার রাজনৈতিক বিতর্কটি। একটি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হওয়াটা কি ভুল হয়েছিল?‌ প্রশ্ন করা হয় অভিজিৎকে। খুব সোজাসাপ্টা উত্তর দিয়েছেন তিনি, যে তঁার কোন কাজের কী অর্থ করবে লোকে, এই ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে তিনি পছন্দ করেন না। (‌ওরা)‌ কংগ্রেস তঁাকে খুব বাস্তবিক একটা প্রশ্ন করেছিল, যে প্রত্যেক নাগরিকের রোজগার নিশ্চিত হবে, এমন একটা প্রকল্পের রূপায়ণে কত টাকা খরচ হতে পারে?‌ তিনি পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখে সেই তথ্য জুগিয়েছিলেন। কংগ্রেস না হয়ে যদি বিজেপি ওই তথ্য চাইত, তিনি দিতেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, রাজনৈতিক ভাবনা থেকে কোনও ভাল প্রকল্পকে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। এসব ক্ষেত্রে সৎ থাকা জরুরি এবং সেই সততাই তঁাদের প্রধান অস্ত্র। কাজের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পক্ষপাত মাঝখানে থাকবে না, এটাই তঁারা বিশ্বাস করেন।
সাক্ষাৎকারের এই জায়গায় এস্থার দুফলো বলেন, ‘‌গুজরাট, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু, অনেক রাজ্য সরকারের সঙ্গে আমরা কাজ করছি। সব ধরনের রাজনৈতিক মতবাদ তার মধ্যে আছে। কিন্তু কোনও রাজনৈতিক আদর্শের পক্ষে বা বিরুদ্ধে আমাদের কোনও লড়াই নেই। আমরা বরং বলি, আমাদের কাজটা কল মিস্ত্রির মতো (‌যারা পাইপ জুড়ে জুড়ে জল সরবরাহের ব্যবস্থা করে)‌। যদি কোনও সরকার গরিবদের জন্য কিছু করতে চায়, আমরা তার সম্ভাব্য সব দিক খতিয়ে দেখে একটা পদ্ধতি ঠিক করি এবং তার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু করি।’‌
নোবেল পাওয়ার পর ভারত সরকার কি এবার আপনাদের কথায় বেশি গুরুত্ব দেবে?‌ কী মনে হয়?‌ এই প্রশ্নে অত্যন্ত সততার সঙ্গে জবাব দিয়েছেন অভিজিৎ, যে কেন্দ্র সরকার, এবং বেশ কয়েকটি রাজ্য সরকারও ঠিক দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এখনও পর্যন্ত ওঁদের কাজ রাজ্য সরকারগুলোর সঙ্গেই বেশি। সেটাও রাজনৈতিক মত নির্বিশেষে। গুজরাটে কাজ করলে তঁারা বিজেপি সরকারের সঙ্গে কাজ করেন, পশ্চিমবঙ্গ হলে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে। এক্ষেত্রে তঁাদের যেমন কোনও ছুঁৎমার্গ নেই, তেমন সেই কাজই তঁারা বেছে নেন, যে কাজে আর্থ–সামাজিক চ্যালেঞ্জ বেশি। যে কাজটা জরুরি, অর্থপূর্ণ।‌

জনপ্রিয়

Back To Top