রাজীব চক্রবর্তী
দিল্লি, ২০ সেপ্টেম্বর

গণতন্ত্রের পীঠস্থানে ‘‌গণতন্ত্র হত্যা’‌র অভিযোগ! বিরোধীদের আপত্তি উড়িয়ে‌ রাজ্যসভাতেও ধ্বনিভোটে পাশ করিয়ে নেওয়া হল কৃষি সংক্রান্ত বিতর্কিত দুই বিল। বিল দুটিকে সিলেক্ট কমিটিতে পাঠাতে বিরোধীরা ভোটাভুটি চাইছিলেন। সম্মতি দিলেন না ডেপুটি চেয়ারম্যান। প্রতিবাদে তুমুল হট্টগোল, ভাঙল মাইক। ছেঁড়া হল সভার রুলস বুক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ায় নামল মার্শাল। ডেপুটি চেয়ারম্যান হরিবংশ নারায়ণ সিংয়ের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনল ১২টি বিরোধী দল। পুরো ঘটনায় সাসপেন্ড হতে পারেন বিরোধী শিবিরের ২০–‌‌২৫ জন সাংসদ।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, অতীতে এমন ঘটনা কখনও ঘটেনি। বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিল কোনওরকম স্ক্রুটিনি ছাড়াই ধ্বনিভোটে পাশ করানোর ঘটনা নজিরবিহীন। লোকসভার পর রাজ্যসভায় বিতর্কিত বিল দুটি পাশ হওয়ার ফলে এখন রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর হলেই বিলগুলি আইনে রূপান্তর হয়ে যাবে। কংগ্রেস, তৃণমূল–‌‌সহ ১২টি দলের বক্তব্য, ‘‌সংসদে গণতন্ত্র হত্যা করা হয়েছে। আর, হত্যা চাক্ষুষ করলে প্রতিবাদ তো হবেই। রবিবার ছিল দেশের জন্য কালো দিন।’‌ এদিন বিলের আলোচনায় বিরোধী শিবিরের কংগ্রেস, তৃণমূল, সপা, ডিএমকে, এনসিপি–‌‌র মতো দলগুলি তো বটেই, এমনকী বিজেপি–‌র ‘‌বন্ধু দল’‌ হিসেবে পরিচিত বিজেডি, টিআরএস এবং ওয়াইএসআর কংগ্রেস–‌‌ও বিরোধীদের সুরে সুর মিলিয়ে বিলগুলি যৌথ সংসদীয় সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর পক্ষে সওয়াল করেছে। তাদের বক্তব্য, ‘‌বিলের বিষয়বস্তু যাই হোক, দেশজুড়ে কৃষক অসন্তোষ অস্বীকার করা চলে না। গুরুত্বপূর্ণ বিল সব সময় স্ক্রুটিনি হওয়া প্রয়োজন।’‌ 
এদিন একসঙ্গে জোড়া বিল পেশ করেছিলেন কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র সিং তোমর। শুরু থেকেই বিল দুটিকে সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব এনেছিলেন তৃণমূল নেতা ডেরেক ও’‌ব্রায়েন এবং ডিএমকে–‌‌র তিরুচি শিবা। এরপর কৃষিমন্ত্রী বিল পাশের প্রস্তাব আনেন। বিরোধিতা করে সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর দাবিতে ভোটাভুটি চান সিপিএম সাংসদ কে রাগেশ, তৃণমূলের ডেরেক এবং ডিএমকে–‌‌র শিবা–‌‌সহ আরও কয়েকজন সাংসদ। অভিযোগ, ডেপুটি চেয়ারম্যান তাঁদের দাবিতে কর্ণপাত করেননি। এইসময় ওয়েলে নেমে যান তৃণমূলের দুই সাংসদ দোলা সেন ও অর্পিতা ঘোষ। তাঁদের দেখাদেখি ওয়েলে নামেন আপ সাংসদ সঞ্জয় সিং।

 

 তারপর একে একে অন্য বিরোধী সাংসদরাও ওয়েলে নেমে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। এরপরেও জোর করে বিল পাশ করানোর চেষ্টা করে সরকার পক্ষ। তখনই কয়েকজন সাংসদ ডেপুটি চেয়ারম্যানের সামনে এগিয়ে গিয়ে রুলস বুক তুলে ধরে ভোটাভুটি করানোর দাবি জানান। ডেপুটি চেয়ারম্যান তাতেও সম্মতি না দেওয়ায় রুলবুক ছিঁড়ে ফেলেন এক সাংসদ। আরও এক সাংসদ ডেপুটি চেয়ারম্যানের টেবিলের ওপর রাখা কয়েকটি মাইক টেনে হিঁচড়ে ভেঙে দেন। তুমুল হইচই শুরু হয়। নামানো হয় মার্শাল। আম আদমি পার্টির সাংসদদের বের করে দেন মার্শালরা। ধাক্কাধাক্কিতে পায়ে বেশ চোট পেয়েছেন ডেরেক। পুরো ঘটনা মোবাইলে ভিডিও রেকর্ড করে রাখেন কয়েকজন সাংসদ। এই সব তো বিধিবিরুদ্ধ?‌ জবাবে ডেরেক ও’‌ব্রায়েন বলেছেন, ‘‌নিয়ম অনুযায়ী, যে–‌কোনও একজন সাংসদ ডিভিশন অর্থাৎ ভোটাভুটি চাইলে তা করাতে হয়। এদিন একসঙ্গে অনেক সাংসদ ভোটাভুটি চেয়েছিলেন। তা শোনা হয়নি। গায়ের জোরে বিল পাশ করানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিল। এইভাবেই সংসদীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে।’‌ তাঁর কথায়, ‘‌হত্যা দেখলে যেমন চুপ করে বসে থাকা যায় না, এক্ষেত্রেও তা–‌‌ই প্রতিক্রিয়া হয়েছে।’‌ 
সরকারের পক্ষে ডেরেকের বিরুদ্ধে রুলবই ছেঁড়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে ডেরেকের চ্যালেঞ্জ, ‘‌আমার বাবা ৪৫ বছর ধরে একটি প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করেছেন। বই আমার কাছে ঈশ্বর। বই ছেঁড়ার ছবি দেখাতে পারলে সাংসদ পদ ছেড়ে দেব।’ এদিন দুপুর ২টোর পর বৈঠকে বসেন বিরোধী দলের নেতারা। একঘণ্টা বৈঠকের পর সংসদ ভবনে গান্ধীমূর্তির সামনে বিক্ষোভ দেখান তাঁরা। একইসঙ্গে সংবিধানের ৯০ ধারা অনুযায়ী, ডেপুটি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনেছে কংগ্রেস ও তৃণমূল–‌‌সহ মোট ১২টি দল।
উল্লেখ্য, সংসদের চলতি বর্ষাকালীন অধিবেশনে গত জুনে মন্ত্রিসভায় পাশ হওয়া ৩টি অধ্যাদেশ বিল আকারে এনেছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। যা নিয়ে কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পাঞ্জাব, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশে পথে নেমেছেন কয়েক লক্ষ কৃষক। বিলগুলি হল, ১) কৃষিপণ্যের বাণিজ্য সংক্রান্ত বিল, ২) কৃষি পরিষেবা ও কৃষিপণ্যের মূল্যের নিশ্চয়তা সংক্রান্ত বিল এবং ৩) অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন সংশোধন বিল। তৃতীয় বিলটি লোকসভায় পাশ হলেও রাজ্যসভায় এখনও আসেনি। মনে করা হচ্ছে, দু–‌‌একদিনের মধ্যে এই বিলটিও পেশ হতে চলেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য, কৃষকের স্বার্থ রক্ষা এবং কৃষকের মুনাফা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই বিলগুলি আনা হয়েছে। এতে কৃষকের জীবনে আমূল পরিবর্তন আসবে। যদিও ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের নিশ্চয়তা, কৃষিপণ্যে বেসরকারি সংস্থা ও শিল্পপতিদের যথেচ্ছ প্রবেশ, মান্ডি ব্যবস্থার বিলোপ এবং অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকা থেকে খাদ্যশস্য, ডাল, তেল, আলুকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগে সিঁদুরে মেঘ দেখছে কৃষক ও বিরোধী শিবির। 
এমনিতে এই মুহূর্তে সংখ্যার হিসেবে রাজ্যসভায় এনডিএ বিরোধী শিবিরের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। এরমধ্যে পাঞ্জাবে তুমুল কৃষক বিদ্রোহের জেরে কৃষি বিলের বিরোধিতা করে মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে গিয়েছেন শিরোমণি অকালি দলের নেত্রী হরসিমরত কউর বাদল। লোকসভার মতো রাজ্যসভাতেও বিলের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছে অকালি দল। তার পরও মনে করা হচ্ছিল, বিজেপি–‌‌র ‘‌বন্ধুদল’ ওড়িশার বিজেডি, অন্ধ্রপ্রদেশের ওয়াইএসআর কংগ্রেস এবং তেলেঙ্গানার টিআরএস‌–‌‌এর সমর্থনে ভোটাভুটিতে জিতে যাবে এনডিএ। শাসক দলের নেতা–‌মন্ত্রীরাও সম্ভবত তেমন আশা করেছিলেন। কিন্তু, এদিন রাজ্যসভায় নবীন পট্টনায়েক, জগন্মোহন রেড্ডি এবং কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের দল সরাসরি বিলের বিরোধিতা না করলেও বিলগুলিকে সিলেক্ট কমিটিতে স্ক্রুটিনির জন্য পাঠানোর পক্ষে সওয়াল করেছে। স্বাভাবিক ভাবেই শক্তিবৃদ্ধি হয় বিরোধী শিবিরের। যার ফলে ভোটাভুটিতে সরকারের মুখ পুড়তে পারে, সম্ভবত এমন আশঙ্কা থেকেই সে পথ এড়িয়ে ধ্বনিভোটের রাস্তা নেওয়া হয়।‌‌‌‌
বিল পাশের পর তাকে ‘‌ঐতিহাসিক’‌ আখ্যা দিয়ে টুইট করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। লিখেছেন, ‘‌আজ ভারতের কৃষিক্ষেত্রের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এই বিল সরকারের এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এতে কৃষকের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে।’‌ রাতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, পীযূষ গোয়েল, প্রহ্লাদ যোশী, থাওরচন্দ গেহলট-‌সহ মোদি সরকারের ছ’‌জন মন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলন করে উল্টে বিরোধীদের গায়েই ‘‌কৃষক-‌বিরোধী’‌ তকমা সেঁটে দিয়েছেন। রাজনাথ বলেছেন, ‘‌রাজ্যসভায় যা ঘটেছে তা দুঃখজনক, তার চেয়েও বেশি লজ্জাজনক। ডেপুটি চেয়ারম্যানের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে তাতে সকলের মাথা হেট হয়েছে।’‌ তাঁর কথায়, ‘‌এই দুটি বিল পাশ হওয়ায় কৃষকের আয় অনেক বাড়বে। সারা দেশে তাঁরা ফসল বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু, কৃষককে ভুল বোঝানো হচ্ছে। এমএসপি এবং এপিএমসি আগের মতোই থাকছে। কৃষকের আয় দ্বিগুন করার লক্ষ্যে এগোচ্ছে মোদি সরকার।’‌

জনপ্রিয়

Back To Top