আজকালের প্রতিবেদন
দিল্লি, ১৮ সেপ্টেম্বর

করোনাকালে দেশের কত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী করোনা আক্রান্ত হয়েছেন, কত জনের মৃত্যু হয়েছে, সেই তথ্য সরকারের কাছে না থাকা নিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকারকে তোপ দেগেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন শেয়ার করে রাহুল গান্ধী টুইটে মোদি সরকারকে আক্রমণ করেছেন। বলেছেন, ‘‌প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তথ্যহীন মোদি সরকার!‌ থালা বাজানো, দীপ জ্বালানোর চেয়েও বেশি জরুরি চিকিৎসক ও‌ স্বাস্থ্যকর্মীদের সুর‌ক্ষা ও সম্মান।’‌ রাহুলের প্রশ্ন, করোনা যোদ্ধাদের এতবড় অপমান কেন?‌ ‌‌
ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের তালিকা অনুযায়ী, ৩৮২ জন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু হয়েছে করোনা রোগে। এদিকে বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায় তৃণমূল সাংসদ তথা ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (‌আইএমএ)‌ সভাপতি শান্তনু সেন দাবি জানান যাতে বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদেরও স্বাস্থ্য বিমার আওতায় নিয়ে আসে কেন্দ্রীয় সরকার।  তিনি বলেছেন, করোনা–‌যুদ্ধে স্বাস্থ্যকর্মীরাই সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন। কোভিডে বেসরকারি চিকিৎসকদের মৃত্যুহার ১৮ শতাংশের বেশি। অতএব স্বাস্থ্য বিমায় ভেদাভেদ বন্ধ করুক সরকার। 
শান্তনু সেন বলেন, ‘‌আইএমএ দাবি জানিয়েছে, করোনার শিকার হয়ে দেশে যে–‌চিকিৎসকদের মৃত্যু হয়েছে, তঁাদের পরিবারের কমপক্ষে একজনকে চাকরি দেওয়ার বন্দোবস্ত করুক সরকার।’‌ সেই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘‌পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে করোনায় মৃত মোট ৫৭৩ জন স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে মাত্র ১৯৩ জন বিমার সুবিধে পেয়েছেন। বিমা–‌পদ্ধতির সরলীকরণ করা হোক।’‌
করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুকরণীয় ভূমিকা তুলে ধরেন তৃণমূল সাংসদ। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গই একমাত্র রাজ্য, যেখানে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্বাস্থ্য–পরিষেবা দেওয়া হয়। রাজ্যে উপসর্গহীন করোনা–রোগীদের জন্য ২০০–‌‌র বেশি ‘‌সেফ হোম’‌ তৈরি করা হয়েছে। সেখানে ১১,৫০৭টি বেডে এমন করোনা–‌রোগীদের রাখা হচ্ছে, যঁাদের নিজেদের বাড়িতে নিভৃতবাসে থাকার উপায় নেই। সাংসদ বলেন, এ ছাড়াও রাজ্য কোভিড প্রোটোকল মনিটরিং পদ্ধতির মাধ্যমে কোভিড হাসপাতাল ও কোয়ারেন্টিন কেন্দ্রগুলির ওপর ২৪ ঘণ্টা নজর রাখা হচ্ছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সম্প্রতি কোভিড–‌রোগী ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতির সূচনা করেছেন, যার মাধ্যমে রোগীর আত্মীয়েরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর অবস্থা জানতে পারছেন। কোনও রোগীর অবস্থা খারাপ হলে, র‌্যাপিড রেসপন্স টিমকে তক্ষুনি খবর দেওয়া হচ্ছে। এর ফলেই বাংলায় করোনায় মৃত্যুহার ক্রমশ কমছে।‌‌
ওদিকে, আইএমএ একটি তালিকা প্রকাশ করে বলেছে, ৩৮২ জন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু হয়েছে করোনায়। মৃতদের শহিদের মর্যাদা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি করেছে দেশের চিকিৎসক সংগঠনটি। বুধবার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য–‌রাষ্ট্রমন্ত্রী অশ্বিনীকুমার চৌবে সংসদে জানিয়েছিলেন, দেশে কতজন করোনা–‌যোদ্ধার মৃত্যু হয়েছে, সেই সংক্রান্ত কোনও তথ্য মন্ত্রকের কাছে নেই। যুক্তি খাড়া করা হয়, হাসপাতালগুলি রাজ্য সরকারের অধীন। বিরোধীদের অভিযোগ, ঘরমুখো পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু কিংবা করোনা মোকাবিলায় একেবারে প্রথম সারিতে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীদের মৃত্যুর তথ্য না রাখা নরেন্দ্র মোদি সরকারের চূড়ান্ত উদাসীনতার পরিচয়।‌ 
বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ‌‌আইএমএ‌–ও। আইএমএ–‌র তরফে বলা হয়েছে, ভারতের মতো অন্য কোনও দেশে এত সংখ্যক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু হয়নি। করোনায় মৃত চিকিত্‍‌সকদের পরিবারগুলির কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে অন্তত সান্ত্বনা ও সমবেদনা প্রাপ্য। করোনা অতিমারীতে দেশে কতজন চিকিত্‍‌সক–‌স্বাস্থ্যকর্মী এখনও অবধি আক্রান্ত হলেন বা তঁাদের জীবন উত্‍‌সর্গ করলেন, সরকার যদি এই পরিসংখ্যান রাখতে না পারে, তা হলে সরকার মহামারী আইন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন পরিচালনার নৈতিক কর্তৃত্ব হারাবে।
চিকিৎসক সংগঠনটির তরফে এক বিবৃতিতে চিকিত্‍‌সক ছাড়াও কতজন নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী করোনা–‌সংক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন, তঁাদের নামের একটি তালিকা সরকারি ভাবে প্রকাশ করার আবেদনও জানানো হয়েছে। আইএমএ–র এক আধিকারিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দেশে অন্তত ২,২৩৮ জন চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ৩৮২ জন।  
বাদল অধিবেশন শুরুর দিনে পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুর তথ্য নিয়ে মোদি সরকারের শ্রমমন্ত্রী সন্তোষকুমার গঙ্গোয়ার জানিয়েছিলেন,‌ কতজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, সে–‌তথ্য সরকারের কাছে নেই। কাজেই কোনও ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও প্রশ্ন নেই। তার পর দেখা গেল, করোনা চিকিৎসকদের মৃত্যু ও ক্ষতিপূরণের তথ্যও নেই কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের কাছে। চিকিৎসক মহলের অভিযোগ, স্বাস্থ্যকর্মীদের সরকার ‘করোনা–‌যোদ্ধা’ বলে উল্লেখ করছে, অথচ তঁাদের করোনায় মৃত্যু হলে তঁাদের পরিবারের প্রতি সরকার কোনও দায়িত্ব পালন করছে না। 

জনপ্রিয়

Back To Top