ছোটবেলায় এক নেতার অতিকায় কপ্টার নামতে দেখে জন্ম নেওয়া স্বপ্নকে বাস্তব করলেন নৌসেনার প্রথম মহিলা বিমানচালক শিবাঙ্গী স্বরূপ। লিখলেন দেবারতি দাশগুপ্ত

বিহারের মফস্বল শহর মজফ্‌ফরপুর। মোটের ওপর নিস্তরঙ্গ, সাদামাঠা জীবন। সেই নিস্তরঙ্গ জীবনে একদিন ঢেউ লেগেছিল শহরের বড় ময়দানে। কানে তালা লাগানো শব্দ করে, একরাশ ধুলো উড়িয়ে নেমেছিল এক কপ্টার। 
কপ্টারে মন্ত্রী। তিনি এসেছেন জনসভা করতে। তাঁকে দেখতে ভিড়ে ঠাসা সেই ময়দানে ছিল এক একরত্তি মেয়ে। বড় বড় চোখ করে দেখেছিল সেই কপ্টার। আর তার চালককে। এমনও হয়!‌ মানুষে এতবড় কপ্টার চড়ে আকাশে চক্কর কাটতে পারে!‌ ঘোরলাগা চোখে ঘরে ফিরে মেয়ের আর মুখে কথা সরে না। সে বছর ১৪ আগের কথা। মেয়েটি তখন মাত্রই ১০। 
সেই মেয়েই এখন ভারতীয় নৌসেনার প্রথম মহিলা বিমানচালক। সাব লেফটেন্যান্ট শিবাঙ্গী স্বরূপ। বাবা স্থানীয় সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। মা গৃহবধূ। তাঁদের একমাত্র মেয়ে গড়পড়তা কোনও পেশা বেছে নেবে জীবনে, সেটাই যেন নিশ্চিত এবং প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু ওই ছোটবেলায় দেখা চোখধাঁধানো কপ্টারের অবতরণ সব হিসেব উল্টেপাল্টে দিল। যে ছিল শৈশবের রূপকথাসম স্বপ্ন, কৈশোরের জেদ, তরুণী বয়সে সেটাই হয়ে দাঁড়াল ধ্যানজ্ঞান। 
কিন্তু উড়ব বললেই তো ওড়া যায় না। এই পথ ভিন্ন। তাই ওঠাপড়া অনেক। স্বাভাবিকভাবেই একবারে সাফল্য আসেনি। ডিএভি স্কুল এবং সিকিম মণিপাল ইনস্টিটিউটে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে শর্ট সার্ভিস কমিশন (‌এসএসসি)‌ পরীক্ষায় বসতে হয়েছে দু’‌বার। প্রথমবার উত্তীর্ণ হলেও স্রেফ শূন্য পদের অভাবে আকাশ দাপিয়ে বেড়ানোর সুযোগ মেলেনি। অগত্যা আবার। এবার আর ফিরে তাকাতে হয়নি। তালিকায় উঁচুর দিকে নাম থাকায় শিবাঙ্গীর পরের গন্তব্য ডান্ডিগালের বায়ুসেনা আকাদেমি। 
সে এক অন্য জগৎ। পেল্লাই সব বিমান। ধূসর উর্দির ঝকঝকে সব বায়ুসেনার বিমানচালক। এতদিনে মনে হল স্বপ্ন সত্যি হতে আর কয়েকটা ধাপ মাত্র। ঠিকঠাক বলতে গেলে তিনটি ধাপ। বায়ুসেনায় কেটে গেল তিনমাস। প্রথমে বিমান চালানোয় হাতেখড়ি। ওই তিনমাসের অক্লান্ত প্রশিক্ষণ শেষে ‘পিলাটেস’ (‌পিসি সেভেন)‌ বিমান চালানোর ছাড়পত্র পান শিবাঙ্গী। পরের প্রশিক্ষণ শুরু কোচির ডর্নিয়ার ট্রেনিং স্কোয়াডে। এবার ছ’‌মাস। ১০০ ঘণ্টা উড়ানের লক্ষ্যমাত্রা পুরো করে শিবাঙ্গী এখন নৌসেনার সাব লেফটেন্যান্ট। উড়িয়েছেন পিলাটেস পিসি সেভেন এবং ডর্নিয়ার। গত ৩ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নৌসেনায় যোগ দিয়েছেন শিবাঙ্গী। তার ক’‌দিন আগেই ঘটে গেছে হায়দরাবাদের পশু চিকিৎসককে গণধর্ষণ ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা। আর শিবাঙ্গীর কৃতিত্বের ক’‌দিন পর, ঠিকঠাক বলতে গেলে ৬ ডিসেম্বর উন্নাওয়ের এক ধর্ষিতাকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। দু’‌টি মর্মান্তিক ঘটনাক্রমে কোথাও যেন চাপা পড়ে গিয়েছেন সাব লেফটেন্যান্ট শিবাঙ্গী স্বরূপ। ‘‌বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’‌–‌এর সরকারি ঢক্কানিনাদ সত্ত্বেও এদেশে মেয়েদের পড়ে পড়ে মার খাওয়া আর খুন হওয়াটাই অলিখিত দস্তুর!‌ তবু তার পাশে শিবাঙ্গীরাও ওড়েন। শিবাঙ্গীদের দমিয়ে রাখা যায় না। 
কোচিই হল নৌসেনার সাব লেফটেন্যান্ট শিবাঙ্গীর প্রথম কর্মস্থল। আইএনএস গড়ুরের অংশ হিন্দুস্থান এরোনটিক্যাল্‌সের তৈরি ডর্নিয়ার ২২৮ স্কোয়াড্রনের নজরদারি বিমান চালাবেন তিনি। নৌ অভিযানে পাড়ি দেওয়া এই বিমানে অত্যাধুনিক নজরদার রেডার, ইলেকট্রনিক সেন্সর এবং উন্নতমানের নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা আছে। পরীক্ষিত দক্ষতায় যা সামলাবেন শিবাঙ্গী।  
নৌসেনায় বৈমানিকের ভূমিকা অনেকেরই অজানা। নৌসেনার জাহাজের সমান্তরালে তাঁরা আকাশপথে বিমান নিয়ে টহল দেন। নৌসেনায় সাব লেফটেন্যান্ট পদে এতদিন কোনও মহিলা ছিলেন না। তাঁদের বিমানের ককপিটেও দেখা যায়নি। শিবাঙ্গীই প্রথম। 
তবে বায়ুসেনায় ইদানীং অনেক মহিলা বিমানচালক এসেছেন। ২০১৬–‌এ বায়ুসেনার প্রথম মহিলা বিমানচালক হয়ে দৃষ্টান্ত গড়েছিলেন ভাবনা কান্ত। মিগ বিমান চালিয়েছিলেন তিনি। তাঁর কিছু পরেই ওই বছরে বায়ুসেনার বিমানচালক হিসেবে যোগ দেন অবনী চতু্র্বেদী। গতবছর সেই একই পেশায় এসেছেন মোহনা সিং। তাঁরা সকলে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট। এ বছর আগস্টেই বায়ুসেনার প্রথম উইং কমান্ডার হয়েছেন এস ধামি। 
কিন্তু শিবাঙ্গী শিবাঙ্গীই। নৌসেনার প্রথম মহিলা বিমানচালক। যঁাকে দেখে আরও অনেক মহিলা উৎসাহিত হবেন নৌসেনার বিমানচালকের পেশায় যোগ দিতে। শিবাঙ্গী নিজেও আশাবাদী। বলেছেন, ‘‌একদিন হয়তো মেয়েরা যুদ্ধবিমানও চালাবেন। আমি যদি পারি, সকলে পারবেন।’‌ যদিও এই কাজে নারী–‌পুরুষের ভেদাভেদ নেই। অন্তত শিবাঙ্গী তেমনকিছুর সম্মুখীন হননি। নৌসেনায় লিঙ্গ নয়। কর্মক্ষমতাই শেষ কথা বলে। সেই প্রত্যয়ে ভর করে নতুন সাব লেফটেন্যান্ট বলেছেন, ‘‌প্রশিক্ষণের শুরুতেই বলে দেওয়া হয়েছিল, মহিলা না পুরুষ— ককপিটে কে, সেটা কিন্তু বিমান জানে না। সে শুধু চেনে দক্ষ চালককে।’‌ 
তবু এত পেশা থাকতে বিমানচালকের পেশাই কেন?‌ শুধুই কি মেয়েবেলার স্বপ্নযাপন?‌ প্রথমদিকেই তা হলেও এখন শিবাঙ্গী বলছেন, ‘নৌসেনায় এসে নতুন নতুন দিগন্ত খুলে গেছে। ‌এর অপেক্ষাতেই তো ছিলাম। দীর্ঘ অপেক্ষা। অপেক্ষার এই যাত্রাপথে অনেক শিখেছি। শেষমেশ সত্যিই নৌসেনার উর্দি পরে ডর্নিয়ারের ককপিটে চড়ে দারুণ লাগছে। গর্ব হচ্ছে। এখানে ওড়াই জীবন। উড়ানেই প্রতিদিনের উদ্‌যাপন। এর চেয়ে ভাল আর কোনও কাজ হতে পারে কি?‌’‌ 
শিবাঙ্গী স্বরূপ। অর্ধেক নন। পুরো আকাশ।

জনপ্রিয়

Back To Top