উৎসা সারমিন: ভারত জুড়ে স্বাধীনতা দিবসের প্রস্তুতি। আর কাশ্মীর রুদ্ধ। তা এ আর নতুনই–‌বা কী?‌ ১৫ আগস্টে তো ফি বছরই লাগাম পরাতে হয় উপত্যকাকে। নিজের চোখেই সেটা দেখতে হয়েছে শ্রীনগরে কাজ করার সময়।
কাশ্মীরে বিধিনিষেধের বেড়ি আগেও দেখেছি। কিন্তু স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে যে কড়াকড়ি, সেটা দেখেছিলাম সেবারই প্রথম। এ–‌ও একটা অভিজ্ঞতা বটে। ১৪ আগস্টের সন্ধে থেকেই দেখলাম অস্বস্তিতে ভারী হয়ে উঠেছে হাওয়া। সাত তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে যাচ্ছে লোকজন। ঝাঁপ পড়ছে দোকানে। রাস্তায় ভারী বুটের টহল বেড়ে গেছে। নানা রাস্তায় কাঁটা তার। আমি থাকতাম তখন হরি সিং স্ট্রিটে। খুবই ব্যস্ত এলাকা। লাকজনের ভিড়, বেচাকেনা, পাবলিক বাসের আসা–‌যাওয়া— লেগেই থাকত দিনভর। আমার তো সকালে ঘুমই ভাঙতো বাস কন্ডাক্টরদের হাঁকাহাঁকিতে। ১৫ আগস্টের সকালে ঘুম ভাঙল এক হিম–‌হিম নিস্তব্ধতায়। রাস্তায় একটি লোকও নেই। একটি দোকানও খোলা নেই। হাত বাড়ালাম ফোনে। নেটওয়ার্ক নেই। আসলে প্রতিদিনই মাকে ফোন করতাম। জানান দিতে, বেঁচে আছি। আমি বুঝতে পারছিলাম, ওরা চিন্তায় পড়ে যাবে এবার। কিন্তু আমার হাত–‌পা বাঁধা। অবস্থাটা আরও বিরক্তিকর হয়ে উঠল মাথাটা ধরে যাওয়ায়। কিন্তু কোথায় যাব ওষুধ খুঁজতে?‌ লাভ নেই বেরিয়ে। ওষুধের দোকানও নিশ্চয়ই বন্ধ।   
বেলা গড়াল। একসময় ফিরে এল নেটওয়ার্ক। খবর এল, শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে স্বাধীনতা দিবসের সরকারি অনুষ্ঠান। শ্রীনগরের কেন্দ্রীয় এলাকায় সামান্য কিছু সঙ্ঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আশপাশের মানুষ দেখলাম স্বস্তির শ্বাস ফেলছেন। যাক, বড় কিছু ঘটেনি!‌ আবার ফেরা যাবে ‘‌স্বাভাবিক’‌‌ জীবনে।
ছোটবেলা থেকে ১৫ আগস্ট পালন করতে শিখে এসেছি। পালন করেছি একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে। কাশ্মীরি খুদেগুলো শিখছে, ১৫ আগস্টে ঘরে লুকিয়ে থাকতে হয়, বাইরে গেলে বিপদ। স্বাধীন হওয়ার গর্ব শেখার জো নেই তাদের। বরং শ্বাস চেপে অপেক্ষায় থাকতে হয়, দিনটা কখন ফুরোবে!‌   
আমারও সেদিন ওই দশা। বাধ্যত গৃহবন্দি। ভাবছিলাম, কখন বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারব। স্বাধীনতা দিবসে বন্দি হয়ে থাকার পরিহাস সেদিন মর্মে মর্মে বুঝেছি।‌‌

শ্রীনগর শুনশান। বুধবার। ছবি: পিটিআই

জনপ্রিয়

Back To Top