সব্যসাচী সরকার:‌ ভোর চারটে থেকে রাত দশটা, শুধু কাজ। সপ্তাহে পাঁচদিন একটাই রুটিন বেঙ্গালুরুর। সপ্তাহ শেষে দুটো ছুটির দিনে মজা, আনন্দ, ছুটি কাটানো। ভোট নিয়ে ভাবার সময় কোথায় ভারতের বৃহত্তম আইটি হাবের। নেই, সত্যি সময় নেই। লোকে বলছে, ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচন ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে উত্তেজক, যাকে বলে ‘‌নেইল বাইটিং’‌ হতে চলেছে। তবুও বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, বেঙ্গালুরুর যেন সময় নেই এসব নিয়ে ভাবার। সত্যি কী তাই?
কর্নাটকের ২৮টি আসনে এবারে দু’‌দফায় নির্বাচন হবে। ১৮ এপ্রিল ও ২৩ এপ্রিল। তারপর পাক্কা একমাসের অপেক্ষা। ফল ২৩ মে। ভৌগলিক ভাবে কর্নাটক বিভক্ত দুটি অংশে। উত্তর ও দক্ষিণ। সমান সমান ১৪টি করে লোকসভা আসন। ভোটের লড়াইয়ে একদিকে রয়েছে জেডিএস ও কংগ্রেস জোট অন্যদিকে রয়েছে বিজেপি। বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে কর্নাটকে যে নাটক হয়েছিল, তা দেখে একথা স্পষ্ট বলা চলে এটিই দক্ষিণাংশের একমাত্র রাজ্য যেখানে বিজেপি এককভাবে বেশ কয়েকটি আসন জেতার স্বপ্ন দেখতে পারে। কিন্তু সেখানে যে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়ার দল আর কংগ্রেস জোট বেঁধে লড়ছে!‌ না, নীচুতলার কর্মীদের মধ্যে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে ফিসফাস, দু’‌দলের এই সমঝোতাকে খুব ভাল নজরে দেখছেন না তাঁরা। 
রাজ্যে জেডিএস শক্তিশালী, দীর্ঘদিন লড়াই করে উঠে আসা একটি দল। সে তুলনায় বুথ ভিত্তিক সংগঠন কংগ্রেসের নেই, থাকলেও তা দুর্বল। ফলে ভোট মেশিনারি পরিচালনা করতে তাঁদের জেডিএসের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আর উপরমহলের সেই আঁতাতেই ক্ষোভ তৈরি হয়েছে নীচুতলার জেডিএস কর্মীদের মধ্যে। আগুনে ঘি দিচ্ছে বিজেপিও। কুচুটে ননদের মতো জেডিএস কর্মীদের শুনিয়ে শুনিয়ে বলছে, এতদিনের লড়াই ছেড়ে যেই জনতা দল সেক্যুলার কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধেছে, ওমনি লড়াইটা কংগ্রেস বনাম বিজেপি হয়ে গিয়েছে, দেবগৌড়ার উপস্থিতি এখানে নগন্য এবং আঞ্চলিক।’‌ তাতে ভিতরে ভিতরে আরও রেগে যাচ্ছেন জেডিএস কর্মীরা। সেই রাগের প্রভাব ইভিএমে পরবে না, সে কথা তো কেউ বলতে পারে না। 
গেরুয়া শিবিরের কাছে আছে আরও ইস্যু। কংগ্রেসকে যে পরিবারতন্ত্র নিয়ে সবসময় খোঁচা দিয়ে এসেছেন মোদি, মোদি অমিত শাহরা, জেডিএসের বিরুদ্ধেও এবার সেই ইস্যু সামনে এসেছে। কারণ, পরিচিত হসন কেন্দ্র এবার নাতি প্রোজ্জ্বল রেভান্নার জন্য ছেড়ে দিয়েছেন দেবগৌড়া। তাঁর আরেক নাতি নিখিল গৌড়া লড়ছেন মাণ্ডিয়া থেকে, দেবগৌড়া নিজে দাঁড়িয়েছেন তুমকুর (‌কন্নড় ভাষায় তুমাকুরু)‌ থেকে। ওদিকে কুমারস্বামী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তো কাজ করছেনই। সব মিলিয়ে জেডিএসের বিরুদ্ধেও পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ তুলছে বিজেপি। 
এই তিনটি কেন্দ্রের দিকেই নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের। এর মধ্যে দেবগৌড়ার দুই নাতির লড়াইটা কিন্তু সহজ নয়। কারণ, একদিকে নিখিল গৌড়ার বিরুদ্ধে নির্দল প্রার্থী হিসাবে দাঁড়িয়েছেন জনপ্রিয় অভিনেতা অম্বরীশের স্ত্রী সুমালতা। জনপ্রিয় প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছে বিজেপি। এমনকি জেডিএসের নীচুতলার কর্মী, যাঁরা নেতৃত্বের নানা কাণ্ডকারখানায় খুশি নন, তাঁরাও সুমালতাকে জেতানোর আহ্ববান জানাচ্ছেন। এমন কাণ্ড কিন্তু কর্নাটকে এর আগে দেখা যায়নি। অন্যদিকে, প্রোজ্জ্বল রেভান্নার বিরুদ্ধে বিজেপির প্রার্থী জেডিএস ছেড়ে সদ্য গেরুয়া শিবিরে নাম লেখানো এ মঞ্জু। হসনে তাঁকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। সব মিলিয়ে, জেডিএসের বিরুদ্ধে বেশ হিসেব কষে, একের পর ঘুটি সাজিয়েছে ইয়েদুরাপ্পার দল।   
আর কংগ্রেস?‌ যেভাবে বিধানসভা নির্বাচনের সময় কিং মেকার হয়েছিলেন কংগ্রেসের বিধায়ক, রাজ্যের মন্ত্রী ও কর্নাটকের অন্যতম বিত্তশালী ব্যবসায়ী ডি কে শিবকুমার, এবারের নির্বাচনেও তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে দল। তাঁর ভাই গতবারের মতো এবারেও বেঙ্গালুরু রুরাল কেন্দ্র থেকে কংগ্রেসের টিকিটে লড়াই করছেন। শিবকুমারকে নিজে না লড়লেও  শিমোগা ও বেঙ্গালুরু রুরাল কেন্দ্রের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। আছেন আরও একজন, গোটা দেশে যাঁকে মোদি বিরোধী মুখ হিসেবে সবাই চেনে। দক্ষিণের জনপ্রিয় অভিনেতা প্রকাশ রাজ। তিনি লড়ছেন বেঙ্গালুরু সেন্ট্রাল থেকে। কংগ্রেস থাকে পরোক্ষে সমর্থন করেছে, সমর্থন করেছে সিপিএম। তবে তিনি লড়ছেন নির্দল প্রার্থী হিসেবে। ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান প্রকাশ মনে করছেন, সংখ্যালঘু ভোট আর মোদি বিরোধী ভোট একজায়গায় করতে পারলে নির্বাচনে অঘটন তিনি ঘটাতে পারবেন। 
কিন্তু বিষয়টা কতটা বাস্তবায়িত হতে পারে, তা নিয়ে একটা সংশয় থেকেই যাচ্ছে। কারণ, এর মাঝেই আছে বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভোটের লড়াই। সংখ্যালঘু ভোট বাদ দিয়ে আছে দুটি প্রধান সম্প্রদায়। একদিকে লিঙ্গায়েত, অন্যদিকে ভোক্কালিকা। ভোক্কালিকারা চিরকালই এই রাজ্যে শক্তিশালী। ভোক্কালিকাদের মধ্যে রয়েছে গৌড়ারা। তাঁদের ভোট নির্ধারক হতে পারে। নির্ধারক হতে পারে লিঙ্গায়েতদের ভোটও। এই দুই শিবিরের মাঝে উঠে আসছে বাল্মীকি সম্প্রদায়ের নাম। তাঁরাও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে লড়াই করতে চাইছেন। তিন সম্প্রদায় ঠিক কাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াবেন, সেটাও দেখতে হবে। 
কর্নাটকে এবারের নির্বাচনে তারকা প্রার্থীদের প্রসঙ্গ আগেও এসেছে। ত‌বে, আছেন আরও কয়েকজন। লড়ছেন মল্লিকার্জুন খাড়গে, অনন্তকুমার হেগড়ে, প্রমোদ মাধবরাজের মতো প্রার্থীরা। তাঁদের ভাগ্য নির্বাচন হবে দু দফার নির্বাচনে।
কিন্তু অঙ্কে হিসাবের বাইরেও থাকে আরেকটা হিসাব, ঠিক কী কী ইস্যুতে এখানে ভোট দেবেন সাধারণ মানুষ। কর্মঠ বেঙ্গালুরুর মনে পাকিস্তান, হিন্দুত্ব, রাম মন্দির বিশেষ দাগ কাটতে পারবে বলে মনে হয় না। উন্নয়ন, জলের সমস্যা আর স্থানীয় বেশ কিছু ইস্যু এখানে প্রধান। কিন্তু যে ঘটনার জন্য বেঙ্গালুরুর রাজরাজেশ্বরী নগর হঠাৎ একদিন খবরের শিরোনামে এসেছিল, সেই গৌরী লঙ্কেশ হত্যা?‌ যার সঙ্গে সরাসরি আরএসএস যোগের দাবি করেছিলেন কেউ কেউ, সেই বিষয়ের কী হবে?‌ সাধারণের মধ্যে এই নিয়ে বিশেষ তোলপাড় এখন আর দেখা যাচ্ছে না। এমনকী গিরিশ কারনাড, বা টি এম কৃষ্ণার মতো শিল্পীরা যেভাবে এই ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন, নির্বাচনের সময় সেই প্রতিবাদের প্রভাব সরাসরি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। এটাই হয়ত এই শহরের রীতি। কোনও অনাচার দেখলে এখানে রাজনৈতিক মঞ্চের বাইরেও হাজার হাজার লোক জড়ো হয়ে যান, কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে তাঁদের কণ্ঠ সোচ্চার হতে দেখা যায় না। 
তাহলে প্রচার?‌ দেওয়াল লিখন, পোস্টার, ব্যানার, মিছিল, এসব তো থাকবে?‌ তাও নেই। ওই যে, প্রথমেই বলেছিলাম, এখানে সবাই ব্যস্ত। চায়ের কাপে তুফান তোলা বাঙালি এখানে এলে তাই হতাশই হবেন। কারণ, শহরের হৃদযন্ত্রের মধ্যে লুকিয়ে আছে আঁতের কথা। সেই কথা গোপন, সবাইকে ফলাও করে দেখানো এ শহরের অভ্যাস নয়। তাই প্রযুক্তির ভরসায় হোয়্যাটস আর ফেসবুকেই চলছে প্রচার। কারণ গোটা শহরটাই অ্যাপ নির্ভর। টিকিট,খাবার,রাস্তা চেনা,দোকান চেনা সব।
 তাই নিঃশব্দেই চলছে সব কিছু। বিপ্লবের তাড়নায় নাকি স্বভাবে, স্বাভাবিকতায়, উত্তর পাওয়া যাবে মে মাসের ঐতিহাসিক বৃহস্পতিবারে। 

জনপ্রিয়

Back To Top