পিটিআই, দিল্লি, ২৩ মে- ‌‌‌ইলেক্টোরাল সুপারম্যান!‌ লোকসভা নির্বাচনে ৩০০‌ আসন পেয়ে এই শিরোপাটি জুটিয়ে ফেলেছেন নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি। যেভাবে রাজনীতির ময়দানে সিলমোহর রেখে গেলেন, তা মানুষের মনে থেকে যাবে বহু দিন।
নেহাতই সঙ্ঘের এক প্রচারক হিসেবে রাজনীতির আঙিনায় পদার্পণ। সেই থেকে দেশের নির্বাচনী যুদ্ধের অবিসংবাদী সম্রাট। ৫৪২টি লোকসভা আসনের ৩০০টি প্রাপ্তি। প্রাপ্তি আরও একটি। কংগ্রেস ছাড়া কোনও দল একটা মেয়াদ পুরো করে আবার দেশ শাসনের ভার পায়নি। তা‌ও করে দেখালেন। 
বিরোধীরা তঁাকে বিভাজনের রাজনীতি করায় দোষ দেন। সেটিই ‘‌হিন্দু ভারতের’‌ মন পেতে তুরুপের তাস হয়ে দঁাড়াল। গুজরাটের মেহসানা জেলার ছোট শহর ভাডনগরের ভূমিপুত্র হয়ে উঠলেন হিন্দুত্ববাদীদের পোস্টার–‌‌বয়। উগ্র জাতীয়তাবাদ, সংখ্যাগুরু হওয়ার অহমিকা এবং ক্যারিশমাকে মূলধন করে বিজেপি–‌র মহাসাফল্যের কারিগর তিনি।
চা–‌ওয়ালা ছিলেন এক সময়ে। বার বার তার প্রচার করে, প্রায় জনশ্রুতিতে পরিণত করেছেন। রাজনীতির ইতিহাসে নিজের জায়গা এমন পোক্ত করবেন, তা হয়তো নিজেই অঁাচ করেননি। এক দিকে অদম্য সাহস, ছুঁতমার্গহীন মানসিকতা, প্রযুক্তির অহরহ ব্যবহার। অন্য দিকে জোরালো জাতীয়তাবাদ, হিন্দুত্ব। এই দুইয়ের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে ‘‌গুরুত্বহীন’‌ মোদি। গুরুত্বহীন এই কারণে যে বাজপেয়ী তাঁকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় নেননি। তবে কোন্দলে কাহিল গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী করে পাঠিয়েছিলেন। 
তঁার উন্নয়নে তেমন গতি নেই, এই সমালোচনা যেমন আছে, তেমনই রাজনৈতিক রণনীতির জন্য প্রশংসাও তঁার প্রাপ্য। তাই সরকারের প্রতি জনগণের অসন্তোষ সত্ত্বেও আরও একটা মেয়াদ পেলেন তিনি। তুখোড় বাগ্মী প্রধানমন্ত্রী। শ্রোতাদের চমকে দিতে পারেন। জনসভা হোক বা সরকারি অনুষ্ঠান, দেশ–‌বিদেশে এই গুণ তঁাকে অন্য নেতাদের থেকে অনেক এগিয়ে দিয়েছে। যদিও সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের মুখে এই বাগ্মী মোদিই একেবারে চুপ করে যান। তাতে যে তঁার অনুরাগীকুলের কিছু এসে যায়নি, ফলাফলই জানান দিচ্ছে। তঁাদের কাছে তিনি ক্ষমতাশালী নেতা, যিনি কখনও তোষণের রাজনীতির পথ ধরবেন না।
২০০২–‌এ গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় মোদিরই নাকের ডগায় নারকীয় দাঙ্গা ঘটেছে। তাতে এক হাজার প্রাণহানি হয়েছে, যঁাদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলিম। সেই কালিমালিপ্ত অতীত পেছনে ফেলে এসে জাতীয় রাজনীতিতে ক্রমে তঁার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগ, সঙ্গে ‘‌ফির একবার মোদি সরকার’‌ স্লোগান মুখে–‌মুখে ফিরেছে। মধ্যপ্রদেশের খারগোনে নিজেই স্লোগান দিয়েছিলেন ‘‌অব কি বার তিনশো পার’‌। সেটাই সত্যি প্রমাণ হল। বিজেপি–‌র প্রচার–‌ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে গেলে তাবৎ বিরোধী। 
আর সামান্য সঙ্ঘ–‌প্রচারক থেকে প্রধানমন্ত্রীর কুর্সি, এই দীর্ঘ যাত্রাপথ চমকপ্রদ বললে কম বলা হয়। গুজরাটের ভাডনগরে ১৯৫০–‌র ১৭ সেপ্টেম্বর জন্ম। বাবা দামোদরদাস এবং মা হীরাবেনের ছয় ‌সন্তানের তৃতীয় তিনি। রাজনৈতিক পথ বেছে নেন ৩৫ বছর বয়সে, ১৯৮৫‌–‌তে। সঙ্ঘই তঁাকে বিজেপি–‌তে পাঠায়। পার্টি অফিসের টুকটাক কাজ করতে করতে নজর কাড়েন রাজনৈতিক প্রজ্ঞায়। ২০০১–‌এ কেশুভাই প্যাটেলের পরিবর্তে তঁাকে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী করেছিল বিজেপি। সেই থেকে রাজনৈতিক উত্থান অব্যাহত।
‘‌সব কা সাথ, সব কা বিকাশ’‌। সবাইকে নিয়ে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৪–‌এ বিপুল জনরায়ে দেশ শাসনের ভার পেয়েছিলেন। বিরোধীরা তঁাকে অনবরত দুর্নীতিগ্রস্ত, বিভাজনকারীর তকমা দিলেও, তা ফুৎকারে উড়িয়েছেন গুজরাটের চারবারের মুখ্যমন্ত্রী মোদি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সামাজিক পদক্ষেপ করেছেন, যার মধ্যে অভিন্ন কর–‌ব্যবস্থা বা জিএসটি অন্যতম। তঁার ‘‌স্বচ্ছ ভারত অভিযান’‌ গ্রামীণ ভারতকে শৌচালয়মুখী করেছে। গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ এসেছে। গরিব গৃহস্থ রান্নার গ্যাস পেয়েছেন। রেলপথ ও জাতীয় সড়কের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধিও হয়েছে। 
তবে তঁার অতি–‌উচ্চাকাঙ্ক্ষী নোট বাতিলের পদক্ষেপে বেদম মার খেয়েছে দেশের অর্থনীতি। অনেকে কর্মহীন হয়েছেন। উৎপাদন থিতিয়েছে। বিদেশে গচ্ছিত কালো টাকা দেশের ফেরানোর যে–‌প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা প্রতিশ্রুতিই থেকে গেছে। কথা দিলেও কৃষি থেকে আয় দ্বিগুণ হয়নি। তা সত্ত্বেও একই সঙ্গে মোদির আমলে ব্যবসা–‌বাণিজ্যের পক্ষে অনুকূল দেশের তালিকায় ভারতকে এগিয়ে দিয়েছে বিশ্ব ব্যাঙ্ক।
কূটনীতির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের সমাদর বেড়েছে মোদির জমানায়। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, জাপান, ব্রিটেনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হয়েছে। তবে এ–‌ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবশ্যই বালাকোটে বায়ুসেনা–‌হানা। মোদি–‌অনুগামীদের বিশ্বাস, এর ফলে পাকিস্তানকে পুলওয়ামা জঙ্গি হামলার যোগ্য জবাব দিয়েছেন মোদি। স্বভাবতই লোকসভা নির্বাচনে এই ঘটনা বিজেপি–‌কে অনেক এগিয়ে দিয়েছে।

জনপ্রিয়

Back To Top