সংবাদ সংস্থা, আমেদাবাদ, ২৪ ফেব্রুয়ারি- সাবরমতী আশ্রম থেকে বিদায় নেওয়ার আগে ভিজিটর্স বুকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। লিখলেন, ‘‌এই সুন্দর সফরের জন্য বন্ধু প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ধন্যবাদ।’ তবে যাঁর কর্মভূমি ঘুরে দেখলেন, তাঁকেই ভুলে গেলেন!‌ ভিজিটর্স বুকে মহাত্মা গান্ধীর উল্লেখ অবধি করলেন না ট্রাম্প!‌ আর এখানেই সুর কাটল। ভিজিটর্স বুকে মোদিকে ধন্যবাদ জানিয়ে ট্রাম্পের বার্তা প্রকাশ্যে আসতেই আসরে নামল কংগ্রেস। দলের সাংসদ শশী থারুরের টুইট, ‘‌মহাত্মা প্রসঙ্গে আইনস্টাইন বলেছিলেন, আগামী প্রজন্ম হয়তো বিশ্বাসই করবে না, যে রক্ত মাংসের এমন একজন মানুষ সত্যিই এই পৃথিবীর বুকে হেঁটেছিলেন। মেসার্স মোদি এবং ট্রাম্প আইনস্টাইনের সেই উক্তি, যা তিনি আদৌ হতে দিতে চাননি, তা–‌ই সত্যি প্রমাণে উদ্যোগী হয়েছেন। মহাত্মার আবাস থেকেই তাঁর অস্তিত্ব মুছে দিয়েছেন!‌’‌ 
এক দশক আগে ২০১০–‌এ প্রথম ভারত সফরে এসে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কিন্তু গান্ধীর সশ্রদ্ধ উল্লেখ করেছিলেন। গান্ধীর সমাধি রাজঘাটে তাঁর বিষয়ে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের উদ্ধৃতি উল্লেখ করে ভিজিটর্স বুকে লিখেছিলেন, ‘‌মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছিলেন, গান্ধীর ভাবনা আজও ভারতে উজ্জীবিত। সেটাই সত্যি। এবং সেটা সারা বিশ্বের কাছে আজও অমূল্য উপহার। শান্তি ও ভালবাসার এই ভাবনা যেন চিরদিন ভারতবাসীর মধ্যে থাকে।’‌ 
মহাত্মা গান্ধী সাবরমতী আশ্রমে ১৩ বছর কাটিয়েছিলেন। সেখান থেকেই ১৯৩০–‌এ ডান্ডি অভিযানের সূচনা হয়েছিল। এদিন মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প সাবরমতী আশ্রমের ভিজিটর্স বুকে স্রেফ সই করেন। আশ্রম থেকে উপহার হিসেবে ট্রাম্প দম্পতি পেলেন একটি ছোট চরকা আর গান্ধীজির সেই তিন বাঁদরের মূর্তি, যারা খারাপ কিছু দেখা, শোনা এবং বলার বিষয়ে সতর্ক করে। ট্রাম্প ও তাঁর স্ত্রীকে ওই মূর্তির অর্থ বুঝিয়ে দেন মোদি। 
বিশেষ অতিথিদের চায়ের সঙ্গে খাম্মান, ব্রকোলি ও কর্ন সামোসা, আপেল পাই, কাজু কাটলি পরিবেশন করা হয়।  ট্রাম্পের যাত্রাপথের দু’‌পাশে ব্যারিকেডের ওপারে ছিল উৎসাহী শহরবাসীর ভিড়। কার্যত এদিন অঘোষিত ছুটি ছিল আমেদাবাদে। কেউ অফিস যাননি। ছোট, বড়, মাঝারি দোকানি, ব্যবসায়ীরা ঝাঁপ বন্ধ করেছিলেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। সবাই মশগুল ছিলেন ‘‌নমস্তে ট্রাম্প’‌–‌এর রূপ–‌রস–‌গন্ধ–‌স্পর্শ পেতে। গুজরাটের বিভিন্ন প্রান্ত, এমনকী মুম্বই থেকেও এসেছিলেন দলে দলে গুজরাটি। ঠাঠা রোদে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
আমেদাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সাবরমতী আশ্রম পৌঁছতে আধ ঘণ্টা। মেরেকেটে ১৫ মিনিট ছিলেন সস্ত্রীক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে ওইটুকু সময়ের মধ্যে দু’‌দেশের সংবাদ মাধ্যমের জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু মুহূর্ত দিলেন তাঁরা। ট্রাম্প, মেলানিয়া, ইভাঙ্কারা সাবরমতীতে পৌঁছতেই বেজে উঠল মহাত্মার প্রিয় ভজন, ‘‌বৈষ্ণব জন তো’‌। ইংরেজিতে ‘‌দ্য গড অফ হিউমিলিটি’‌ শীর্ষক মূল গানের রচয়িতা মহাত্মাই। গুজরাটি সংস্করণটিই যদিও বহুল প্রচলিত। প্রথা মেনে জুতো খুলে আশ্রমে প্রবেশ করেন সস্ত্রীক মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাঁদের খাদির উত্তরীয় পরিয়ে স্বাগত জানান এক আশ্রমিক। এরপর দুই রাষ্ট্রনেতার হাতে একটি মালা তুলে দেন সেই আশ্রমিক। দু’‌জন একসঙ্গে সেটি মহাত্মার বাঁধানো বিশাল ছবিতে পরান। এরপর এগিয়ে যান জাতির জনকের ব্যবহৃত চরকার দিকে। সেটি দেখা মাত্রই হাঁটু মুড়ে বসে পড়েন ট্রাম্প। দেখাদেখি ফার্স্ট লেডিও। দু’‌জনেই সুতো কাটার চেষ্টা করেন। তাঁরা সুবিধা করতে পারছেন না দেখে এগিয়ে আসেন দুই মহিলা আশ্রমিক। চরকা কাটার পদ্ধতি বুঝিয়ে দেন। ‌এরপর আশ্রমের রোয়াকে বসে সস্ত্রীক ট্রাম্পকে খানিক চরকার মাহাত্ম্য, পরাধীন ভারতবাসীর ব্রিটিশ পরিধান বর্জন করে স্বনির্ভর হওয়ার ইতিহাস ছোট করে বুঝিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। সেই রোয়াক, যেখানে সাক্ষাৎপ্রার্থীদের দেখা দিতেন মহাত্মা।‌‌‌ 
এর আগে ট্রাম্প দম্পতি সাবরমতী আশ্রমে আসবেন কি না তা নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছিল। ঠিক সময়ে তাজ মহলে পৌঁছনোর জন্য সাবরমতী এড়িয়ে যেতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সস্ত্রীক ট্রাম্প এলেন ঠিকই, কিন্তু ভিজিটর্স বুকে যা 
লিখলেন তা সব ভারতবাসীকেই বিস্মিত করবে। একই কথা প্রযোজ্য মেলানিয়ার ক্ষেত্রেও। মনে হয়েছে, ট্রাম্প দম্পত্তি সাবরমতীকেও একটা ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবেই দেখেছেন। 
সম্ভবত মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে ঠিকমতো অবহিত নন তাঁরা। আর সেই কারণেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা তাঁর স্ত্রী কেউই গান্ধী সম্পর্কে একটা 
শব্দও লেখেননি। 

জনপ্রিয়

Back To Top