আবু হায়াত বিশ্বাস, দিল্লি, ২৪ ফেব্রুয়ারি- উত্তপ্ত রাজধানী‌তে ক্যা–বিরোধী ও ক্যা–সমর্থকদের মধ্যে লড়াইয়ে প্রাণ গেল এক পুলিশকর্মী, ও তিন‌জন সাধারণ নাগরিকের। গুরুতর জখম সাহাদরার ডেপুটি পুলিশ কমিশনার। দুই গোষ্ঠীর ইট–‌পাথর বৃষ্টিতে আহতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। আগুনে পুড়েছে গাড়ি, দোকান, পেট্রোল পাম্প। পুলিশ সূত্রের খবর, হিংসার ঘটনায় ৪০–এর বেশি নিরাপত্তা কর্মী আহত। 
রবিবার বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র মৌজপুরে পৌঁছে উত্তেজক ভাষণ দেন। পুলিশকে সতর্ক করে তিনি বলেন, প্রশাসন যদি রাস্তার ওপর বসে–থাকা প্রতিবাদকারীদের সরিয়ে না দেয়, তাহলে তাঁরাই সেই ব্যবস্থা করবেন। তিনি চলে যাওয়ার পর রাতে হিংসা শুরু হয়েছিল জাফরাবাদ, মৌজপুর এলাকায়। নিরাপত্তা কর্মীদের কড়াকড়িতে সাময়িক শান্তি ফেরে। সোমবার দুপুর গড়াতেই ফের উত্তপ্ত হয়ে ওঠে উত্তর–পূর্ব দিল্লির জাফরাবাদ, গোকুলপুরি, মৌজপুর, কারদামপুরি, চাঁদবাগ, দয়ালপুর এবং ভজনপুরা এলাকা। শুরু হয় পাথর ছোড়া। মাথায় পাথর লেগে রতন লাল নামে দিল্লি পুলিশের এক হেড কনস্টেবলের মৃত্যু হয়েছে। মারা যান মহম্মদ ফুরকান নামে একব্যক্তি,  তাঁরও মৃত্যু হয়েছে মাথায় পাথর লেগে। রাতের খবর আরও একজনকে মৃত অবস্থায় গুরু তেজবাহাদুর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উত্তর–পূর্ব দিল্লির বিস্তীর্ণ অংশে জারি হয়েছে ১৪৪ ধারা। নেমেছে র‌্যাফ, সিআরপিএফ। স্পর্শকাতর এলাকায় চলছে আধাসেনার টহল। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র রাষ্ট্রমন্ত্রী জি কিসান রেড্ডি জানিয়েছেন, দুষ্কৃতীদের কাউকে রেয়াত করা হবে না। আগামী কাল স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়ে দিল্লি সরকার।
বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ভাঙতে বিজেপি–ই লোক পাঠিয়ে অশান্তি পাকাচ্ছে। পুলিশের সামনেই এক ব্যক্তি প্রকাশ্যে পিস্তল নিয়ে ঘুরছে। ৮ রাউন্ড গুলিও চালিয়েছে। পিস্তল হাতে ওই ব্যক্তির পুলিশকে লক্ষ করে এগিয়ে আসতেও দেখা যায়। সেই ভিডিও ইতিমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একদল ক্যা–সমর্থনকারী ক্যা–বিরোধীদের লক্ষ করে পাথর ছুড়ছে এবং ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ স্লোগান দিচ্ছে। পুলিশের সামনেই এমন ক্যা–সমর্থনকারীরা পাথর, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঘুরলেও পুলিশ কোনও পদক্ষেপ করেনি বলে অভিযোগ।
এদিন দুপুরে ওয়াজিরাবাদের খাজুরি খাস এলাকায় বেশ কয়েকটি দোকানে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। উড়ে আসে পাথর। পাল্টা পাথর ছুড়তে দেখা যায় পুলিশ কর্মীদেরও।  ক্যা–বিরোধী ও ক্যা–সমর্থনকারীদের মধ্যে সঙ্ঘর্ষে রণক্ষেত্র তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। ছোড়া হয় কাঁদানে গ্যাস। জাফরাবাদ, মৌজপুর–বাবরপুর, গোকুলপুরি, জোহরি এনক্লেভ এবং শিব বিহার মেট্রো স্টেশনের গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। 
রাজধানীর আইন–‌শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পদত্যাগেরও দাবি উঠতে শুরু করে। কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, ‘‌দিল্লি পুলিশ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে। অমিত শাহ দিল্লির আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। প্রকাশ্যে বিজেপি নেতা ঘৃণ্য ভাষণ দিলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।’‌ এদিন সন্ধেয় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী টুইট করে শান্তি বজায় রাখার বার্তা দেন। তিনি লিখেছেন, ‘‌হিংসার ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ। হিংসা কখনও ন্যয়সঙ্গত হতে পারে না। যতই উসকানি দেওয়া হোক না কেন, দিল্লির সকল নাগরিকের কাছে আহ্বান, সংযম ও শান্তি বজায় রাখুন।’‌  
রাজধানীতে হিংসার ঘটনায় উদ্বিগ্ন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। শান্তি–‌শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য আবেদন জানিয়েছেন তিনি। এলাকায় নিরাপত্তার জন্য উপরাজ্যপালের কাছে আবেদন জানান কেজরিওয়াল। উপরাজ্যপাল অনিল বইজল বলেছেন, উত্তর–পূ্র্ব দিল্লির আইন–‌শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য দিল্লি পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সন্ধেয় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব অজয় ভাল্লা জানিয়েছেন, ‘‌ব্যাপক নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করা হয়েছে উত্তর–পূর্ব দিল্লিতে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে।’‌
জাফরাবাদে ক্যা–বিরোধিতায় শতাধিক মহিলার জমায়েত হয়েছিল রবিবার। এরপরেই পাল্টা ক্যা‌–‌র সমর্থনে পথে নেমেছিলেন বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র। সেই সময়ে পুলিশকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বিজেপি নেতা বলেছিলেন, ‘‌আমরা তিনদিন সময় দিচ্ছি। জাফরাবাদ ও চাঁদবাগের রাস্তা ফাঁকা করে দিন। তা যদি না পারেন, আমাদের আর বোঝাতে আসবেন না। আমরা আপনাদের কথা শুনব না।’‌ একইসঙ্গে জানিয়েছিলেন, ‘‌যতক্ষণ না ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারত ছেড়ে যাচ্ছেন, ততক্ষণ আমরা শান্তিপূর্ণ থাকব। তারপরে আমরা পুলিশের কথা শুনব না।’ কার্যত ট্রাম্পের সফরের প্রথম দিনেই রণক্ষেত্রের চেহারা নিল দিল্লি। কপিল মিশ্রই জাফরাবাদে হিংসায় মদত জুগিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন এআইএমআইএম প্রধান আসাদুদ্দিন ওয়াইসি।

জনপ্রিয়

Back To Top