আজকাল ওয়েবডেস্ক: ‌ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারার সমকামী মামলায় রায় ঘোষণা করল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালতের পাঁচ বিচাপতির বেঞ্চ বৃহস্পতিবার স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, পুরনো ধ্যান ধ্যারণাকে ত্যাগ করে নতুন যুগকে স্বাগত জানাতে হবে। সমকামিতায় যৌন সম্পর্ক মোটেও কোনও অপরাধ নয় বলেও জানায় সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতি।
বৃহস্পতিবার এই রায় ঘোষণার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতি বেঞ্চের সদস্যরা সমকামী এবং তাঁদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চান। বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রা বলেন, ‘‌পুরনো এই আইনের জন্য সমকামী সদস্যদের বহু হেনস্থার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সমাজের উচিত তাঁদের প্রত্যেকের কাছে ক্ষমা চাওয়া। অতীতের এই আইন এতদিন তাঁদের অনুভূতিকে আহত করেছে, যা সমাজ বুঝতে পারেনি।’‌ ৩৭৭ ধারা নিয়ে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সমাজের পাঁচ প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরাই সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানিয়ে ছিলেন। বৃহস্পতিবার সেই ধারার পক্ষে গিয়েই রায় দিল আদালত। সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে জানায়, দেশে সকলের সমান অধিকার রয়েছে। মর্যাদার সঙ্গে সকলেই বাঁচতে চায়। প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র এ বিষয়ে বলেন, ‘ব্যক্তির নিজস্ব পরিচয়ই তাঁর জীবনের আসল পিরামিড‌। কেউ কোনওদিনও তাঁর ব্যক্তিত্বকে ছেড়ে পালাতে পারে না। ব্যক্তিস্বাতন্ত্রকে মেনে নেওয়ার জন্য সমাজ এখন অনেক উন্নতি করেছে। বর্তমানে যে মামলাটি নিয়ে এত হইচই হচ্ছে, সেটা হওয়ার কোনও অর্থই নেই।’‌ সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, অন্যদের মতই সমকামীদেরও এ দেশে সমান অধিকার রয়েছে। সমকামীতা কোনওভাবেই সমাজের পক্ষে ক্ষতিকর নয়, এটা কোনও পুরুষ বা মহিলার নিজস্ব পছন্দ, সেখানে সমাজ বা আইন কোনওভাবেই হস্তক্ষেপ করতে পারে না। 
১৮৬০ সালে ব্রিটিশদের তৈরি করা ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী, প্রকৃতির বিরুদ্ধে কোনও ধরনের যৌন সম্পর্ককেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ধারা হবে। আসলে পশ্চিমী জীবনধারাতে সমকামীতার প্রভাব একটু বেশি। তাই সেই যুগে সেটাকে বন্ধ করার জন্যই জন্ম নেয় ৩৭৭ ধারা। কিন্তু বর্তমানে পাশ্চাত্য দেশেই সবচেয়ে বেশি এই সমকামীরা রয়েছে এবং সেখানে তাঁরা সুস্থ–স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে।

পাশাপাশি ভারতে কিন্তু অন্য চিত্র দেখা যায়। এখানে এখনও ব্রিটিশের ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী সমকামীতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এদিন বলেন, ‘‌সমাজ কি ভাবল তাতে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে খর্ব করা চলবে না। সমাজের চিন্তাভাবনাকে আধুনিক করতে হবে। আমি যেমন আমাকে সেভাবেই সমাজ গ্রহণ করুক।’‌ তিনি আরও বলেন, ‘‌সমকামীতা কোনও মানসিক অসুখ নয়। এটা মনের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি।’‌ 
ভারতীয় দণ্ডবিধির এই ৩৭৭ ধারার বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম আপত্তি জানিয়েছিল স্বে‌চ্ছাসেবী সংস্থা নাজ ফাউন্ডেশন। ২০০১ সালে দিল্লি হাইকোর্টে ওই ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে তারা। ২০০৯ সালে দিল্লি হাইকোর্ট সেই মামলার রায়ে জানায়, সম্মতির ভিত্তিতে দুই প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে যৌন সম্পর্ক কখনই অপরাধ নয়। তাঁদের যৌন পছন্দ এ ক্ষেত্রে বিবেচনাযোগ্য বিষয়ই নয়। কারণ, যৌন পছন্দ যা-ই হোক না কেন, দুই প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে যৌন সম্পর্কে আপত্তি জানালে ব্যক্তিগত অধিকারকে লঙ্ঘন করা হয়। দিল্লি হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে শীর্ষ আদালতে যান একাধিক ব্যক্তি ও সংগঠন। ২০১৩ সালে দিল্লি হাইকোর্টের রায় খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, ৩৭৭ ধারার সাংবিধানিক বৈধতা আছে। সমকামিতাকে অপরাধের তকমামুক্ত করতে গেলে সংসদে আইন পাশ করতে হবে। তখন নতুন করে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। পুনরায় শুরু হয় আইনি লড়াই। ২০১৩ সালের রায় বিবেচনা না করে ৩৭৭ ধারার সাংবিধানিক বৈধতা ফের একবার সামগ্রিক ভাবে বিচার করে দেখার সিদ্ধান্ত নেয় শীর্ষ আদালত। এর আগের শুনানিতে ৩৭৭ ধারা নিয়ে সিদ্ধান্তের ভার সুপ্রিম কোর্টের উপরেই ছে়ড়ে দিয়েছিল কেন্দ্র। বেঞ্চও ইঙ্গিত দেয়, কেন্দ্র বিরোধিতা না করলে সমকামিতার অধিকারের পক্ষেই রায় দিতে পারে শীর্ষ আদালত। অবশেষে ঐতিহাসিক রায়ে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ জানিয়ে দিল, সমকামিতা আর অপরাধ নয়। ‌

 

 


 

 

জনপ্রিয়

Back To Top