ভোলানাথ ঘড়ই, ছাপড়া: ‌সারন। সম্রাট অশোকের ধর্মস্তম্ভ থেকে, নাকি লম্বা হরিণের জঙ্গলের কারণে এই এলাকার এমন হয়েছিল?‌ মতভেদ আছে। গঙ্গা, গন্ডক আর ঘাঘরা নদীতে ঘেরা এই প্রাচীন জনপদ এখনও লালুজির খাসতালুক— এ ব্যাপারে কোনও মতভেদ নেই। লালুপ্রসাদ নিজে চার চারবার জিতেছেন, রাবড়িদেবীও অনায়াসে জিতেছেন। কোণঠাসা লালুজি এখন অসহায়, জেল গরাদের ওপারে। আর এই সুযোগে যাদবগড় ছাপড়াকে রাজপুতরা তুলে দিয়েছে বিজেপির হাতে। জিতেছেন বিজেপির রাজীব প্রসাদ রুডি। ১০ বছরে তিন নদী দিয়ে জল গড়িয়েছে অনেক। নদীর ওপর নম্বা সেতু হয়েছে। চার চারটি বড় কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সাধ করে রেলমন্ত্রী লালুজি যে রেল কারখানা আনতে চেয়েছিলেন, তা অসম্পূর্ণ। বদলেছে অনেক কিছুই। বদলায়নি এই ভোজপুরীদের স্বভাব। ছাপড়া মিউনিসিপ্যালিটি তৈরি হয়েছিল ১৮৬৪ সালে। এই জেলা পেয়েছে জয়প্রকাশ নারায়ণ, ড.‌ রাজেন্দ্র প্রসাদের মতো রাজনীতিবিদকে। মিউনিসিপ্যালিটি বাজারের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা ভোজপুরী গান কানে এল, ‘‌গাধা হোই না ঘোড়া হোই হো/‌মারলা সে মুয়ারি/‌কেহু কো সুধারি হোই বিহার নাহি সুধারি।’‌
সত্যিই শোধরায়নি বিহার। এখনও বিহারের ভোট মানেই জাতপাতের অঙ্ক। শুধুমাত্র পিছিয়ে থাকা জাত নয় ব্রাহ্মণ, কায়স্থরাও জাতের অঙ্কে ভোট দেয়। পাটনায় আমার বিদঘুটে পদবি শুনে অন্তত তিনজন সাংবাদিক জানতে চেয়েছেন, ‘‌আপ কিস বিরেদারিকে হ্যায়!‌’‌ আর বিহারে এই জাতপাতের ভোটের রাজধানী হল ছাপড়া বা সারন। যে–‌ই জিতুক বা হারুক, তা নিয়ন্ত্রণ করবে এখানকার জাতপাতের অঙ্ক। এখানে কোনও সি ভোটার বা এসি নিয়েলসন লাগে না। ৫ জন এক জায়গায় হলেই ছাপরাবাসীর আলোচনা, শোনপুরে কত যাদব ভোটার, মারহারুয়ায় কত রাজপুত ভোটার, আমনৌরে কত ভূমিহার, পারসায় কত মুসায়ার, ছাপরায় কত মুসলিম ইত্যাদি।
সারন লোকসভায় আর লালু পরিবারের কেউ ভোটে দাঁড়ায়নি। টিকিট দেওয়া হয়েছে তেজপ্রতাপ যাদবের শ্বশুর, লালুর সম্বন্ধী চন্দ্রিকা রায়কে। এনডিএ-‌র প্রচার, সারন এবার যাদব পরিবারের সম্বন্ধীয়ানা বাঁচানোর ভোট। অথচ চন্দ্রিকা রায় বিহার রাজনীতির পরিচিত মুখ। তাঁর বাবা দারোগা রায় এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। উচ্চশিক্ষিত, মার্জিত এই পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই আরজেডি করছে। লালুর বড় ছেলের সঙ্গে এই চন্দ্রিকা রায়ের মেয়ে ঐশ্বর্যের বিয়ে হয়। বছর খানেক ধরে তাতে বিচ্ছেদের মামলা চলছে। চন্দ্রিকাকে টিকিট দেওয়ায় অখুশি তেজপ্রতাপও। দুই পরিবারের সম্পর্ক জোড়া দিতেই কি চন্দ্রিকাকে প্রার্থী করেছে আরজেডি। আরজেটি প্রধান তেজস্বী যাদবের কথা, দল আলোচনা করেই চন্দ্রিকাকে প্রার্থী করেছে। সারনের বাসিন্দা চন্দ্রিকা দলের পরীক্ষিত নেতা, বিধায়ক।
এতদিন অভিযোগ উঠত ছাপরা লালুর পারিবারিক সম্পত্তি। নিজে অথবা ছেলে, বউকে টিকিট দেওয়া হয়। এবার সে পথে হাঁটেননি তেজস্বী। নিজে দাঁড়াননি, ভাইকেও টিকিট দেননি। তেজপ্রতাপের দাবি মেনে মা রাবড়িদেবীকেও দাঁড় করাননি।
২০১৪ সালের মোদি হাওয়া নেই। যাদব ও মুসলিম ভোটের ছিটেফোঁটাও মিলবে না, বিলক্ষণ জানেন। তাই রাজপুত ভোট আর নীতীশের কুর্মি ও ভূমিহার ভোটের ভরসায় এবারও প্রার্থী রাজীব প্রতাপ রুডি। কেন্দ্রের মন্ত্রী ছিলেন। মোদির অসন্তোষে মন্ত্রিত্ব গেলেও, বিহারের বিজেপি নেতা ভুপিন্দর সিংয়ের প্রয়াসে টিকিট মিলেছে চন্ডীগড়ের ডিএভি স্কুলে পড়া রুডির। সকালে ছাপড়া বাজারে লিট্টি ও চায়ের দোকানে কালো টাকা, নোটবন্দি, জিএসটি, চাকরির প্রতিশ্রুতি, পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ— গরমাগরম আলোচনায় কোনও খামতি নেই। নীতীশ কুমার এই ৫ বছরে রাজ্যবাসীকে কী দিয়েছেন, কী দেননি তা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে রোজই। সেখানে যাদব থেকে রাজপুত কায়স্থ সবাই আছেন। কিন্তু কী আশ্চর্য!‌ দিনের শেষে সারনের বাসিন্দারা শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে ভোট দেবেন প্রার্থীর পদবি আর জাত দেখেই। এটাও আমার ভারতবর্ষ!‌ লিট্টিতে কামড় বসিয়ে প্রবীণ রামশঙ্কর যাদব বোঝালেন ভোটের আগাম হিসেব। ঠেঁট ভোজপুরীতে বললেন, বিচার হবে এইভাবে। এখানকার ৬ বিধানসভা আসনে সবচেয়ে বেশি ভোট যাদবদের। তারপর রাজপুত। সারনে মারহারুয়া, আমনৌর, গরখা, পারসা এলাকায় যাদবরাই প্রধান। যাঁরা ভোট দেবেন চন্দ্রিকা রাইকে। আর ছাপরা ও সোনপুরে রাজপুত ভোটের সংখ্যাই বেশি। তারা ভোট দেবেন রাজপুত রাজীব প্রসাদ রুডিকে। ১০ শতাংশ মুসলমান ভোটার রয়েছেন এখানে। যাঁরা কিছুতেই পদ্মফুলে ছাপ দিতে পারবেন না। এর বাইরে কিছু ভোটার রয়েছে মিসলেনিয়াস। এরা কাকে ভোট দেবে সেটাই দেখার।
বুঝলাম, বিহার আছে বিহারেই। লালু হোই না মোদি হোই হো, ছাপরা নাহি শুধারি।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top