আবু হায়াত বিশ্বাস,‌দিল্লি: নোট বাতিলের পর ঠিক ৩ বছর কেটে গেল। এতদিনে প্রকট হয়েছে অর্থনীতির বেহাল দশা। দুর্নীতি রোধ, কালো টাকা উদ্ধার আর সন্ত্রাসবাদ খতম করতেই নাকি নোট বাতিল!‌ কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, এগুলির কোনওটাই সফল হয়নি নরেন্দ্র মোদি জমানায়। বরং বেড়েছে দুর্নীতি, সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ, জাল নোটের কারবার। বিরোধীদের অভিযোগ, ৩ বছর আগের মোদি সরকারের ভুলের চরম মাশুল দিতে হচ্ছে ভারতীয় অর্থনীতিকে। নোট বাতিলই দেশের অর্থব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নোট বাতিল, জিএসটি–র মতো সিদ্ধান্তই চলতি আর্থিক শ্লথতার অন্যতম কারণ।‌ 
২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর‌। রাত তখন ৮টা। আচমকাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছিলেন ১,০০০ এবং ৫০০ টাকার নোট বাতিলের কথা। দেশের মানু্ষকে ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড় করিয়েছিলেন মোদি। অর্থনীতিবিদ থেকে শিল্প মহলের অনেকেই বলছেন, নোট বাতিলের সিদ্ধান্তে ক্ষতি হয়েছে কৃষক, শ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ীদের। সিপিএম নেতা হান্নান মোল্লা বললেন, ‘‌নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত ছিল ঐতিহাসিক ভুল। ওই সিদ্ধান্তের ফলে আজ কৃষক, ছোট–‌মাঝারি ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অর্থব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। মোদি প্রকৃতই দেশপ্রেমিক হলে স্বীকার করে নিতেন নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত ভুলই ছিল। তাঁর গোয়ার্তুমির ফল ভোগ করতে হচ্ছে ভারতীয় অর্থনীতিকে।’‌‌
বিরোধীদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষকে ধোঁকা দিয়েছিলেন। অর্থনীতিতে কালো টাকার রমরমা যেমন ছিল, ৩ বছর পরে তেমনই আছে৷ নতুন নোট বাজারে আসতে না আসতেই জাল হয়েছে। আর, জাল নোটের বেশিরভাগটাই ২,০০০ টাকার নোট। তাহলে নোট বাতিলে কী লাভ হল?‌ প্রশ্ন তুলেছে কংগ্রেস–সহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের বক্তব্য, দুর্নীতি রোখার বদলে শাসক দলের ঘনিষ্ঠ পুঁজিপতিরা লাভবানই হয়েছে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সুরজিৎ মজুমদারের বক্তব্য, ‘‌নোট বাতিলের প্রভাব যে অসংগঠিত ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পড়েছিল তা স্পষ্ট হয়েছে এই ৩ বছরে। আয়করে বিশাল পরিমাণ অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা পড়বে বলা হয়েছিল। বাস্তবে তাও হয়নি। কালো টাকা উদ্ধারেও চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছে সরকার। নোট বাতিলের ফলে কৃষক ও নিম্ন–মধ্যবিত্তরা, ছোট–মাঝারি শিল্পোদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। আর এ সবেরই ফল অথনৈতিক শ্লথতা।’‌
সরকার ভেবেছিল, কালো টাকার পরিমাণ মোট টাকার ১৫–২০ শতাংশ এবং তা ব্যাঙ্কে ফেরত আসবে না। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হিসেব বলছে, বাতিল হওয়া নোটের ৯৯ শতাংশই ফেরত এসেছে। পরে লক্ষ লক্ষ লোকের কাছে আয়করের নোটিস গেছে ঠিকই, কিন্তু এখনও তাঁদের থেকে বড় অঙ্কের কালো টাকা উদ্ধার হয়নি। এর পাশাপাশি এনসিআরবি রিপোর্ট বলছে, ২০১৭ সালে ২৮.‌১ কোটি জাল নোট উদ্ধার হয়েছে। যা ২০১৬ সালের তুলনায় ৭৬ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ মোদি সরকারের জাল নোটের কারবারকে সমূলে উৎপাটিত করার কৌশলও কাজে আসেনি। ২০১৭ সালে ৩,৫৫,৯৯৪টি নোট উদ্ধার হয়েছিল। সেখানে ২০১৬ সালে সংখ্যাটি ছিল ২,৮১,৮৩৯। অর্থাৎ, নোট বাতিলের পরের বছর প্রায় ২৬ শতাংশ জাল নোট বৃদ্ধি পেয়েছিল। সাউথ এশিয়া টেররিজম পোর্টাল (‌‌এসএটিপি‌)‌ তথ্য বলছে, ২০১৫ সালে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে ৭২৮ জনের প্রাণ গিয়েছিল। সেখানে পরের তিন বছরে প্রাণহানির সংখ্যা যথাক্রমে ৯০৫, ৮১২ ও ৯৪০। অর্থাৎ, সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম কমাতেও ব্যর্থ হয়েছে নোট বাতিল। 
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকনমিক স্টাডিজ অ্যান্ড প্ল্যানিংয়ের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর চিরশ্রী দাশগুপ্তের বক্তব্য, ‘‌নোট বাতিলের সরাসরি প্রভাব অসংগঠিত ক্ষেত্রে পড়েছিল। ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পে আর্থিক বিপর্যয় নেমে আসে। নোট বাতিলের পরপরই জিএসটি–র ধাক্কায় ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মচ্যুত হয় শ্রমিকরা। হাতে কাজ নেই। টাকাও নেই। স্বাভাবিকভাবেই চাহিদা কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।’‌ 
আরএসপি–র সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ক্ষিতি গোস্বামী বলেন, ‘‌মোদি সরকার কর্পোরেটদের স্বার্থেই নোট বাতিল করেছিল। যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। নোট বাতিলে কালো টাকা উদ্ধারের কথা বলা হলেও তা হয়নি। বরং সরকারের ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিরা দেশের টাকা লুঠ করে বিদেশে পালিয়েছে।’‌ দিল্লির আম আদমি পার্টির নেতা সঞ্জয় বসু বললেন, স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে বড় দুর্নীতি ছিল নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত। বাতিল হওয়া নোটের সবটাই ফিরে এসেছে। নকল টাকা ছাপানো বেড়েছে। দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে বিজেপি সরকার।’‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top