আজকালের প্রতিবেদন, দিল্লি, ২১ অক্টোবর- বাণিজ্যে বৃদ্ধি উৎসাহিত করতে কর্পোরেট করের হার কমিয়েছিল মোদি সরকার। সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে উদ্বৃত্ত উপার্জন প্রধানমন্ত্রী কিসান যোজনার ক্ষেত্র সম্প্রসারণে ব্যবহার করা উচিত। মনে করেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জি। এবং কিসান যোজনায় তঁাদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যঁারা সরাসরি কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত নন।
২০১৯ সালে অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী তিন অর্থনীতিবিদের দুজন, সম্পর্কে স্বামী–স্ত্রী অভিজিৎ ব্যানার্জি এবং এস্থার দুফলো ভারতে এসেছেন তঁাদের নতুন বই ‘‌গুড ইকনমিক্‌স ফর হার্ড টাইমস্‌’‌–এর আনুষ্ঠানিক প্রকাশ উপলক্ষে।
তারই অবসরে এক সাক্ষাৎকারে অভিজিৎ যুক্তি দিলেন, কেন তিনি কর্পোরেট কর কমানোর বিপক্ষে। কারণ, বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংস্থার হাতে প্রচুর টাকা। তারা প্রায় টাকার পাহাড়ের ওপর বসে আছে। কিন্তু তারা সেই টাকা বিনিয়োগ করছে না, কারণ বাজারে চাহিদা কম। ফলে, ব্যবসা হচ্ছে না। সুতরাং তাদের কর ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত তিনি হলে নিতেন না। যদিও ছাড়ের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করাও কঠিন, তবু সেটা ভাবা যেতে পারে। কারণ এই করছাড়ের কারণে আর্থিক ঘাটতি বাড়বে। চাপ পড়বে সরকারি তহবিলে। বরং যে টাকা ছাড় দেওয়া হচ্ছে, সেটা সরকারের আয় হলে প্রধানমন্ত্রী কিসান যোজনার আওতা বাড়ানো যেতে পারে। ১০০ দিনের কাজের মজুরি বাড়ানো যেতে পারে। তাতে যেটা হবে, রোজগার 
বাড়লে যারা খরচ করে, তাদের হাতেই টাকাটা পৌঁছবে।
এ‌বছর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পর প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে অভিজিৎ একই কথা বলেছিলেন। যে বিত্তবানদের আর্থিক সুবিধে না দিয়ে গরিবের হাতে টাকা পৌঁছনো উচিত।
অভিজিৎ এবারের সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আয়করের হার বাড়িয়ে গড় জাতীয় উৎপাদন ও সরকারি করের অনুপাত ভাল করা যায় না। বরং আরও বেশি পণ্যকে জিএসটি–র আওতায় আনা উচিত। সরকারের এটাও দেখা উচিত যে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ব্যবস্থায় পরোক্ষে শ্রমের চাহিদা বাড়ে। সেখানে পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রী কিসান যোজনার মতো প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল হলে শ্রমের চাহিদা কমে যায়। অভিজিতের কাছে প্রশ্ন ছিল, প্রধানমন্ত্রী কিসান যোজনা কি ‘‌ভাল অর্থনীতি’‌র উদাহরণ হতে পারে। জবাবে অভিজিৎ বলেন, ভূমিহীন কৃষক, বা কৃষিশ্রমিকদেরও এই প্রকল্পের আওতায় না আনার কোনও কারণ নেই। বিশেষত যেখানে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ব্যবস্থা ছাড়াই কৃষকদের সহায়তার চেষ্টা হচ্ছে। সেটাই ভাল অর্থনীতি। বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন অভিজিৎ, যে কীভাবে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য শ্রমের চাহিদা বাড়ায়। সরকার গমের দাম বেঁধে দিল। বেশি গম চাষ করলে বেশি লাভ। সেই সুবাদে আরও বেশি লোকের দরকার হবে চাষের কাজে। যদি সেই বেশি চাষে উৎসাহ দেওয়ার বদলে কিসান যোজনার মাধ্যমে কৃষকের হাতে টাকা আসে, তা হলে খেতমজুরের প্রয়োজন কমবে। কাজেই ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঠিক করে দেওয়ার বাড়তি কিছু আনুষঙ্গিক  সুবিধে আছে, যেটা অনেক লোকের কাছে পৌঁছয়।
কথাপ্রসঙ্গে ভারতের গাড়ি শিল্পে চলতি মন্দার কথা উঠেছিল। গাড়ি বিক্রি কমেছে। তার জেরে প্রচুর লোকের চাকরি গেছে। অভিজিতের বক্তব্য, এক্ষেত্রে গাড়ি নির্মাতা সংস্থাগুলোর দায়িত্ব নেওয়া উচিত। তাদেরই একটা তহবিল গড়া উচিত, যেখান থেকে কর্মচ্যুতদের ভাতা দেওয়া যায়। অর্থনৈতিকভাবে ভারত যে এখন একটা কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, বাস্তবিকতার খাতিরে সেটা মেনে নিয়েছেন অভিজিৎ। যদিও তিনি এখনও নিশ্চিত নন, যেহেতু সংক্রান্ত তথ্য ও পরিসংখ্যান তঁাকে এখনও মিশ্র সঙ্কেত দিচ্ছে। তবে নিজেদের বই ‘‌গুড ইকনমিক্‌স ফর হার্ড টাইমস্‌’‌–এ করের হার বাড়ানোর পক্ষেই মত দিয়েছেন অভিজিৎ এবং এস্থার। সেখানে কর্পোরেট করের হার কমানোটা ফের পিছনের দিকে হঁাটা বলে ওঁদের মনে হয়েছে। জিএসটি–র মতো অপ্রত্যক্ষ করের ক্ষেত্রেও ওঁদের বক্তব্য, যেখানে আরও বেশি পণ্য, পরিষেবা উঁচু হারের জিএসটির আওতায় যাওয়া উচিত ছিল, সেখানে উল্টোটা হয়েছে। একাধিক পণ্য সরিয়ে আনা হয়েছে কম করের তালিকায়। আয়করের ক্ষেত্রেও করের হার কমানোর বিরোধী ওঁরা। এমনকি মধ্যবিত্তকেও কর ছাড় দেওয়া অনুচিত বলে মনে করেন। অভিজিতের সাফ কথা, কেবল উচ্চবিত্তের থেকে সম্পত্তি কর এবং আয়কর নিয়ে সরকারের আয় হয় না। মধ্যবিত্তের থেকে কর না নিলে গড় জাতীয় উৎপাদনে সরকার নিজের অংশীদারি কখনই বাড়াতে পারে না। উদাহরণ চীন। সে দেশে বছরের পর বছর করকাঠামো অপরিবর্তিত রেখেই সরকারের আয় বেড়েছে। কারণ লোকের উপার্জন বেড়েছে, মুদ্রাস্ফীতি কমেছে। চীনের সরকার এটা স্পষ্ট বোঝাতে পেরেছে, যে ভাল সরকারি পরিষেবা পেতে হলে মধ্যবিত্ত চাকুরেদের কর দিতেই হবে।
নতুন কর্মসংস্থান কীভাবে হতে পারে?‌ অভিজিৎ কবুল করেছেন, কোনও ম্যাজিক ফরমুলা নেই। তবে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন এবং অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথ–এর সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদিত তঁার আগের বই ‘হোয়াট দি ইকনমি নিডস্‌ নাও’‌–এ একটা জরুরি কথা তঁারা বলেছেন। যে ম্যানুফ্যাক্‌চারিং ক্ষেত্রে নতুন কাজের সুযোগ ভারত করতে পারেনি, যা করতে পেরেছে বাংলাদেশ, বা ভিয়েতনাম। তার অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটা হল, লোকে সহজে যা করতে পারবে, সেই কাজে তাকে নিয়োগ করা। এমন ম্যানুফাক্‌চারিং শিল্প তৈরি করা, যা রপ্তানিমুখী।‌ তার জন্য বিশেষ শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা, যেখানে কম খরচে পরিকাঠামো গড়ে তোলা যাবে। আলাদা শ্রম আইনে নিয়ন্ত্রিত হবে সেখানকার কাজকর্ম। উদ্বৃত্ত শ্রমিক সেখানে সংস্থার বোঝা হয়ে দঁাড়াবে না। তার জন্য সংস্থাগুলির নিজস্ব  তহবিল আগে থেকেই গড়া থাকবে। উদ্বৃত্ত, বা কর্মচ্যুত শ্রমিক যাতে সেই তহবিল থেকে নিয়মিত ভাতা  পেতে পারেন। যাতে তঁাদের না–খেয়ে থাকতে না হয়।‌

সংবাদমাধ্যমকে অকৃপণভাবে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন নোবেলজয়ী। ছবি: সংগৃহীত

জনপ্রিয়

Back To Top