রাজীব ঘোষ: ডোভার লেন। নামটা শুনলেই যেন বেজে ওঠে সেতার। গড়িয়াহাটের হুল্লোড় যদি ডিস্কোথেক হয়, ডোভার লেনের শান্তি নির্ঘাত উদারা–মুদারায় ধ্রুপদী। দু’‌পাশের বাড়িগুলোয় যেন আভিজাত্যের আতর মাখানো। দেবলীনা চক্রবর্তী, সেই সুদূর সিঁথি থেকে উজিয়ে এসে এখানেই খুলে ফেলেছেন রেস্তোরাঁ— নাম ‘‌চিলেকোঠা’‌। কী লাগসই নাম, সুরের ভাষায় বললে, সমে পড়েছে। বহুজাতিকের লোভনীয় চাকরি ছেড়ে রেস্তোরাঁর ব্যবসায় নেমে পড়তে লাগে প্রেম, আর সেই প্রেম দেয় সাহস। ঘটির মেয়ের বাঙাল বাড়িতে বিয়ে হলে খাওয়াদাওয়ার একটা বিস্ময়কর অভিযান শুরু হয়, দেবলীনার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। তাই এই রেস্তোরাঁয় পাওয়া যাবে কুচো চিংড়ি দিয়ে বাটা কাঁচকলার খোসা। মিলবে লইট্যা ঝুরো, ভর্তার মতো মাছ মাখা, শোল মুলো। সব পদ অল্প তেলে, শিলে বাটা মশলায় রাঁধা। এ তো আছেই, উপরি পাওনা সাতসকালে নিখাদ বাঙালি জলখাবার— যেমন, লুচি আর সুজির হালুয়া। দু‌জনের প্রাতরাশের খরচ বড়জোর ২৫০ টাকা, দেবলীনার ‘‌মোটো’‌ হল ‘‌সাধ্যের মধ্যে ইচ্ছেপূরণ’‌। মেনুতে চোখ বুলিয়েই আমি মনে মনে বলেছি ‘‌ডি লা গ্র‌্যান্ডি’— অর্ডার করেছি ঢাকাই তেহরি। সঙ্গে ঢাকাই ভুনা মাংস। তেহরি বিরিয়ানি নয়, পোলাও নয়, মাংস দিয়ে রাঁধা গোবিন্দভোগ চালের ভাত। ঘি নয়, সর্ষের তেলের ঝাঁঝ। এর সঙ্গে তোফা ভুনা মাটন। দেবলীনা ফাঁকিবাজিতে বিশ্বাসী নন, বাইরে রেঁধে স্রেফ ডাবের খোলায় ঢেলে ডাব চিংড়ি পরিবেশন এখানে নিষিদ্ধ। তাহলে?‌ ‘‌ডাবের শাঁস আর ডাবের জল দিয়েই রাঁধা, চেখে দেখলেই তফাত বুঝবেন’— বললেন দেবলীনা। কমলার রসে রাঁধা মাটনের কোফতা চেখে দেখতে পারেন, চাইতে পারেন মাছের সিজলার। শেফ অভিষেক কাজ করেছেন অলিভস, ক্যাফে কফি ডে–র মতো জায়গায়, হাতে খোলতাই স্বাদ কন্টিনেন্টালেও। চমৎকার সব পদ রয়েছে। শেষপাতে বেকড পাটিসাপটা কিংবা পেয়ারা আর কাঁচালঙ্কার কাস্টার্ড চেখে দেখুন। নিখাদ বাঙালি স্বাদ। আর অন্দরসাজে চমৎকার একটা পুরনো কলকাতার আবহ তৈরি করেছেন শিল্পী প্রদীপ দাস, উইয়ে খাওয়া কড়ি–বরগা দিয়ে কী চমৎকার সৃজন। পুরনো রেডিও, পুরনো টেলিফোন— নস্ট্যালজিয়ার ঢেউ উজিয়ে আসে। প্রদীপকে চিনতে পারেন?‌ এবার কাশী বোস লেনের পুজোমণ্ডপে তাক লাগিয়েছিলেন তিনি। সব মিলিয়ে চমৎকার একটা সুর তৈরি হল, ডোভার লেন বলেই বোধহয় সম্ভব।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top