তাপস গঙ্গোপাধ্যায়‌: ‘‌১৯৬৭–৬৮ সালে, তখন সাউথ পয়েন্টে ক্লাস এইটে পড়ি, স্কুল থেকে ফিরে এসে নাকে–‌মুখে কিছু গুঁজে সোজা ছুটতাম গড়িয়াহাটে নিজেদের দোকান বেনারসী কুঠীতে। তখন একটা মুর্শিদাবাদি সিল্ক শাড়ি কিনতাম ৩৫ টাকায়, বেচতাম ৩৭–এ। অন্ধ্রের বিখ্যাত ইক্কত সিল্ক শাড়ি বেচতাম ১৩৫ বা ১৩৭ টাকায়।’‌ বলছিলেন বেনারসী কুঠী গ্রুপের পার্টনার রবীন্দ্র ভট্টাচার্য। ‘‌এখন শুরু করি তিন হাজার থেকে তবু সেই ৫০ বছর আগের জিনিস কোথায়?‌ ‌মনে রাখবেন সোনা যেমন ওজন করে বিক্রি হয়, তেমনি শাড়ির মধ্যে সিল্ক, মুগা, তসর, মটকা ওজন করেই কেনা–বেচা হয়। আপনি ৫০ গ্রাম সোনার একটা হার গড়াবেন। ৫০ গ্রামের বাজারদর প্লাস মজুরি দিলেই যথেষ্ট। সিল্কের ব্যাপারেও তাই। ওজনে সেটা থানের যা দাম, আর তার সঙ্গে তাঁতির মজুরি।’‌
বেনারসী কুঠী শুধু একটা শাড়ির গ্রুপ নয়, এই গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত অতীতের বাংলা ও কাশীর যোগাযোগের, মাইগ্রেশনের ইতিহাস। রবীন্দ্রবাবুর ঠাকুর্দা মহেন্দ্রচন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন কুমিল্লার লোক। পণ্ডিত মানুষ। ১৯০৩ সাল নাগাদ, যে বছর মহারানি ভিক্টোরিয়া মারা যান, সে বছরই মহেন্দ্রচন্দ্র পত্নীহারা হন। তখন থেকে সংসারে বৈরাগ্য। শেষমেশ তিনি কুমিল্লা ছেড়ে ৫ ছেলেকে নিয়ে চলে যান কাশীতে। আশ্রয় নেন বিশ্বনাথ গলিতে। সারাদিন পড়ে থাকতেন অন্নপূর্ণা মন্দিরে। জপতপ করতেন। কিন্তু ৫টি পুত্র সন্তান, তাদেরই একটি খুড়তুতো ছোটবোনের খাই–খরচ আসবে কোথা থেকে?‌ দাদু যখন কাশীবাসী হন তখন আমাদের বাবা রাজেন্দ্রচন্দ্রর, পাঁচ ভাই–এর মধ্যে সেজ, বয়স ছিল মাত্র নয়। শুনেছি বাবা, বাবার মেজদা, আমাদের মেজ জ্যাঠা হেমচন্দ্র এবং ওই পিসি ঠোঙা বানাতেন। বাজার ঘুরে অর্ডার আনতেন মেজ জ্যাঠা, কার ক’‌বান্ডিল লাগবে। শুরু হত ঠোঙা বানানো। সব শেষে ঘুরে ঘুরে বিক্রি। সে সব সস্তা–‌গন্ডার বাজারে ঠোঙা বেচে ক’‌টা পয়সাই বা আসত!‌ তখন আমাদের বাবা ও মেজ জ্যাঠা শুরু করলেন শরবতের দোকান। বিশ্বনাথ গলির মুখে। ভালই চলত। কিন্তু বেনারসের ফেমাস পুলিসের ফ্রি শরবত–‌পানই কাল হল ব্যবসার। তখন দু’‌ভাই নামলেন স্টিলের বালতি বানাতে। তার থেকে এল স্টিলের ট্রাঙ্ক। সবশেষে সম্ভবত ১৯২৩ সালে, প্রথন বিশ্বযুদ্ধ মিটে যাওয়ার ৫ বছর পর ওই বিশ্বনাথ গলিতেই খুললেন ‘‌হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য অ্যান্ড ব্রাদার্সের বেনারসী কুঠী’‌।‌ রবীন্দ্রবাবুর কথায়, ‘‌আজ থেকে ১৫ বছর আগেও সেই দোকান ছিল।’‌
কিন্তু তার ঢের আগেই বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির সংস্কৃতে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট, সাংখ্যযোগশাস্ত্রী রাজেন্দ্রচন্দ্র চলে এলেন কলকাতায়। ভায়ে ভায়ে এক ঠাঁই থাকলে যা হয়। ১৯৫৩। যে বছর তাঁর চতুর্থ পুত্র রবীন্দ্র জন্মান। উঠলেন রাসবিহারী অ্যাভিনিউতে একটি তেতলা বাড়ি গোটাটাই ভাড়া করে। বাড়িটি ছিল মিস্টার ঘোষের। প্রথম দোকান খুললেন ভবানীপুরে তখনকার রূপালি সিনেমা হলের উল্টো ফুটপাথে, আজ যেখানে মেট্রো রেলের স্টেশন। গত শতাব্দীর পাঁচের দশকে রাসবিহারী গড়িয়াহাট নয়, শাড়ি–‌গয়নার তাবৎ বড় দোকান ছিল ভবানীপুরে। বালিগঞ্জ সবে জমে উঠছে রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের দু’‌পাড়ে। রাজেন্দ্রচন্দ্র ছয়ের দশকে গড়িয়াহাটে খুললেন বেনারসী কুঠী। তারপর পাতাল রেলের কাজের ধাক্কায় ভবানীপুরের দোকান যে উঠল তা–‌ই নয়, প্রায় দশ বছর ভবানীপুরের তাবৎ ব্যবসা খেল প্রচণ্ড মার। তখন ভট্টাচার্য ভাইয়েরা ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের সামনে আরও ২টি দোকান খুললেন— বেনারসী কুঠী ২ এবং বিকে ফ্যাশনস। গড়িয়াহাটের বেনারসী কুঠি–‌১, ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের ২ নম্বর এবং বিকে ফ্যাশনস নিয়ে গড়ে উঠল বেনারসী কুঠি গ্রুপ। এর মালিক রাজেন্দ্রচন্দ্রের ৫ ছেলের মধ্যে চারজন— মেজ নরেন্দ্র, সেজ রণেন্দ্র, ন’‌ রবীন্দ্র এবং ছোট মানবেন্দ্র। বড় ছেলে দেবেন্দ্র প্রয়াত।
কথায় কথায় রবীন্দ্রবাবু বললেন, ‘‌মধ্যযুগে বা তারও আগে রাজা, মহারাজা, সম্রাট, নবাব, সুলতানরা যেমন বর্ষার আগে ও পরে যুদ্ধে নামতেন, কাপড়ের দোকানদাররাও ঠিক তেমনি জুনের শেষ বা জুলাইয়ের গোড়াতেই বেরিয়ে পড়েন তাঁদের পুজোর বাজার সারতে। একবারে হয় না, যা চান তা পুরোপুরি পান না। যেতে হয় খেপে খেপে। সবচেয়ে বড় বিক্রি পুজোর আগে এক মাস, শীতকালের বিয়ে এবং কয়েক বছর হল ইদের কেনাকাটা। এখন শুধু কলকাতার সম্ভ্রান্ত ঘরের মুসলমান পুরুষ ও রমণীরা নন, ঢাকার বাংলাদেশিরাও আসছেন রাসবিহারীতে ইদের কেনাকাটা সারতে। মল্লিকবাজার ও নিউ মার্কেট মার খাচ্ছে যার ফলে।’‌
স্টক বাড়াতে রাসবিহারী কোথায় না যায়?‌ সুরাটে যায় আর্ট সিল্কের জন্য, জয়পুর ও যোধপুর বাঁধনি সিল্কের জন্য, উত্তরপ্রদেশে ফারুকাবাদে প্রিন্টেড সিল্কের জন্য, বেনারসের মোবারকপুর ও আজমগঞ্জে বেনারসী সিল্কের জন্য, লখনউয়ের চিকন, ছত্তিশগড়ের চাম্পা সিল্ক, বিহারের ভাগলপুরী, বাংলার বিষ্ণুপুরী, বালুচরী ও সোনামুখী এবং মুর্শিদাবাদি সিল্ক, অসমের তসর, মুগা, মটকা, ওডিশার সম্বলপুরী, বোমকাই, পুরনো অন্ধ্রের ইক্কত, গাদোয়াল, মঙ্গলাগিরি, ভেঙ্কটগিরি, তামিলনাড়ুর কাঞ্জিভরম। বলতে বলতে থামলেন রবীন্দ্রবাবু। তারপর বললেন, বিখ্যাত গায়িকা এমএস শুভলক্ষ্মী সারাজীবন একটি বিশেষ রঙের কাঞ্জিভরম পরেছেন, এখন সেই শাড়িরই নামই হয়ে গেছে এম এস ব্লু। যেমন লতা মঙ্গেশকর সারাজীবন পরেছেন ‘‌পৈঠনী’‌ শাড়ি, আমরা বাঙালিরা বলি পইঠানি। রবীন্দ্রবাবুর কথায়‌— ‘দেশের সেরা সিল্ক মেলে বেঙ্গালুরুতে। ওদের সিল্ক যেমন সেরা, তাঁতিদের চাহিদার সঙ্গে জোগান দেওয়ারও ক্ষমতা বিশাল। সিল্ক শাড়ির বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশই আজ বেঙ্গালুরুর।’‌
বাংলাদেশের জামদানির কদর এ বাংলাতে যেমন, রবীন্দ্রবাবু স্পষ্ট বললেন, ‘‌আমাদের নবদ্বীপের ও বেথুয়াডহরির তাঁতিদের বানানো জামদানিও ভাল চলে বাংলাদেশে।’‌
কথায় কথায় উঠল দামি শাড়ির প্রসঙ্গ। যেটা জানতাম না, জানলাম। বড় সোনার দোকানে দামি অলঙ্কার কেনার আগে যেমন খদ্দের অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে যান, দামি শাড়ির ব্যাপারেও তাই। ১৫, ২০, ৩০ বা ৫০ লাখের বা কোটির গয়না দোকানি অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে না গেলে দেখাবেন না। ঠিক তেমনি শাড়ির দোকানি ১৫, ১৭ বা ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামের শাড়ি বিনা–‌অ্যাপয়েন্টমেন্টে দেখাবেন। কিন্তু দেড় লাখ, দু’‌লাখ বা তারও বেশি দামের শাড়ির জন্য খদ্দেরকে আগেভাগে বলে আসতে হবে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রবীন্দ্রবাবুরা ৪ ভাই তিনটি শাড়ির দোকানের মালিক বটে, তবে রবীন্দ্রবাবুর নিজের ছোট মেয়ে ঈশিকা গড়িয়াহাট ও ট্রায়াঙ্গুলার পার্কে ‘‌উৎসব সিলেকশনস’‌ বলে দুটি এবং নরেন্দ্রবাবুর ৩ ছেলের মধ্যে দু‌জন নীলাঞ্জন ও রাজা ওই গড়িয়াহাট ও ট্রায়াঙ্গুলার পার্কে খুলেছেন ‘‌বেনারসী কুঠী সিলেকশনস’‌। অর্থাৎ এ যুগের ভট্টাচার্য ব্রাদার্স, সন্স অ্যান্ড ডটার্স ৭ দোকানের মালিক। কুমিল্লা, কাশী, কলকাতা যোগাযোগের ফল।‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top