তাপস গঙ্গোপাধ্যায়: পৃথিবীর সবচেয়ে অকৃত্রিম, নির্ভেজাল, খঁাটি বস্তু কী?‌ উত্তর অবশ্যই:‌ মায়ের বুকের দুধ, যা খেয়ে একটি শিশু বড় হয়। স্তন্যদায়িনীর এই প্রতীক মাথায় ধারণ করে আজ থেকে ২৫ বছর আগে যে বাঙালি রেস্তোরঁাটি কলকাতার হৃদয়ে আক্ষরিক অর্থে আসন পেতেছিল, পিয়ারলেস ইনের সেই আহেলী গত ১৮ মে ২৫ পার করে ২৬–‌এ পা রাখল। ২৫ বছর আগে যে ছিল শিশু, সে নিজেই আজ স্তন্যদায়িনীর মর্যাদায় অভিষিক্ত।
পিয়ারলেস গোষ্ঠীর হসপিটালিটি ডিভিশনের কর্ণধার দেবশ্রী রায়ের মুখেই সেদিন শুনলাম আহেলী–‌র শুরুর কথা। ‘‌আমাদের চেয়ারম্যান (সুনীলকান্তি রায়, দেবশ্রীর বাবা)‌ চেয়েছিলেন একটি আদ্যোপান্ত বাঙালি খাবারের রেস্তোরঁা, যেখানে শুধু খাবার নয়, রান্নার তাবৎ উপকরণ, পরিবেশনের আঙ্গিক, পরিবেশের সর্বত্র থাকবে ‌বাঙালি সংস্কৃতির পরিষ্কার ছাপ। পিয়ারলেসের অনেকেই সেদিন একমত হতে পারেননি। তঁাদের ভয় ছিল পিয়ারলেসের মতো স্টার হোটেলে বাঙালি খাবার খেতে কেউ আসবে না। গেস্টরা চাইবেন চাইনিজ, কন্টিনেন্টাল, নর্থ ইন্ডিয়ান বা ভিন্‌দেশি কুইজিন। বছর ঘুরল না, দেখা গেল, বাবা যে–‌শব্দটি পছন্দ করেছিলেন, আহেলী, যা আরব ভাষার আহেল মানে অকৃত্রিম থেকে এসেছে, তা পুরোপুরি বাজিমাত করেছে। শুরুতে আসন ছিল ৪৫। গেস্টের সংখ্যা প্রতিদিনই, বিশেষ করে ছুটির সময় বা পরবের সময় ছাপিয়ে যেতে লাগল।’‌‌
দেবশ্রীর আজও মনে আছে, শুরুতে তঁার বাবা একটা কথাই বলেছিলেন, ‘‌যদি না চলে তার সমস্ত দায় আমার, কিন্তু যদি চলে তা হলে সে–‌গৌরব সকলের।’‌ আজ প্রায় প্রবাদে পরিণত এই উক্তি। আহেলী–‌র সাফল্যের রাজপথ ধরেই এই কলকাতাতেই একে একে জন্ম নিল বহু রেস্তোরঁা। যে–‌কলকাতায় ভদ্র পরিবেশে, পরিচ্ছন্ন আবহাওয়ায় বাঙালি খাবার খাওয়ার একটিও রেস্তোরঁা যেখানে ছিল না, আহেলী–‌র দৌলতে আজ শহর জুড়ে প্রতিটি প্রধান মহল্লায় তাদের উপস্থিতি আমাদের চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। গত ২৫ বছরে আহেলী কলকাতার খাবার জগতে এক বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে। এখন যে ষষ্ঠী থেকে ভাইফেঁাটা শহরের তাবৎ স্টার হোটেলে বেঙ্গলি কুইজিনের ফেস্টিভ্যাল চলে, তার মূলেও আহেলী।
তা হলে কি আহেলী–‌র আগে কলকাতায় বাঙালি খাবারের কোনও দোকান ছিল না?‌ ছিল। যেমন চঁাদনির কাছে মডার্ন ইটিং হাউস— সাকলাত প্লেসে, প্রেসিডেন্সি কলেজের দেওয়াল ঘেঁষে ভবানী দত্ত লেনে, যার মাথার কাছেই রয়েছে কলকাতার তাবৎ অস্বাভাবিক মৃত্যুর পোস্টমর্টেম করার মর্গ। পুরনো মির্জাপুর স্ট্রিটে, খিদিরপুরে আরও বহু জায়গায় ছিল। পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ বলে কোনও বস্তু ওই সব খাবার দোকানে ছিল না। কোনও কোনওটায় ঢোকার মুখে কঁাচা ড্রেন পেরোতে হত। আর কলেজ স্ট্রিট থেকে ভবানী দত্ত লেনে ঢোকার মুখটা ছিল সর্বসাধারণের, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষায়, ‘‌ছোট বাইরের’‌ আস্তানা।
আহেলী কলকাতার প্রথম স্টার বাঙালি রেস্তোরঁা, যেখানে ইলিশের পাটিসাপটা থেকে গোয়ালন্দের স্টিমারঘাটার মুরগির হালকা ঝোল, সোনালি মুগডাল থেকে কষা পঁাঠার মাংস— সব পাওয়া যায়। আমার চোখের সামনে আহেলী–‌র বিখ্যাত ‘‌ভূরিভোজ থালি’‌র‌ মেনুকার্ড রয়েছে। দেখলাম গোবিন্দভোগ চালের ফুরফুরে সুগন্ধি ভাত, ফুলকো লুচি, বেগুনভাজা, গয়না বড়ি, সোনালি মুগডাল, মোচার ঘণ্ট, ঝিঙে–‌আলুর পোস্ত, ভেটকি মাছের পাতুরি, চিংড়ি মালাইকারি, ভাপা ইলিশ, কষা মাংস, আম/‌‌আনারস/খেজুর/‌আমসত্ত্বের চাটনি, ভাজা পাপর, মিষ্টি দই, রাজভোগ এবং একটি পান। এই থালির দাম ২,২২৫ টাকা প্লাস ১৮ পারসেন্ট জিএসটি।
এই থালি আজকের দিনে খাবার মতো সেই আধমনি বা একমনি কৈলাসরা কোথায়?‌ তাই ভূরিভোজের থালির পাশাপাশি আ লা কার্ট। পরিবেশনে ব্যস্ত মহিলাদের পরনের বাঙালি আটপৌরে ঘরানার শাড়ি, পুরুষদের ধুতি–‌পাঞ্জাবি। 
প্রতিটি রান্নার মশলা আহেলী–‌র কর্মীরা নিজেরাই বেটে বা গুঁড়ো করে নেন। ঘি–‌ও নিজেরাই তৈরি করে নেন। এর মূলে দুই রঁাধুনি, দেবদীপ ঘটক ও রূপম বণিক, যঁারা সর্বদাই সেরা বাঙালি খাবার দিতে চান অতিথিদের। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধয়ের একটি বিখ্যাত লাইন, ‘‌আহেলী বিলাতি বোল, আনকোরা ঢাকাই’‌।‌ অবিমিশ্র বা খঁাটি ইংরেজি বক্তৃতা বা অনুরূপ ঢাকাই বচন, যাতে কোনও ভেজাল নেই। রান্নার তেল‌মশলা চূড়ান্ত খঁাটি, পুরোপুরি আহেলী। ভুলে গেলে চলবে না পিয়ারলেস ইনে ইকো, ওশিয়ানিক ইত্যাদিতে পানাহারের এলাহি ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও আহেলী–‌র জনপ্রিয়তা বাধ্য করল কর্তৃপক্ষকে গোড়ার ৪৫টি আসন বাড়িয়ে ৬১টি করতে। ২০০৭। কিন্তু নিউ টাউনের কী হবে?‌ ওই নবনগরীর অ্যাক্সিস মলে চালু হল দ্বিতীয় আহেলী। হুবহু এক বাঙালিয়ানা।
এক দিকে আহেলী–‌র জনপ্রিয়তা যেমন বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে পিয়ারলেস গোষ্ঠীর হোটেলের সংখ্যাও। ছিল কলকাতা ও পোর্ট ব্লেয়ারে। মাঝে দুর্গাপুরেও এল পিয়ারলেস মহারাজা ইন নামে। বঁাকুড়ায় কংসাবতীর বিস্তীর্ণ জলাধারের পাশেই মুকুটমণিপুরে গড়ে উঠল পিয়ারলেস রিসর্ট। সম্প্রতি হায়দরাবাদেও উপস্থিত পিয়ারলেস, যেখানে তাবৎ খাদ্যসম্ভারের মধ্যে বাঙালি খাবারও সগৌরব উপস্থিত। হালফিল পুরীতেও একটা প্রপার্টি হয়েছে পিয়ারলেসের। দেবশ্রী বললেন, ‘‌সরকারি অনুমতি পেলেই শুরু হয়ে যাবে কনস্ট্রাকশনের কাজ। হয়তো এ বছরই।’‌
কিন্তু কারও অনুমতি ছাড়াই আহেলী আমজনতার দাবি মেটাতে কলকাতার বিপ্লব সরণি (‌রাজভবনের ইস্ট গেটের সামনের চওড়া রাস্তা)‌ যেখানে খাদ্য সরণিতে (‌ডেকার্স লেন)‌ মিশেছে, সেখানে পিয়ারলেস ভবনের একতলায় সদ্য খুলেছে পিয়ারলেস এক্সপ্রেস। ১০ টাকার খাবারও পাবেন। পাবেন ১৫০ টাকায় কম্বো থালি— মাংস পোলাও বা মাছ–‌ভাত–‌ডাল–‌সবজি ও ভাজা ইত্যাদি ইত্যাদি। একই ভাবে অ্যাক্সিস মলের আহেলী–‌র সঙ্গেই জুড়েছে আহেলী এক্সপ্রেস। এসপ্ল্যানেড ইস্ট বা ডেকার্স লেনের অফিসবাবুদের দুপুরের খিদে বা হালকা স্ন্যাক্স যেমন ওই এক্সপ্রেস মেটাচ্ছে, তেমনই নিউ টাউনের মল–‌ঘোরা ক্লান্ত বাবু–‌বিবিদের হালকা চাহিদা মেটাচ্ছে অ্যাক্সিস মলের এক্সপ্রেস। দুর্গাপুরের মহারাজা ইনেও চালু হয়ে গিয়েছে।

জনপ্রিয়

Back To Top