সঙ্ঘমিত্রা মুখোপাধ্যায়: গৃহস্থালির যাবতীয় কাজে ব্যবহার করেন, এমনকী পানও করেন বৃষ্টির জল। বসু বিজ্ঞান মন্দিরের প্রাক্তন অধ্যাপক সমীররঞ্জন শিকদার। গত ১৮ বছর ধরে বাড়িতে বৃষ্টির জল ধরে রেখে ব্যবহার করছেন, এমনকী বাড়ির বাগানেও বৃষ্টির(সঞ্চিত) জলেই ফুল, সবজি ফলাচ্ছেন। স্বল্প পরিসরের এই ছাদ বাগানে (২০০ বর্গ ফুট) ফলছে ঝিঙে, চিচিঙ্গা, লাউ, শসা, শিম ইত্যাদি সবজি। বৃষ্টির জল সেচনেই বর্ণে, গন্ধে পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে নানা মরশুমি ফুল। 
বাইপাসের ধারে পূর্বালোকের বাসিন্দা সমীররঞ্জন ও ওঁর স্ত্রী শ্রাবণী বৃষ্টির জল সংরক্ষণের কাজ শুরু করেন নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে। নতুন বাড়ি করে পূর্বালোকে আসার পর ভূগর্ভস্থ জলে আয়রন বেশি থাকায় পরীক্ষামূলকভাবে বৃষ্টির জল ব্যবহার করতে শুরু করেন। তার ফলে লক্ষ করেন ঘরের মেঝে, বাসনপত্র, জামাকাপড়েও লালচে ভাব আর পড়ছে না। রান্নায় ব্যবহার করে দেখেন রান্নার স্বাদও ভাল হচ্ছে। এরপর ২৫০০ লিটার জল ধারণ করার মতো দুটি জলাধার তৈরি করেন মাটির তলায়। একটির জলে ঘর পরিষ্কার, কাপড় কাচা ইত্যাদি কাজ হয়, অন্যটির জল শুধু রান্না ও খাওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়। বৃষ্টি হলে ছাদের পাইপ দিয়ে জল সরাসরি জলাধারে ঢোকে। যে জলাধার রান্না খাওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়, তাতে বৃষ্টির প্রথম জল ঢোকার আগে খানিকটা জল চাবি ঘুরিয়ে বাইরে ফেলে দেওয়া হয়। যাতে বৃষ্টির জলে মেশা নানারকম রাসায়নিক পদার্থ, এমনকী ছাদের ময়লাও বেরিয়ে যায়। দুটি জলাধারে জল ঢোকার পাইপের মুখেই তিন ধাপে মশারির জাল লাগিয়ে ময়লা আটকানোর ব্যবস্থা আছে। সমীরবাবুর হিসেবে, একজনের আট মাসে প্রায় দু হাজার লিটার জল লাগে। এরপরে পরিবারের সদস্য পিছু অতিরিক্ত এক হাজার লিটার জলের প্রয়োজন হয়। আট মাসের হিসেবে বৃষ্টির জল ধরে রাখতে পারলেই যথেষ্ট। এর পরেই আবার ফিরে আসে বর্ষা। তখন নতুন করে জল সঞ্চয় হয়। সমীরবাবু বোস ইনস্টিটিউটের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখেছেন যে স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর কিছু উপাদান বৃষ্টির জলে থাকে না। পরিচ্ছন্ন জলাধারে রাখলে জলও নষ্ট হয় না। জল ধরে রেখে দিন পনেরো পর থেকে খেতে শুরু করলে বিস্বাদও লাগে না।
গ্রামীণ জৈব প্রযুক্তি প্রকল্পের কো–‌অর্ডিনেটর হিসেবে বৃষ্টির জল সঞ্চয়ের বিষয়টি সমীর শিকদার বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে চালু করতে উদ্যোগী হয়েছেন। পশ্চিম মেদিনীপুরের আমলাশোল, পুরুলিয়ার মানবাজারের মতো শুখা অঞ্চলের অধিবাসীরাও উপকৃত হচ্ছেন বৃষ্টির জল ধরে রেখে। পূর্বালোকে শিকদার পরিবারের প্রতিবেশীরাও অনেকেই বাড়িতে বৃষ্টির জল সঞ্চয় করে ব্যবহার করছেন। বারাসতের ব্রেইনওয়ার ইউনিভার্সিটি বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে সমীরবাবুর সহায়তায়। এমনকী এই বিশ্ববিদ্যালয় পাঁচটি গ্রাম দত্তক নিয়ে ওই গ্রামগুলোতেও বৃষ্টির জল সঞ্চয় ও ব্যবহারে উদ্যোগী হয়েছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ওয়াটার রিসোর্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক আশিস মজুমদার মনে করেন, সমীর রঞ্জনের এই উদ্যোগ খুবই দৃষ্টান্তমূলক। ভূগর্ভস্থ জলস্তর যেভাবে নামছে, তাতে আর দশ বছরের মধ্যে ভারত প্রায় জলশূন্য হবে। তাই বৃষ্টির মতো সুপার ফাইন ওয়াটার যদি আমরা দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করতে পারি, আমাদের আর জলকষ্ট থাকবে না। তবে জল সংরক্ষণ পদ্ধতিতে যাতে পরিচ্ছন্নতা থাকে, সে বিষয়ে নজর দিতে হবে। ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ সুবীর গাঙ্গুলির মতে, বৃষ্টির জলে হয়তো কলিফর্ম নেই, পেট খারাপ হবে না। কিন্তু বায়ুস্তরে যে দূষণ আছে, যে ধরনের মারাত্মক জীবাণু আছে তা কি বৃষ্টির জলে মিশছে না? সুতরাং বৃষ্টির জল কতটা পানযোগ্য তা বিস্তর পরীক্ষার অপেক্ষা রাখে। ছবি: প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top