ঘরে ঘরে থালা–বাসন বাজানোর পর এবার দেশজুড়ে ঘর অন্ধকার করে প্রদীপ জ্বালানোর কর্মসূচি!‌ সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্র। বলেছিলেন, এবার বাস্তববাদী হোন!‌ এক সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেলের ওয়েবসাইটে আবারও তাগাদা দিলেন, অভুক্ত গরিব মানুষের পাশে দাঁড়াক সরকার। দেরি হয়ে যাচ্ছে!‌ যা লিখেছেন মহুয়া মৈত্র—
‘‌‘‌লকডাউনের দশ দিন কেটে গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মাঝে মাঝেই আসছেন। জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন। করোনা–যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিচ্ছেন। আমি শুধু সময় গুনছি। প্রধানমন্ত্রী কবে একটা ঠিকঠাক আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করবেন!‌
কারণ, এভাবে চলতে পারে না। যারা দিন আনে দিন খায়, তাদের কথা ভেবে আঁতকে উঠছি। তাঁদের রোজগার নেই এখন। দু’‌বেলা হয়ত খাবারও পাচ্ছেন না তাঁরা। তাঁদের পাশে দাঁড়াতেই হবে সরকারকে। তাঁরা করোনায় না মরলেও অনাহারে মরবেই। এমন পরিস্থিতিই তৈরি হচ্ছে। তাঁদের জন্য আর্থিক প্যাকেজের ঘোষণা করা হোক। সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের আশ্বস্ত করা হোক, ‘‌আপনাদের কেউ কাজ থেকে ছাঁটাই করতে পারবে না। এই লকডাউনের সময়েও আপনারা বেতন পাবেন। খাবার পাবেন। আমরা আপনাদের পাশে আছি।’‌ এটা ঠিকই যে সরকারের তরফে ঠিকাদারদের উদ্দেশে বারবার বলা হয়েছে, যেন তাঁরা শ্রমিকদের কাজ থেকে বরখাস্ত না করেন। কিন্তু এখানেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। গত সপ্তাহেই দিল্লির আনন্দবিহার বাস টার্মিনাসে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমিকদের মুখগুলো আপনারা নিশ্চয়ই টিভির পর্দায় দেখেছেন। তাঁরা আদৌ জানেন না, তাঁরা আবার কাজ পাবেন কিনা। খাবার জুটবে কিনা। এই মুহূর্তে সরকারের উচিত কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া। আমরা যদি এই অর্থনৈতিক সঙ্কটের মোকাবিলা না করতে পারি, করোনা–যুদ্ধে আমাদের হার নিশ্চিত।
পাশাপাশি রাজ্যগুলির বকেয়া টাকাও সময়মতো মিটিয়ে দেওয়া হোক। যাতে তারাও করোনার মোকাবিলায় আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন না হয়। স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত ব্যয় করতে পারে। এবিষয়ে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা যেমন আইটি, জিএসটি দপ্তর, এনএইচএআই এবং বিদ্যুত দপ্তর যাতে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করে, তা নিশ্চিত করা দরকার। সেটাও অনেক বড় সাহায্য হবে। ভারতে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আগেও দেশের অর্থনীতির হাল খারাপ ছিল। এখন করোনার জেরে সেই সঙ্কট আরও তীব্র হয়েছে। প্রশ্ন হল, কীভাবে এই অর্থনৈতিক সঙ্কটের মোকাবিলা করা সম্ভব?‌ আমি বলব, আমাদের জিডিপির অন্তত ১০ শতাংশ আর্থিক প্যাকেজ হিসাবে ঘোষণা করা হোক। বিশ্বের অনেকগুলো দেশই এই ধরনের আর্থিক প্যাকেজের ঘোষণা করেছে। ২০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতি আমেরিকায়। যার ১০ শতাংশ অর্থাৎ ২.‌২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার তারা আর্থিক প্যাকেজ হিসাবে ঘোষণা করেছে। ভারতের অর্থনীতির মাপ ২.‌৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। সেই জায়গায় ভারত যদি মোটামুটি ২০০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারে, তাতে অনেকটাই কাজ হবে। তবে এই ধরনের প্যাকেজের ঘোষণা করলে কেন্দ্রীয় সরকারের ঋণের বোঝা বাড়বে। এখন আমাদের জিডিপির ৭০ শতাংশই ঋণ বাবদ খরচ হয়। এই আর্থিক প্যাকেজের ঘোষণা করলে, তা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ হবে। কিন্তু ২০০২–০৩ সালে ভারত তো জিডিপির পুরো অংশটাই ঋণ বাবদ ব্যয় করেছিল। ব্রিটেন, আমেরিকা, জাপানের মতো শক্তিধর দেশগুলির ঋণ বাবদ খরচ ভারতের চেয়ে অনেকটাই বেশি। এতে সত্যিই কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। অনেকে এক্ষেত্রে রাজস্ব ঘাটতির কথা বলবেন। এই মুহূর্তে রাজস্ব ঘাটতির কথা মাথায় রাখলে চলবে না আমাদের। আর দেশে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখার উপায় রাজস্ব ঘাটতি কমানো নয়। ২০১৭ সালে ফিসক্যাল রেসপন্সিবিলিটি বাজেটারি ম্যানেজমেন্ট রিভিউ কমিটি এই বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছে। সেই রিভিউ কমিটি এও জানিয়েছে, দেশের জিডিপির কত শতাংশ ঋণ বাবদ খরচ হচ্ছে, তার মধ্যে তালমিল রেখেই অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব। পাশাপাশি আরও একটি বিষয় লক্ষ করা যাচ্ছে, বাজারে চাহিদা নেই। কারণ মানুষের হাতে টাকা নেই। এখনও যদি টাকা না ছাপানো হয়, তাহলে আর কবে হবে?‌ সম্প্রতি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সুদের হার ৭৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়েছে। কিন্তু দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এই মুহূর্তে সুদের হার আরও ২০০ বেসিস পয়েন্ট কমানো প্রয়োজন।
ধীরে ধীরে যখন অর্থনৈতিক বাধা কাটতে শুরু করবে, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ফুলেফেঁপে উঠবে না। এই ধাক্কা সামলে উঠতে বেশ কিছুদিন সময় লেগে যাবে। কিন্তু আমাদের মাথায় রাখতে হবে, তখন যেন বাজারে চাহিদা থাকে। সাধারণ মানুষের হাতে টাকা থাকে। জোগান শৃঙ্খলে যেন কোনও নতুন বাধা তৈরি না হয়। তার প্রস্তুতি এখন থেকেই আমাদের নিতে হবে। বহু দেশ বিভিন্ন আর্থিক প্যাকেজের মাধ্যমে জনসাধারণের হাতে টাকা তুলে দিচ্ছে। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সাহায্য করছে। শুধু জন ধন ব্যাঙ্ক যোজনার মাধ্যমে শ্রমিকদের হাতে কিছু টাকা তুলে দিলেই হবে না। এমন অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে ঠিকাদার এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ব্যবসা গুছিয়ে নিতে পারে সময়মতো। তাতে আখেরে লাভ হবে সাধারণ মানুষেরই। এই লক ডাউনের সময়ে শ্রমিক এবং গরিব মানুষের হাতে যাতে মাস গেলে পাঁচ থেকে ছ’‌হাজার টাকা তুলে দেওয়া যায়, তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জিএসটি রেটও ২৫–৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা প্রয়োজন। কর ছাড়ের সুবিধা চালু করা প্রয়োজন। যাতে বাজারে নতুন নতুন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়। তাতে তৈরি হবে কর্মসংস্থান। কর কমিয়ে আনলেই ঝুঁকি কমবে উদ্যোক্তাদের। তারা বাজারে টাকা ঢালতে উৎসাহী হবে। আর বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ দেওয়ার বদলে নজর দিতে হবে দেশি বিনিয়োগকারীদের দিকে। এই পরিস্থিতিতে সবাইকে একজোট হয়েই লড়তে হবে। সরকারকে আরও দ্রুত এবং কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। একমাত্র তাহলেই করোনার মোকাবিলার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব।’‌’‌

জনপ্রিয়

Back To Top