সঙ্ঘমিত্রা মুখোপাধ্যায়- প্রবল দহনে জ্বলছে পৃথিবী। নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ জলস্তর। হিমালয়ের বরফ গলছে। আরও উত্তপ্ত হচ্ছে ধরণী। হারিয়ে যাচ্ছে শরৎ, হেমন্ত ঋতু। বর্ষাও বিলম্বিত। আমরা, মানবজাতি, যান্ত্রিক সভ্যতা বিকাশের নামে গড়ে তুলছি বিশাল বিশাল বাড়ি। আকাশ ছোঁয়া বাড়ি, শপিং মল তৈরি করতে মাটি থেকে বোরিং করে তুলে আনা হচ্ছে পৃথিবীর জলসম্পদ। অকাতরে, নির্মমভাবে ধ্বংস করছি সবুজ বনানী। তাই হারিয়ে যাচ্ছে পাখিদের কলরব। গাড়ি, চিমনি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র থেকে নির্গত বিষাক্ত বাতাস দূষিত করছে আমাদের পরিবেশকে। এসবের পরোক্ষ ফলই বিশ্ব উষ্ণায়ন। 
খিদিরপুর ২৫ পল্লীর এবারের পুজোর ভাবনা হল এই দহন। ৭৫ বছর পূর্তির বছরে ২৫ পল্লী নিয়ে এসেছে সমাজ সচেতনতার বার্তা। শুধু নজরকাড়া পুজোই নয়, ধ্বংসের হাত থেকে, দহনের হাত থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে, দূষণ ও দহনের যে অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক তা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে ২৫ পল্লীর এই ভাবনা বিশেষ বার্তাবহ। ভাবনা ও প্রতিমা সৃজনে রয়েছেন স্বনামধন্য শিল্পী সনাতন দিন্দা। প্রায় দু’‌‌মাস ধরে শ’‌‌খানেক কারিগর নিয়ে চলছে এই পুজোর কাজ। থার্মোকলের প্যাকিং বাক্স, প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে তৈরি হচ্ছে চালচিত্র, নদ–নদী, মেঘ ইত্যাদি। জলের বোতল, পেপার পাল্প দিয়ে তৈরি হচ্ছে শ’‌‌য়ে শ’‌‌য়ে মানুষের মুখ। মণ্ডপের গায়ে এই মুখগুলো লাগানো থাকবে। অনুতাপে দগ্ধ সে সব মুখ, কারও বা মুখে ব্যান্ডেজ বাঁধা। তৃষ্ণায় কাতর মুখগুলো যেন দেবী দুর্গার কাছে জল চাইছে। হরপ্পা, মহেঞ্জোদড়োর মতো কিছু প্রাচীন ভাস্কর্যকে শিল্পী এখানে ফসিলের আকারে তুলে ধরেছেন। এর কারণ হল দহন ও বায়ুদূষণের ফলে পৃথিবীর সব কিছুই ধীরে ধীরে ফসিলে পরিণত হবে, সনাতন এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন এখানে।         দেবী দুর্গার এখানে শাকম্ভরী রূপ। মাটির মূর্তিটি সম্পূর্ণ কলসের আকৃতির। দেবীর আট হাতে আটটি কলস, এক হাতে ত্রিশূল, অন্য হাতে চামর। দেবী যেন জলপূর্ণ ঘট নিয়ে পৃথিবীকে জলধারায় সিক্ত করে দহনমুক্ত করবেন। মৃন্ময়ী দেবীর মুখ ও হাত পেতলে মোড়া। শিল্পী সনাতন দিন্দার কথায়, ‘‌মানবজাতি সভ্যতার শীর্ষে পৌঁছে অসুরে পরিণত হয়েছে। এই প্রকৃতি ও সমাজকে ধ্বংসের মূলে মানুষই। শারদীয় পূজার মধ্য দিয়ে আমরা তাই সচেতনতার বার্তা দিতে চাই। চাই পৃথিবী আবার পশু পাখির বাসযোগ্য হয়ে উঠুক, জল সংরক্ষণ হোক, পৃথিবী দূষণমুক্ত হোক।’‌‌ আলোর দায়িত্বে আছেন আশিস সাহা। আবহ সনাতনেরই। ‌‌‌‌‌‌

কাজে ব্যস্ত সনাতন দিন্দা। ছবি: শিখর কর্মকার

জনপ্রিয়

Back To Top