আজকালের প্রতিবেদন: প্রয়াত বিশিষ্ট অভিনেতা স্বরূপ দত্ত। বুধবার সকালে মল্লিকবাজারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে শুক্রবার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। বুধবার সকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি রেখে গেলেন স্ত্রী ও এক পুত্র চলচ্চিত্র পরিচালক শারণ দত্ত ও অসংখ্য অনুরাগীকে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বিশিষ্ট চলচ্চিত্র অভিনেতা স্বরূপ দত্তের প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেন। শোকবার্তায় তিনি বলেন, প্রায় তিন দশক ধরে তিনি বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ১৯৬৮ সালে তপন সিংহের ‘‌আপনজন’‌ ছবিতে তাঁর অসামান্য অভিনয় দর্শকদের মনে বিশেষ ছাপ ফেলে। তাঁর প্রয়াণে অভিনয় জগতে অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হল। আমি স্বরূপ দত্তর আত্মীয়পরিজন ও অনুরাগীদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি।
সাতের দশকের এই অভিনেতা কাজ করেছেন বহু খ্যাতনামা পরিচালকের সঙ্গে।  তপন সিংহের ‘‌আপনজন’‌, ‘‌এখনই’‌, ‘‌‌সাগিনা মাহাতো’ ছাড়াও বহু ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। ‘‌পিতাপুত্র’ ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন তনুজা। এছাড়াও হিন্দি ছবি ‘‌উপহার’‌–‌‌এ অভিনয় করেন জয়া ভাদুড়ীর সঙ্গে।
বুধবার দুপুরে মরদেহ হাসপাতাল থেকে আনা হয় তাঁর বালিগঞ্জ প্লেসের বাড়িতে।‌ সেখানে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে মালা দেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন বিমান বসু, রবীন দেব, শ্যামল চক্রবর্তী, চন্দন সেন, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, গৌতম ঘোষ। আর্টিস্ট ফোরামের পক্ষে শ্রদ্ধা জানান দেবদূত ঘোষ, সিনে টেল–‌‌এর পক্ষে সম্মান জানান অজিত দাস। ইস্টবেঙ্গল ক্নাবের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেওড়াতলা মহাশ্মশানে। সেখানেই শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় তাঁর। 
সম্রাট মুখোপাধ্যায়ের সংযোজন:‌ সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক। চাকরি করেছেন নামী বিদেশি কোম্পানিতে। তার আগে স্কুলের পড়াশোনা সাউথ পয়েন্টে। এমন কেরিয়ার এবং সাহেবি আদবকায়দায় লালিত একটি ছেলে পর্দায় অমন পাড়ার সাধারণ ছেলে হয়ে উঠবে ভাবতে পারেননি কেউই। অথচ সেটাই ঘটেছিল যখন স্বরূপ দত্ত ‘‌আপনজন’‌–‌‌এর নায়ক হলেন। ১৯৬৮ সালে তপন সিংহের এই ছবি দিয়েই তাঁর পর্দায় আসা। আদ্যন্ত মিষ্টি মুখের একটি ছেলে অথচ পর্দায় অভিনয় করছে যুযুধান এক রাগী ছেলের ভূমিকায়। বিপরীতে আর এক নবাগত শমিত ভঞ্জ। প্রথম ছবিতেই ওই মিষ্টি মুখের বিস্ফোরণ। তপনবাবুর পরের ছবি ‘‌সাগিনা মাহাতো’–‌‌তেও স্বরূপ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে। ‘‌এখনই’–‌‌তেও তাই। তিন বছরের ভেতর ‘‌হ্যাটট্রিক’‌ সাফল্য বলা যেতে পারে। মাঝে তপনবাবুর ঘরানার ছবি অরুন্ধতী দেবীর ‘‌মেঘ ও রৌদ্র’‌–‌‌এও ছিলেন স্বরূপ। তবে ‘‌আপনজন’‌–‌‌এর পরেই সেরা স্বীকৃতি পান উত্তমকুমার সূত্রে। ‘‌পিতাপুত্র’‌ ছবিতে নায়কের চরিত্র উত্তমকে ‘‌অফার’‌ করা হলে তিনি বলেন এই চরিত্রে আমার থেকে ভাল লাগবে একটি নতুন ছেলেকে। তপনবাবুর ছবিতে ওকে দেখেছি। সেই মতো ‘‌‌পিতাপুত্র’‌র নায়ক হলেন স্বরূপ দত্ত। তপনবাবুর অন্য আর এক ছবি ‘‌হারমোনিয়াম’‌–‌‌এ আবার গুন্ডা সাজেন স্বরূপ বছর দশেক পরে। সে–‌ছবিতে বীভৎস মেক–‌আপ নেন তিনি। আর এটাই হয়তো কাল হল তাঁর কেরিয়ারে। এরপরই আর নায়ক চরিত্রে অফার আসেনি তাঁর কাছে। আপশোস করতেন পরে আরেকটা ব্যাপারেও। বলতেন, ‘‌আপনজন’‌ যখন হয় তখনও পর্দায় সেভাবে ‘‌অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ ইমেজের প্রতিষ্ঠা শুরু হয়নি। হলে দেখা যেত প্রথম এই ছবি দিয়েই তাঁর শুরু। হিন্দি ছবিতে যা করে অমিতাভ বচ্চন, শত্রুঘ্ন সিনহারা প্রতিষ্ঠা পেলেন। বাংলায় পরপর এরকম ছবি করার সুযোগ পেলে হয়তো অন্য একটা ইমেজ পেলেও পেতে পারতেন লম্বা চেহারার ব্যক্তিত্ববান যুবক স্বরূপ দত্ত।
জন্ম ১৯৪১ সালের ২২ জুন। কলকাতা শহরেই। বাবা সরোজ দত্ত। মা শান্তিলতা দত্ত। থিয়েটার দিয়ে অভিনয়ের সূত্রপাত। সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়ার সময় শুনতেন উৎপল দত্তর কথা। সেই মতো গিয়েছিলেন তাঁর কাছে। ‘‌লিটল থিয়েটার গ্রুপ’‌–‌‌এ ‘‌যুদ্ধং দেহী’‌ নাটকে তাঁর অভিনয় নজর কাড়ে। তবে এই গ্রুপে থিয়েটার বেশিদিন করা হয়নি স্বরূপের। এই সময়ে বারবার উৎপলবাবুর কারাবাস ও পরে উৎপলবাবুর দল ছেড়ে দেওয়া ও দল ভেঙে যাওয়াই হয়তো দায়ী। পরবর্তীতে নাটকের নেশা পূরণে স্বরূপ যোগ দেন হাতিবাগানের পেশাদার রঙ্গালয়ে। মাঝে হিন্দিতে ‘‌উপহার’‌ ছবিটি করেন। নায়িকা ছিলেন জয়া ভাদুড়ী। কিন্তু কেন কে জানে হিন্দি ছবিতে আর সুযোগ আসেনি।
সুখেন দাশের ‘‌মিলনতিথি’‌ থেকে শুরু হয় তাঁর ‘‌নেগেটিভ’‌ চরিত্র করা। আটের দশকের মাঝামাঝি আবার কয়েকটি চরিত্রাভিনয়ে নজর কাড়েন স্বরূপ। যেমন সরোজ দে–‌‌র ‘‌কোনি’‌, অজয় করের ‘‌মধুবন’‌। বেশ কিছু বাণিজ্যিক বাংলা ছবির ভিলেনও হন তিনি। তবে এই ব্যাপারে একটু খুঁতখুঁতে‌ ছিলেন। পর্দায় শেষ উল্লেখযোগ্য কাজ নয়ের দশকের মাঝামাঝি রাজা মিত্রর ‘‌নয়নতারা’‌য়। পুরনো দিনের এক অবসাদগ্রস্ত মঞ্চ অভিনেতার জটিল চরিত্র। দীর্ঘদিন অভিনয়ের বাইরে ছিলেন এরপর। ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top