আজকালের প্রতিবেদন
নিজের বাড়ির শৌচাগারেই দেহ মিলল প্রখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার শর্বরী দত্তের। ৬৩ বছর বয়সী এই খ্যাতনামা ডিজাইনারের দেহ প্রায় ২৪ ঘণ্টারও বেশি বাথরুমেই পড়েছিল। ঠোঁটের কোনে রক্ত, গোড়ালিতে কাটা দাগ থাকায় তাঁর মৃত্যু নিয়ে রহস্য তৈরি  হয় । শুক্রবার সন্ধ্যেয় ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে সেরিব্রাল স্ট্রোক, মস্তিষ্কে রক্তক্ষণের ফলেই মৃত্যু।
ব্রড স্ট্রিটের বাড়ি থেকে শর্বরী দেবীর দেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় কড়েয়া থানার পুলিশ। লালবাজারের হোমিসাইড শাখার গোয়েন্দারাও যান। দেহ ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় মেডিক্যাল কলেজে। তিনি কিছু হরমোনাল ইঞ্জেকশন নিতেন বলে জানতে পারে পুলিশ। কিছু ওষুধ বাজেয়াপ্ত হয়। ছেলে জানান, বুধবার রাতে তাঁরা একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া করেছিলেন। তারপর মা নিজের ঘরে চলে যান।
 কিন্তু এতক্ষণ দেহ পড়ে থাকলেও কেন খোঁজ নেওয়া হয়নি তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অমলিন অবশ্য জানিয়েছেন, ‘‌অনেক্ষণ মায়ের কোনও খোঁজ না পেয়ে ফোন করেন তাঁরা। কিন্তু ফোন বেজে যায়। মা ধরেননি।’‌ বৃহস্পতিবার রাত ১১ টা নাগাদ নিচে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে সস্ত্রীক অমলিন মায়ের ঘরে খোঁজ নিতে যান। গিয়ে দেখেন বাথরুমে দেহ পড়ে রয়েছে। খবর দেওয়া হয় পারিবারিক চিকিৎসককে। চিকিৎসক এসে পরীক্ষা করে পুলিশকে খবর দিতে বলেন।
একই বাড়িতে থাকলেও ২৪ ঘণ্টার পার হয়ে গেলেও কেন ছেলে এবং পুত্রবধূ তাঁদের মায়ের কোনও খোঁজ নিলেন না তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অমলিন জানিয়েছেন তাঁরা দুজনেই কাজে ব্যস্ত থাকেন। এমন আগেও হয়েছে যে ২ দিন কারোর সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়নি।
ছেলে অমলিন দত্তের সঙ্গে ব্যবসায়িক কারণে সম্পর্কে টানা পোড়েন চলছিল বলে  শর্বরী দত্তের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বেসরকারি টিভি চ্যানেলে জানান। ২০১৭‌ সালে ছেলের সঙ্গে ব্যবসায়ী সম্পর্ক থেকে সরে গিয়ে শর্বরী দত্ত শূন্য নাম নিয়ে নতুন ব্র‌্যান্ড শুরু করেন। এনিয়ে প্রখ্যাত ডিজাইনার মনোকষ্টে ছিলেন বলে ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন। অবশ্য অমলিন জানিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে মায়ের সঙ্গে কোনও সমস্যাই ছিল না। কিছুদিন আগে শান্তিনিকেতন থেকে ঘুরে এসেছেন।  তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, দিন ১৫ আগে শর্বরী দত্ত, তাঁর পুত্র অমলিন ও তার পুত্রবধূকে নিয়ে বীরভূমের আমোদপুরে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁদের ৬০ বিঘা জমির ওপর বাড়ি রয়েছে। শর্বরী দেবীর ঘনিষ্ঠ জানান, ওই জমি নিয়ে কিছু সমস্যা হয়েছিল। আমোদপুর যাওয়ার আগে খুশি ছিলেন শর্বরী দেবী। কিন্তু ফিরে আসার পর মনোকষ্টে ছিলেন।
 বুধবার রাতের পর বৃহস্পতিবার গোটা দিন পরিবারের সদস্যরা, (‌পুত্র অমলিন দত্ত ও তাঁর স্ত্রী)‌ কোথায় ছিলেন, তার খোঁজ নিচ্ছে পুলিশ। পুত্র ও পুত্র বধূর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়েও খোঁজ নিয়েছেন গোয়েন্দারা।
বিশিষ্ট কবি, প্রগতি পত্রিকা ও কল্লোল গোষ্ঠীর অন্যতম সদস্য কবি অজিত দত্তের মেয়ে ছিলেন প্রয়াত শর্বরী দত্ত। ১৯৯১ সালে শর্বরী দত্ত পার্ক সার্কাস কনক্লেভে প্রথম ফ্যাশন ডিজাইনের প্রদর্শনী করেন। পশ্চিমবঙ্গে তিনিই প্রথম ফ্যাশন ডিজাইনার যিনি পুরুষদের পোশাকের জগতে বৈচিত্র নিয়ে এসেছিলেন। পাশাপাশি তিনি রঙিন ধুতির প্রচলন করেন। তাঁর পোশাক কারুশিল্পের বারেবারই প্রশংসা করেছে বিশিষ্ট শিল্পি এম এফ হুসেন থেকে অমিতাভ বচ্চন। প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, সুনীল গাভাস্কার, কপিল দেব, সচিন তেন্ডুলকর, সৌরভ গাঙ্গুলিও তাঁর ডিজাইনের গুণমুগ্ধ। সাবেকিয়ানার সঙ্গে ফ্যাশনের মেলবন্ধনে ডিজাইন করা পোশাকে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে টলিউড–বলিউডের বিভিন্ন তারকাকে। সাংস্কৃতিক আবহে, থিয়েটারের পরিবেশে মধ্যে দিয়েই তাঁর বড় হওয়া। তিনি ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে পুরুষদের পোশাককেই বরাবর গুরুত্ব দিয়ে এসেছিলেন। র‌্যাম্প শো তে কোনও দিনই আগ্রহী ছিলেন না। হাতে গোনা কয়েকটি র‌্যাম্প শোয়ে মিলিন্দ সুমন, জন আব্রাহাম, দিনো মোরিয়া হেঁটেছেন তাঁর পোশাকে। অভিষেক বচ্চনের বিয়ের সময়েও তাঁর ডিজাইন করা পোশাক নিয়ে যান ঐশ্বর্য রাইয়ের মা বৃন্দা রাই।‌ তাঁর মৃত্যুতে দেশ বিদেশের ফ্যাশন ডিজাইনার সহ সমস্ত স্তরের বিশিষ্ট মানুষ শোক প্রকাশ করেছেন।
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় থেকে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, অরিন্দম শীল, রাজ চক্রবর্তী এই মৃত্যুর খবরে স্তম্ভিত বাকরুদ্ধ। ‌‌

 

পুরুষের ফ্যাশনের পথিকৃৎ

অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
নারীদের তো কখনও টেক্কা দিতে পারে না পুরুষেরা। পোশাকে–‌আশাকে তো নয়ই। সেজন্যই কি আপনি পুরুষদের পাশে দাঁড়ালেন?‌
এক পুরুষ সাংবাদিকের প্রশ্ন শুনে হেসে উঠেছিলেন শর্বরী দত্ত। বলেছিলেন, টেক্কা দেওয়ার কথাবার্তা বলব না। সে সব সমাজতান্ত্রিক ব্যাপার–‌ট্যাপার নিয়ে কথা বলার যোগ্য মানুষ অনেক আছেন। তবে, পুরুষদের পোশাক দেখে খুব কষ্ট হত। কেন কোনও বৈচিত্র নেই?‌ সেই ভাবনা থেকে পুরুষদের পাশে দাঁড়ালাম। আর, তাদের সমর্থন, সহযোগিতা, ভালবাসা পেয়ে আমি আপ্লুত।
সেই ভালবাসা তিনি পেয়েছেন অভিনেতা থেকে স্পোর্টসম্যান, চিত্রশিল্পী থেকে উদ্যোগপতি— সমাজের সর্ব ক্ষেত্রের মানুষদের কাছ থেকে। শর্বরী দত্তর কালেকশন থেকে একটা পোশাক থাকবে না, এটা অনেকেই ভাবতে পারেননি।
তাঁর কাছ থেকে আগ্রহ ভরে পোশাক কিনেছেন শচীন তেন্ডুলকার থেকে ঐশ্বর্য রাই বচ্চনের মা পর্যন্ত। 

ঐশ্বর্যের পদবিতে তখন বচ্চন যোগ হওয়ার আর কয়েকটা দিন বাকি। ঐশ্বর্যর মা বৃন্দা রাই এসেছিলেন ব্রড স্ট্রিটে শর্বরী দত্তর বুটিকে। হবু জামাই অভিষেক বচ্চনের পোশাক কিনেছিলেন এখান থেকে। কিনেছিলেন অমিতাভ বচ্চনের কুর্তাও।
২০১৭ সালে নিজেরই বুটিক থেকে সরে আসতে হয় শর্বরী দত্তকে। পারিবারিক দ্বন্দ্বই ছিল এর কারণ। কিন্তু শুধু বাংলা নয়, ভারতবিদিত ডিজাইনার শর্বরী দত্তকে থামিয়ে দেওয়ার সাধ্য কার?‌ তিনি তৈরি করলেন ‘‌শূন্য’‌। সঙ্গে থাকলেন রেশমি বাগচী। হিন্দুস্থান পার্কের এই ‘‌শূন্য’‌ বুটিক পূর্ণ হয়ে উঠল শর্বরী দত্তর নামে। শর্বরী দত্তর কালেকশন মানেই হয়ে উঠল ‘‌শূন্য’‌, যা আসলে তাঁর মেধা, মনন ও শিল্পে পূর্ণ।
পুরুষদের জন্যে ভূভারতে এমন ডিজাইনার পোশাকের কথা শর্বরী দত্তর আগে কে ভেবেছেন?‌ আর, শুধু ফ্যাশন ডিজাইনার বললে অনেকটা খাটো করা হয় তাঁর প্রতিভাকে। তিনি ছিলেন সর্বার্থেই এক শিল্পী। পুরুষের পোশাকে তিনি একই সঙ্গে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবনার মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। কিন্তু পোশাকটি থেকেছে আদ্যন্ত ভারতীয়। উত্তর ভারতের শেরওয়ানিতে এঁকে দিয়েছেন পটচিত্র। রঙে, বৈচিত্রে, ছবিতে এক আশ্চর্য সম্মিলন তাঁর পোশাকে।
যখন পুরুষের ধুতি তিনি লাল করে দিলেন, কিংবা কালো, তখন বহু মানুষ চমকে উঠেছিলেন। আঁতকেও উঠেছিলেন অনেকে। কিন্তু সেই ধুতির জন্য ভারত–‌জোড়া আগ্রহ পরবর্তীকালে প্রমাণ করেছে শিল্পী, ডিজাইনার শর্বরী দত্ত তাঁর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মিশিয়েছেন সাহসকে। নতুন কিছু করার সাহস।
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় তো বললেনই, শর্বরীদির এই সাহস আর আত্মবিশ্বাসকে স্যালুট জানিয়েছি শুরু থেকে। কুড়ি–‌বাইশ বছর আগে তাঁর পোশাকের প্রথম মডেল হয়েছি আমি। তারপর তো যখনই কোনও বিশেষ ‘‌অকেশন’‌ এসেছে, শর্বরীদির পোশাক ছিল ‘‌মাস্ট’‌। সিঙ্গাপুর থেকে ফোনে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত  বললেন, আমার বর সঞ্জয়ের বিয়ের পাঞ্জাবি আর বউভাতের পাঞ্জাবি শর্বরীদির ডিজাইন করা। এখনও খুব যত্ন করে রেখেছে সঞ্জয়। ও বলে, শর্বরীদির পোশাক পরলে গর্ব হয় খুব।
স্বভাবতই খুব মন খারাপ প্রসেনজিৎ, ঋতুপর্ণার। টালিগঞ্জের বহু অভিনেতাই ভাবতে পারছেন না, তাঁদের শর্বরীদি নেই। দেব থেকে অঙ্কুশ যেমন, পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় থেকে অরিন্দম শীল— সকলেই বিষণ্ণ তাঁদের প্রিয় শর্বরীদির হঠাৎ প্রয়াণে। বিশিষ্ট উদ্যোগপতি সঞ্জয় বুধিয়া বললেন, আমাদের এখানে আমেরিকা থেকে যাঁরা আসতেন, তাঁদের কাছেও শর্বরীদির পোশাক ছিল অপ্রতিরোধ্য। তিনি ছিলেন অসাধারণ শিল্পী, অনন্য এক মানুষ।
কথায়, বার্তায় শর্বরী দত্ত ছিলেন এক রুচিশীল, মননশীল মানুষ। তাঁর বাবা কবি অজিত দত্ত ছিলেন বুদ্ধদেব বসুর বন্ধু। তাঁর স্বামী আলোকময় দত্ত। ভাশুর জ্যোতির্ময় দত্ত। বড় জা অর্থাৎ জ্যোতির্ময়ের স্ত্রী ছিলেন তাঁর পিতৃবন্ধু বুদ্ধদেব বসুর কন্যা মীনাক্ষী। সব মিলিয়ে মননশীলতার আবহ নিয়েই বেড়ে উঠেছেন তিনি।
শুক্রবার ‘‌শূন্য’‌র পুজো–‌পোশাকের শুটিংয়ের জন্য লোকেশন দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। হল না। তাঁর বাবা, ‘‌কুমুমের মাস’‌–‌এর কবি অজিত দত্তর জন্মদিন আগামী বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর। বাবার জন্মদিনে তাঁর কবিতার বই পড়ে শ্রদ্ধা জানাতেন প্রতি বছর। এটাই ছিল তাঁর রীতি। এবারও তার ব্যতিক্রম হত না। পাঁচদিন পরে তাঁর বাবার জন্মদিন। ‘‌কুসুমের মাস’‌–‌এর পাতা উল্টে কবিতা পড়বেন না তিনি। তার আগে, আচমকা শূন্যতা তৈরি করে ৬৩ বছর বয়সে চলে গেলেন তিনি। রইল তাঁর ‘‌শূন্য’‌, যা বহু মানুষের ভালবাসায় পূর্ণ হয়ে আছে। পূর্ণ হয়েই থাকবে।

 ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top