অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
নারীদের তো কখনও টেক্কা দিতে পারে না পুরুষেরা। পোশাকে–‌আশাকে তো নয়ই। সেজন্যই কি আপনি পুরুষদের পাশে দাঁড়ালেন?‌
এক পুরুষ সাংবাদিকের প্রশ্ন শুনে হেসে উঠেছিলেন শর্বরী দত্ত। বলেছিলেন, টেক্কা দেওয়ার কথাবার্তা বলব না। সে সব সমাজতান্ত্রিক ব্যাপার–‌ট্যাপার নিয়ে কথা বলার যোগ্য মানুষ অনেক আছেন। তবে, পুরুষদের পোশাক দেখে খুব কষ্ট হত। কেন কোনও বৈচিত্র নেই?‌ সেই ভাবনা থেকে পুরুষদের পাশে দাঁড়ালাম। আর, তাদের সমর্থন, সহযোগিতা, ভালবাসা পেয়ে আমি আপ্লুত।
সেই ভালবাসা তিনি পেয়েছেন অভিনেতা থেকে স্পোর্টসম্যান, চিত্রশিল্পী থেকে উদ্যোগপতি— সমাজের সর্ব ক্ষেত্রের মানুষদের কাছ থেকে। শর্বরী দত্তর কালেকশন থেকে একটা পোশাক থাকবে না, এটা অনেকেই ভাবতে পারেননি।
তাঁর কাছ থেকে আগ্রহ ভরে পোশাক কিনেছেন শচীন তেন্ডুলকার থেকে ঐশ্বর্য রাই বচ্চনের মা পর্যন্ত। 

 

ঐশ্বর্যের পদবিতে তখন বচ্চন যোগ হওয়ার আর কয়েকটা দিন বাকি। ঐশ্বর্যর মা বৃন্দা রাই এসেছিলেন ব্রড স্ট্রিটে শর্বরী দত্তর বুটিকে। হবু জামাই অভিষেক বচ্চনের পোশাক কিনেছিলেন এখান থেকে। কিনেছিলেন অমিতাভ বচ্চনের কুর্তাও।
২০১৭ সালে নিজেরই বুটিক থেকে সরে আসতে হয় শর্বরী দত্তকে। পারিবারিক দ্বন্দ্বই ছিল এর কারণ। কিন্তু শুধু বাংলা নয়, ভারতবিদিত ডিজাইনার শর্বরী দত্তকে থামিয়ে দেওয়ার সাধ্য কার?‌ তিনি তৈরি করলেন ‘‌শূন্য’‌। সঙ্গে থাকলেন রেশমি বাগচী। হিন্দুস্থান পার্কের এই ‘‌শূন্য’‌ বুটিক পূর্ণ হয়ে উঠল শর্বরী দত্তর নামে। শর্বরী দত্তর কালেকশন মানেই হয়ে উঠল ‘‌শূন্য’‌, যা আসলে তাঁর মেধা, মনন ও শিল্পে পূর্ণ।
পুরুষদের জন্যে ভূভারতে এমন ডিজাইনার পোশাকের কথা শর্বরী দত্তর আগে কে ভেবেছেন?‌ আর, শুধু ফ্যাশন ডিজাইনার বললে অনেকটা খাটো করা হয় তাঁর প্রতিভাকে। তিনি ছিলেন সর্বার্থেই এক শিল্পী। পুরুষের পোশাকে তিনি একই সঙ্গে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবনার মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। কিন্তু পোশাকটি থেকেছে আদ্যন্ত ভারতীয়। উত্তর ভারতের শেরওয়ানিতে এঁকে দিয়েছেন পটচিত্র। রঙে, বৈচিত্রে, ছবিতে এক আশ্চর্য সম্মিলন তাঁর পোশাকে।
যখন পুরুষের ধুতি তিনি লাল করে দিলেন, কিংবা কালো, তখন বহু মানুষ চমকে উঠেছিলেন। আঁতকেও উঠেছিলেন অনেকে। কিন্তু সেই ধুতির জন্য ভারত–‌জোড়া আগ্রহ পরবর্তীকালে প্রমাণ করেছে শিল্পী, ডিজাইনার শর্বরী দত্ত তাঁর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মিশিয়েছেন সাহসকে। নতুন কিছু করার সাহস।
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় তো বললেনই, শর্বরীদির এই সাহস আর আত্মবিশ্বাসকে স্যালুট জানিয়েছি শুরু থেকে। কুড়ি–‌বাইশ বছর আগে তাঁর পোশাকের প্রথম মডেল হয়েছি আমি। তারপর তো যখনই কোনও বিশেষ ‘‌অকেশন’‌ এসেছে, শর্বরীদির পোশাক ছিল ‘‌মাস্ট’‌। সিঙ্গাপুর থেকে ফোনে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত  বললেন, আমার বর সঞ্জয়ের বিয়ের পাঞ্জাবি আর বউভাতের পাঞ্জাবি শর্বরীদির ডিজাইন করা। এখনও খুব যত্ন করে রেখেছে সঞ্জয়। ও বলে, শর্বরীদির পোশাক পরলে গর্ব হয় খুব।
স্বভাবতই খুব মন খারাপ প্রসেনজিৎ, ঋতুপর্ণার। টালিগঞ্জের বহু অভিনেতাই ভাবতে পারছেন না, তাঁদের শর্বরীদি নেই। দেব থেকে অঙ্কুশ যেমন, পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় থেকে অরিন্দম শীল— সকলেই বিষণ্ণ তাঁদের প্রিয় শর্বরীদির হঠাৎ প্রয়াণে। বিশিষ্ট উদ্যোগপতি সঞ্জয় বুধিয়া বললেন, আমাদের এখানে আমেরিকা থেকে যাঁরা আসতেন, তাঁদের কাছেও শর্বরীদির পোশাক ছিল অপ্রতিরোধ্য। তিনি ছিলেন অসাধারণ শিল্পী, অনন্য এক মানুষ।
কথায়, বার্তায় শর্বরী দত্ত ছিলেন এক রুচিশীল, মননশীল মানুষ। তাঁর বাবা কবি অজিত দত্ত ছিলেন বুদ্ধদেব বসুর বন্ধু। তাঁর স্বামী আলোকময় দত্ত। ভাশুর জ্যোতির্ময় দত্ত। বড় জা অর্থাৎ জ্যোতির্ময়ের স্ত্রী ছিলেন তাঁর পিতৃবন্ধু বুদ্ধদেব বসুর কন্যা মীনাক্ষী। সব মিলিয়ে মননশীলতার আবহ নিয়েই বেড়ে উঠেছেন তিনি।
শুক্রবার ‘‌শূন্য’‌র পুজো–‌পোশাকের শুটিংয়ের জন্য লোকেশন দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। হল না। তাঁর বাবা, ‘‌কুমুমের মাস’‌–‌এর কবি অজিত দত্তর জন্মদিন আগামী বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর। বাবার জন্মদিনে তাঁর কবিতার বই পড়ে শ্রদ্ধা জানাতেন প্রতি বছর। এটাই ছিল তাঁর রীতি। এবারও তার ব্যতিক্রম হত না। পাঁচদিন পরে তাঁর বাবার জন্মদিন। ‘‌কুসুমের মাস’‌–‌এর পাতা উল্টে কবিতা পড়বেন না তিনি। তার আগে, আচমকা শূন্যতা তৈরি করে ৬৩ বছর বয়সে চলে গেলেন তিনি। রইল তাঁর ‘‌শূন্য’‌, যা বহু মানুষের ভালবাসায় পূর্ণ হয়ে আছে। পূর্ণ হয়েই থাকবে।

 ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top