দুই সন্তানের মা। বয়স ৪৪। বাঙালি বাড়ির এই বউ পাড়ি দিচ্ছেন চীনে। মিসেস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতার ফাইনালিস্টের মুখোমুখি বসেছিলেন সুতপা ভৌমিক।


মিসেস ইউনিভার্সের মঞ্চে ভারত আর বাংলা— দুটো পতাকাই আপনার হাতে। নার্ভাস‌ না গর্বিত?‌ 
সুপর্ণা মুখার্জি:‌ দুটোই। গর্বিত অবশ্যই। তবে নার্ভাসও। প্রায় ৯০টা দেশের প্রতিনিধির সঙ্গে লড়াই। একাই এগোচ্ছি। নার্ভাস লাগাটা খুব স্বাভাবিক। তবে পাশাপাশি গর্বও হচ্ছে খুব। বিশ্বের আসরে আমার বাংলাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। 
 ‘‌স্টপ ভায়োলেন্স’‌ বা ‘‌হিংসা বন্ধ’— এই বার্তা দেওয়াই এই সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্য। আপনাদের পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনও দিতে হবে। ‌‘‌হিংসা’‌ শব্দটা শুনলে কী মনে হয়?‌
সুপর্ণা:‌ হিংসা বন্ধ হোক। ঘরে এবং পরিবারে হিংসার শিকার— এই ঘটনা তো শুধু আর আমার দেশে ঘটে না। সারা বিশ্বেই এটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। শুধু শরীরে নয়, মনের আঘাতটা মারাত্মক। সেটা যাতে না হয়, দেখা দরকার। খুঁটিনাটি সব বিষয় মাথায় রেখেই প্রেজেন্টেশন দেব। 
 নির্ভয়া কাণ্ড,‌ তেলেঙ্গানায় গণধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে। তারপর বিশ্বের মঞ্চে দাঁড়িয়ে হিংসা নিয়ে বলার ইচ্ছে থাকে?‌ 
সুপর্ণা:‌
যা যা ঘটেছে, সবগুলোই অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের। কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকার যদি এই ধরনের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়, তাহলে অপরাধীদের মনে ভয়টা জন্মাবে। ওদের মনে কঠোর শাস্তির ভয়টা ধরাতে হবে। 
তার মানে আপনি এনকাউন্টারের পক্ষে?‌
সুপর্ণা:‌
মেরে ফেলার বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলে ভাল হত। 
পার্সোনালিটি ডেভেলপমেন্ট ট্রেনার থেকে মিসেস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতায়। কীভাবে পেরোলেন এই পথ?‌‌
সুপর্ণা:‌
পার্সোনালিটি ডেভেলপমেন্ট ট্রেনারের কাজটা ফ্রিলান্সার হিসেবে করেছি। এই মুহূর্তে আমি ইমেজ ম্যানেজমেন্ট এবং সফ্‌ট স্কিল ট্রেনিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। আসলে মডেলিং ব্যাপারটা দিন দিন বড্ড খেলো হয়ে যাচ্ছে। শুধু র‌্যাম্পে হাঁটলেই তো আর হল না। কথা বলতেও জানতে হয়। টাইম এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট, টিম বিল্ডিং, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ— সব মিলিয়েই পার্সোনালিটি ডেভেলপমেন্ট। ব্যাপারটা অল ইন ওয়ান। 
বিশ্বের ৯০ জনের সঙ্গে লড়াই। বিচারক হলে মার্কশিটে নিজেকে কত নম্বর দেবেন?‌
সুপর্ণা:‌
(‌‌হেসে)‌‌ হুম.‌.‌.‌প্রশ্নে মারপ্যাঁচ আছে। বিচারক হলে নিজেকে ফুলমার্কস দেব। না, না ১ নম্বর কম। তবে তার থেকে কম নয়। 
মিসেস ইন্ডিয়া এবং মিসেস এশিয়া প্যাসিফিকের যে সফর করেছেন, তাতে সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত কোনটা ছিল?‌
সুপর্ণা:‌
র‌্যাম্পে হাঁটা। ‌আগে কখনও হাঁটিনি। মিসেস ইন্ডিয়ার প্রথম রাউন্ডে তাই বেশ ভয় পেয়েছিলাম। পরে অবশ্য সেটা কেটে গিয়েছিল। এশিয়া প্যাসিফিক আন্তর্জাতিক মঞ্চ। সেখানে আবার অন্য সমস্যা। আমাকে সাহায্য করার কেউ ছিল না। 
চীনে থাকাকালীন মেয়ের জন্মদিন পড়েছে। এক মায়ের পক্ষে বা এক গৃহিণীর পক্ষে ১১ দিন বাড়ি থেকে দূরে থাকা কঠিন নয়?‌  
সুপর্ণা:‌
এর আগেও বাড়ি থেকে দূরে থেকেছি। আমার মা এসে ছিলেন তখন। শাশুড়ি ছিলেন। আর আমার ছেলে–মেয়ে খুব বুঝদার। আমার ১৪ বছরের মেয়েই বলেছিল ‘‌মিসেস ইন্ডিয়াতে নাম দাও মাম্মা।’‌ গৃহিণী হিসেবে বলতে পারি, বাড়ির সমর্থন না পেলে মিসেস ইউনিভার্সে যেতে পারতাম না। 
প্রথম কবে মনে হল সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় নাম দেবেন?‌ বাড়ির লোকেদেরই বা কী বলেছিলেন?‌
সুপর্ণা:‌
মিসেস ইন্ডিয়ার আগে আকাশ বাংলায় একটা অনুষ্ঠান হয়েছিল। ‘‌আমি মিস শপিং মল’‌। সেখানে জিতেছিলাম। সাহসটা সেখানেই পাওয়া। আমি স্বাধীন চিন্তায় বিশ্বাসী। নিজে সিদ্ধান্ত নিই। তারপর সিদ্ধান্তটা বাড়িতে জানাই। অনুমতির অপেক্ষা করি না। 
বয়স ৪৪। যদিও আপনাকে দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই। কোন জাদুতে বয়সটা ধরে রেখেছেন?‌ 
সুপর্ণা:‌
সবই মনের ব্যাপার। নিজে মনে করলে ৪০। না হলে ৩০। পার্সোনালিটিই শেষ কথা। ইতিবাচক ভাবলে তার ছাপ চোখে–মুখে পড়বেই। আয়নার দিকে তাকালে যেন নিজেকে নিয়ে গর্ব হয়। 
মিসেস ইউনিভার্স হয়ে ফিরলে নির্যাতিতাদের জন্য কি মোমবাতি মিছিল করবেন বা‌ মুখস্ত সংলাপ আওড়াবেন?‌ 
সুপর্ণা:‌
শান্তি মিছিল করলাম আর আমাদের দেশের মেয়েরা নিরাপদ হয়ে গেল— এটা হয় না। সমস্যার গভীরে গিয়ে আসল কারণটা খুঁজে কাজ করতে হবে। 
মিসেস ইউনিভার্স হতে গেলে কি খাওয়া–দাওয়া বন্ধ?‌ 
সুপর্ণা:‌
(‌‌প্রবল হেসে)‌‌ তা কেন?‌ তবে ডায়েট মেনে, ফিটনেসের কথা মাথায় রেখে চলতে হয়। আমি যেমন ভীষণ ভাত খেতে ভালবাসি। এখন সেটা পারি না। তবে বাড়িতে বাঙালি রান্নারই চল। আমি মনেপ্রাণে বাঙালি। ভারতের চেয়েও বাংলার প্রতিনিধি হিসেবে চীনে যাচ্ছি, এটাই বারবার বলি। লোকে এই কথাটাকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখবে কিনা জানি না। তবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি যেভাবে নিজেকে তুলে ধরেছেন, তাতে তঁাকে দেখে অনুপ্রাণিত হই। কারণ, নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করি। 
সম–অধিকারের কথা বারবার বলা হয়। আপনার কাছে সম–অধিকারের অর্থ কী?‌ অধিকার আর স্বাধীনতা কি সমার্থক?‌
সুপর্ণা:‌
আমি সম–অধিকারে বিশ্বাসী। সম–অধিকার না থাকলে সংসার এবং সমাজ ভারসাম্য হারায়। স্বাধীনতা মানে আমি যেটা করব ভাবছি, সেটায় কোনও বাধা দেওয়া হবে না। আর অধিকার তো অধিকারই। তবে দিনের শেষে কোথাও গিয়ে দুটো মিলে যায়। স্বাধীন হলেই নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করা যায়।

জনপ্রিয়

Back To Top