সৌগত চক্রবর্তী: দেশ জোড়া ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনে ও এনআরসি এবং সিএএ–‌‌র বিরুদ্ধে নাট্যকর্মীদের অভূতপূর্ব মিছিল ও পথসভার সাক্ষী থাকল শুক্রবারের কলকাতা। মুক্তাঙ্গন থেকে শুরু হয়েছিল এই মিছিল। কে ছিলেন না এই মিছিলে? ছিলেন পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়,‌ বিভাস চক্রবর্তী, অশোক মুখোপাধ্যায়, মেঘনাদ ভট্টাচার্য, পঙ্কজ মুন্সী, সৌমিত্র বসু, ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায়, সুরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, শুভাশিস মুখার্জি, সুজন মুখার্জি,  মানসী সিনহা ও আরও অনেকে। এসেছিলেন তরুণ মজুমদারও। শেষ কবে নাট্যকর্মীদের আয়োজনে এরকম মিছিল দেখেছে কলকাতা?‌ বলতে পারলেন না আয়োজকদের কেউই। এই মিছিলে ছিল না কোনও রাজনৈতিক রং। জাতীয় পতাকাকে সামনে রেখে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের গান গলায় নিয়ে এই মিছিলে পা মেলালেন অসংখ্য নাট্যকর্মী।
শুভেন্দু মাইতি তো বলেই দিলেন, ‘‌আজ আমার হাঁটতে ভাল লাগছে। বহুদিন এরকম সুশৃঙ্খল মিছিল দেখেনি কলকাতা।’‌ বললেন, ‘‌আমি নন্দীগ্রামের মানুষ। সেখানে ৪৮ শতাংশ মুসলমান। কিন্তু আমরা কোনও দিনই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বলে কোনও কথা শুনিনি। এই শব্দ জোড়াকে ঘৃণাভরে মুছে ফেলা উচিত।’‌ অশোক মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘‌খারাপ শক্তিগুলো যখন আস্ফালন করছে তখন নাট্যকর্মীরা তো ঐক্যবদ্ধ না হয়ে থাকতে পারেন না। আজ বোঝা গেল কলকাতার থিয়েটার বেঁচে আছে শুধু ভালভাবে বাঁচার জন্যে। এখন এমন একটা সময় এসেছে যখন মানুষকে তার কর্ম দিয়ে বিচার করার বদলে খারাপ শক্তি চাইছে তাকে ধর্ম দিয়ে বিচার করতে।’‌ তিনি কলকাতার নাট্যকর্মীদের আহ্বান জানালেন সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফ্যাসিজম–‌‌এর বিরুদ্ধে একটি জোরালো নাটক মঞ্চে আনার জন্যে। কল্যাণ সেন বরাটের নেতৃত্বে কলকাতা কয়ারের প্রতিবাদের গান নিয়ে মিছিল শেষ হয় আকাদেমি প্রাঙ্গণে। সেখানে অনুষ্ঠিত হয় পথসভা। দেবাশিস মজুমদার বলেন, ‘‌সারা দেশ জুড়ে আবার ভারতের স্বাধীনতা হরণের চেষ্টা চলছে। আক্রমণ নেমে আসছে বিশেষ করে তরুণ ও ছাত্র সমাজের ওপর। আমরা আজ ছাত্রদের পাশে আছি এবং এই লড়াইটা লড়তে চাই ছাত্রদেরই নেতৃত্বে।’‌ কয়েকদিন আগেই এনআরসি বিরোধী একটি মিছিলে পা মেলানোর জন্যে আক্রান্ত হয়েছিলেন তরুণ নাট্যকর্মী কৌশিক চৌধুরি। বললেন, ‘‌আমরা অনেক আগে থেকেই এনআরসি ও সিএএ–‌‌র প্রতিবাদে রাস্তায় ছিলাম। আমাকে রাস্তায় ফেলে মারা হয়েছে। কিন্তু তাও আমরা মিছিলে থাকব। শাসকের চোখ উপড়ে ফেলব।’‌ বিভাস চক্রবর্তী বললেন, ‘‌এই মিছিলের কোনও রাজনৈতিক রং নেই। ভারতের কেবল মাত্র একটা রাজ্যেই এনআরসি–‌‌র কারণে ১২ লক্ষ বাঙালি হিন্দুকে ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছে। তাঁদের নাগরিকত্ব হরণ করা হয়েছে। একবার ভাবুন দেশ জুড়ে এমন হলে কী সর্বনাশ হবে।’ বললেন, ‘‌যৌবনকে পিটিয়ে মারাই শাসকের কাজ।’‌ মিছিলকে সমর্থন জানিয়ে এসেছিলেন পবিত্র সরকার। বললেন, ‘‌সরকার এমন একটা ভান করছে যেন সব বেকার চাকরি পেয়ে গেছেন, সব ক্ষুধার্ত শিশুর মুখে ভাত এসে গেছে, সব মানুষের পরনের পোশাক এসে গেছে। শুধু একটা সমস্যাই বাকি। কে হিন্দু আর কে মুসলমান তা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। আসলে এই সরকারের আসল উদ্দেশ্য হল হিন্দুদেরও হিন্দুদের থেকে বিচ্ছিন্ন করা।’‌ তরুণ মজুমদার জানালেন, ‘‌ভারতের যে পরিচিত মানচিত্র আছে সেই মানচিত্রকে ভেঙে এক নতুন মানচিত্র তৈরি করতে চাইছে সরকার। সেই মানচিত্র আমাদের চেনা মানচিত্র নয়।’‌ তারপরেই উচ্চারণ করলেন নিকোলাই অস্ত্রোভস্কির সেই বিখ্যাত কবিতা। যার শেষ লাইনে আছে, ‘‌ওরা যখন আমাকে ধরতে এল তখন আমি একা। আমার পাশে তখন কেউ নেই।’‌ এই কবিতারই সূত্র ধরে তিনি বললেন, ‘‌এই একাকিত্বের যন্ত্রণা যেন আমাদের না পেতে হয়। নাট্যকর্মীদের এই প্রতিবাদে মিশিয়ে নিতে হবে গায়ক, কবি, সাহিত্যিক সবাইকেই। এই পথসভায় গান, কবিতা নিয়ে ছিলেন কল্যাণ সেন বরাট, সৌমিত্র মিত্র, বিজয়লক্ষ্মী বর্মন, রাজশ্রী ভট্টাচার্য, মন্দাক্রান্তা সেন, পল্লব কীর্তনীয়া প্রমুখ। পথসভায় ছিলেন বিলু দত্ত, দেবদূত ঘোষ, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, পৌলমী চট্টোপাধ্যায়, দুলাল লাহিড়ী, ঊষা গাঙ্গুলি, অরুণ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।

নাট্যকর্মীদের আয়োজনে ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনে ও এনআরসি এবং সিএএ–‌‌র বিরুদ্ধে মিছিলে সুজন মুখোপাধ্যায়, পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মেঘনাদ ভট্টাচার্য, পঙ্কজ মুনশি, দেবাশিস মজুমদার, সৌমিত্র বসু, ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। এসপি মুখার্জি রোডে। শুক্রবার। ছবি:‌ বিপ্লব মৈত্র ‌

জনপ্রিয়

Back To Top