কাকলি মুখোপাধ্যায়‌: শহর কলকাতায় একদিকে জলসঙ্কট আর অন্যদিকে অপচয়। নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ জলস্তরও। যা নিয়ে উদ্বিগ্ন পুরসভা। চেন্নাইয়ের জলসঙ্কট দেশের মেট্রোপলিটন শহরগুলির চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ ছড়িয়েছে সর্বত্র। জলসঙ্কট মেটাতে ইতিমধ্যেই উদ্যোগী হয়েছে কলকাতা পুর প্রশাসন। জলের অপচয় বন্ধ করতে উত্তর কলকাতার ৬ ওয়ার্ডে মিটার বসিয়েছে পুরসভা।
কেন্দ্রের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের মেট্রোপলিটন শহরগুলিতে দিনে মাথাপিছু ১৫০ লিটার জলের দরকার। ২০১১ সালের জনগণনা বলছে, কলকাতার জনসংখ্যা ৪৪ লক্ষ ৯৬ হাজার ৬৯৪। গত ৮ বছরে সেই জনসংখ্যাও দ্বিগুণ হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদিন শহরে প্রায় ১৪–১৫ লক্ষ মানুষ যাতায়াত করছেন। সব মিলিয়ে কলকাতায় প্রতিদিন প্রায় ৬২–৬৪ লক্ষ মানুষ পুরসভার জল ব্যবহার করেন। পুরসভা সূত্রে পাওয়া খবর, প্রতিদিন কলকাতা পুরসভা ২০২ কোটি লিটার জল উৎপাদন করে। সেই জল পুরোটাই বিতরণ করে দেওয়া হয়। শহরে দৈনন্দিন জনসংখ্যার নিরিখে দিনে জলের চাহিদা ৯৭ কোটি ৫০ লক্ষ লিটার। তাহলে?‌ প্রতিদিনের চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত থাকছে জল!‌ তারপরও শহরে সঙ্কট কেন?‌ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। 
পাশাপাশি রাস্তার কল দিয়ে অবিরাম জল বয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ মুহূর্তে কলকাতার রাস্তায় পানীয় জলের ১৮ হাজার কল রয়েছে। জল নেওয়ার পর অনেক সময় কল বন্ধই করা হয় না। কোথাও খোলা কল তো কোথাও বন্ধের কোনও ব্যবস্থাই নেই। এ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। বহু জায়গায় রাস্তার কলে স্টপকক লাগানো হয়েছে। তবে এখনও অনেক জায়গায় রাস্তার কল থেকে জল বয়ে যেতে দেখা যায়। 
এ প্রসঙ্গে পুরসভার পানীয় জল দপ্তরের আধিকারিকদের একাংশের বক্তব্য, জলের অপচয়ই কলকাতায় জলসঙ্কট তৈরি করছে। অপচয় বন্ধ করতে পারলে শহরে আর জলসঙ্কট থাকবে না। কিন্তু অপচয় পুরোপুরি বন্ধ করতে চাই নাগরিক সচেতনতা। মাথাপিছু জল খরচের আর্দশ মাপকাঠি ১৫০ লিটার, সেখানে খরচ হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫৫০ লিটার। কারণ, পুরসভার পরিস্রুত জল পানের পাশাপাশি বাড়ির অন্য কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে ৩ সদস্যের পরিবারে জল খরচের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ১৬৫০ লিটার। তাঁর কথায়, দক্ষিণ–পূর্ব কলকাতায়ও জলে মিটার লাগানোর পরিকল্পনাও রয়েছে পুরসভার। 
পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমে বরো–১, অর্থাৎ কাশীপুর–‌লাগোয়া ৬টি ওয়ার্ডে মিটার বসানো হয়েছে। তবে এর জন্য কোনও কর দিতে হয় না। কত জল দেওয়া হচ্ছে, তার মধ্যে কতটা খরচ আর কতই–‌বা অপচয়, তার হিসেব রাখছে পুরসভা। প্রকল্পটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কেআইইপি–‌কে। এখন বরো–১, অর্থাৎ কাশীপুর–‌লাগোয়া এলাকায় প্রায় ১৮ লক্ষ গ্যালন জল খরচ হয়। প্রায় ১৮ ঘণ্টা জল পান ওই এলাকার বাসিন্দারা। মিটার বসানোর পর সেই খরচের একটা হিসেব মিলছে। আর্দশ মাপকাঠি ছুঁতে না পারলেও, কয়েকটি জায়গায় জল খরচের পরিমাণ ২০০–২৫০ লিটারে নামানো সম্ভব হয়েছে।
পুরসভা সূত্রে খবর, বরো ১–‌এর কাশীপুর লাগোয়া ৬ ওয়ার্ড এলাকাটিকে ২৫টি ডিস্ট্রিক্ট ওয়াটারিং মিটার জোনে ভাগ করা হয়েছে। সাড়ে ৩ হাজার মিটার বসানো হয়েছে উত্তরের এই ৬ ওয়ার্ডে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক থেকে নেওয়া হয়েছে ১৮০ কোটি টাকা। দুটি করে মিটার বসানো হয়েছে। একটি বাড়িতে, অন্যটি যে–‌পাইপ থেকে জল ঢুকছে সেখানে। এই মিটারের মাধ্যমে বাড়িপিছু কত জল খরচ হচ্ছে তা জানা যাবে। পাইপ লাইনে কোনও ফাটল আছে কি না, জানা যাবে তা‌ও। কাশীপুর না বেলগাছিয়া, কোন অঞ্চলে জল বেশি খরচ হচ্ছে, তারও হিসেব রাখা যাবে। উত্তরে জলে মিটার বসিয়ে মানুষের মধ্যে কিছুটা সচেতনতা এসেছে বলেই জানাচ্ছেন বরো–১ চেয়ারম্যান তরুণ সাহা। 
সম্প্রতি ‘‌ওয়াটার ভিশন ২০৩৫‌ কলকাতা’‌ নামে একটি সমীক্ষার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে নাগরিক–‌পিছু প্রতিদিনের জলের চাহিদা। রিপোর্ট বলছে, মাথাপিছু প্রতিদিন প্রায় ২০০ লিটার জল লাগে। দেশে মাথাপিছু জল খরচের সূচক ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সে‌ক্ষেত্রে অপচয় রুখতে শহরবাসীর সচেতনতাও জরুরি। 

জনপ্রিয়

Back To Top